বিয়ের বয়সেই মৃত্যু হচ্ছে বেশিরভাগ প্রবাসী শ্রমিকের

deadh-bodyসংসারের হাল ধরতে ও নিজের বেকারত্ব ঘুচাতে ওমানে গিয়েছিলেন নোয়াখালীর ২৭ বছর বয়সী মাসুদ আলম রানা। এই বয়সেই স্ট্রোক করে মরতে হয়েছে তাকে। এক বছরের মাথায় ফিরতে হয়েছে লাশ হয়ে। ছেলের অল্প বয়সে মারা যাওয়াটাকে এখনো মেনে নিতে পারেন না বিধবা মা আনোয়ারা বেগম। টাকার পরিবর্তে যুবক ছেলের লাশ আসার বেদনা এখনো বহন করতে হচ্ছে তার এই বৃদ্ধ বয়েসে। মা আনোয়ারার মতো অনেকেই ছেলের অকাল মৃত্যুতে দিন-রাত কাঁদেন। আর ভাবেন- ছেলে বিদেশে না গেলে আমার কোলে বেঁচে থাকতো এতোদিন।

এইরকম হাজারো স্বজন অনেক স্বপ্ন নিয়েই বিদায় জানান বিদেশে পাঠানো তাদের আপনজনকে। কিন্তু কয়েক বছর কিংবা কখনো কিছুদিন পর ফিরে আসে লাশ হয়ে। যে বয়সে তাদের মারা যাওয়ার কথা নয়, যে বসয়সেই মূলত যুবকরা বিয়ে করে থাকে, যে বয়সে মৃত্যকে মেনে নেয়াও যায় না, অথচ সে বয়সেই মারা যাচ্ছে প্রবাসে থাকা এসব শ্রমিক। প্রতিদিন গড়ে আট থেকে দশজন প্রবাসীর মরদেহ আসছে দেশে। এদের মধ্যে ৬০ শতাংশরও বেশি মারা যাচ্ছে ৩০ থেকে ৩৯ বছর বয়সেই, ২০ শতাংশের মৃত্যু ২০ থেকে ২৯ বছরের মধ্যে, বাকি ১৫ শতাংশ মারা যায় ৪০ থেকে ৫৫ বছর বয়সে এবং ৫ শতাংশের বয়সই জানা যায় না। এদের অধিকাংশরই মৃত্যু হয় স্ট্রোক কিংবা হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে।

‘যে বয়সে মৃত্যু মানা যায় না, সেই বয়সেই মরছে প্রবাসী কর্মীরা’- এ বলেই হতাশা প্রকাশ করলেন দীর্ঘদিন প্রবাসীদের নিয়ে কাজ করা সংগঠন ‘রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটোরি মুভমেন্ট রিসার্চ ইউনিট (রামরু)’র গবেষক জালাল উদ্দিন শিকদার। এসব মৃত্যর কারণ হিসেবে সরকারের দায়িত্বহীনতায়কেই দায়ী করলেন তিনি।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, চলতি বছরের নভেম্বর মাস পর্যন্ত প্রবাসীদের মরদেহ আনা হয়েছে ৩ হাজার ৩৬ জনের। এদের মধ্যে গত আগস্ট মাসেই মারা গেছে ২৫৮ জন। যার মধ্যে ৩০ থেকে ৩৯ বছর বয়সী ১৪৭ প্রবাসী শ্রমিক মারা গেছে, ২১ থেকে ২৯ বছর বয়সীর মৃত্যু হয়েছে ৪৪, চল্লিশ বছরের ঊর্ধ্বে ৪৫ প্রবাসী কর্মী মারা গেছে এবং বয়স জানা যায়নি এমন সংখ্যা ১৫ জনের। এভাবে গত দুই বছরের মৃত্যর কজলিস্ট অনুযায়ী দেখা যায়, গড়ে প্রতিমাসে ২৪০ জন মৃত প্রবাসীর মধ্যে ৩০ থেকে ৩৯ বছর বয়সী ১৫০ শ্রমিক মারা যাচ্ছে। সে হিসাবে গত বছর ও চলতি বছরের নভেম্বর পর্যন্ত ৩ হাজার ৪৫০ শ্রমিক এই অল্প বয়সে মারা গেছে।

অল্প বয়সে শ্রমিকদের মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধানে জানা যায়, সাত আরব দেশ তথা সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, ওমান, বাহরাইন ও ইরাকে ২০১২ সাল থেকে ২০১৪ এই তিন বছরে মারা গেছে মোট ৫ হাজার ৩৩১ জন। এই তিন বছরে প্রবাসে মারা যাওয়া এসব কর্মীর মধ্যে স্ট্রোকে মারা গেছে ১৫৮৮ জন, হৃদরোগে ১০৯৩ জন এবং দুর্ঘটনায় মারা গেছে ১৬১৪ জন। বাকি ১ হাজার ৩৬ প্রবাসীর মৃত্যু হয়েছে অসুস্থতা ও স্বাভাবিক কারণে। তবে অস্বাভাবিক মৃত্যর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মারা গেছে সৌদি আরবে। সেখানে এই তিন বছরে ২ হাজার ২৬২ জন প্রবাসী শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে।

একইভাবে ২০১৩ সালে মারা যাওয়া দুই হাজার ৪৯৬ প্রবাসী শ্রমিকের মধ্যে মাত্র ১৫৯ জনের মৃত্যু ছিল স্বাভাবিক। একই বছর হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ৪৭০ জন, কর্মক্ষেত্রে ও সড়ক দুর্ঘটনায় ৬২৬ জন, অসুস্থতায় ২৯৮ জন, ক্যানসারে ৬২ জন এবং আগুনে পুড়ে মারা গেছে ২৬ জন। আর ১৯ জন আত্মহত্যা এবং নয়জন খুন হয়েছেন। বাকি ২০ জনের মৃত্যুর কারণ জানা যায়নি। এভাবে ২০০৫ থেকে ২০১৫ এর নভেম্বর পর্যন্ত গত ১০ বছর ১১ মাসে অন্যদেশে কাজ করতে গিয়ে বিদেশের মাটিতে মারা গেছে ২৬ হাজার ২০৬ বাংলাদেশি শ্রমিক।

ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশের (ইউল্যাব) সহকারী অধ্যাপক জালাল উদ্দিন শিকদার এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘প্রবাসী শ্রমিকদের অকাল মৃত্যর কারণ বলতে গেলে সরকারের কিছু গোড়ার দিকের পলিসির কথা বলতে হয়। তাহলো শ্রমিক পাঠানোর ক্ষেত্রে সরকার শুধু ‘কোয়ান্টিটি’ দেখে, ‘কোয়ালিটির’ দিকে চোখ রাখে না। তারা শুধু চায়, রেমিটেন্স এলেই হবে। তাই যেখানে পাঠানো হচ্ছে সেখানকার পরিস্থিতি সম্পর্কেও তারা দেখে না।’

‘আমাদের কর্মীরা সাধারণতই তাদের ওয়ার্ক আওয়ার, কাজের পরিবেশ, সে দেশের টেম্পারেচার এবং কি কাজ করতে হবে সেটাই জানে না। যার ফলে সেখানে অমানবিকভাবে তাদের কাজ করতে হয়। যেগুলো আমাদের সরকারের পক্ষ থেকে শ্রমিকদের আগেই জানানো উচিত ছিল’, বলে যোগ করেন এ গবেষক।

অল্প বয়সে মৃত্যর কারণ হিসেবে তিনি আরো বলেন, ‘আমাদের দেশে সাধারণত তাপমাত্রা থাকে ৩২ ডিগ্রি। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে যারা যায় তাদেরকে কাজ করতে হয় ৪৪ কিংবা ৪৩ ডিগ্রি তাপমাত্রার মধ্যে। আবার থাকতে হয় ১০-১২ জনের কোনো এসি ছাড়া একটি রুমে। সেখানে খাবারগত সমস্যা তো আছেই। এদিকে সেখানে গিয়ে অনেকেই চায় অল্প সময়ে বেশি কাজ করতে। কেননা তারা যে দেনা করেছে, তার সুদ গুণতে হবে বেশিদিন হলেই। তাই তাদের নিজের দিকে না তাকিয়ে অমানসিকভাবে কাজ করতে হয়। আবার অনেক সময় ভাষাগত ও দক্ষতার অভাবে কাজ ছাড়তে হয়। যার ফলে কাজের দিক থেকেও অনিশ্চিয়তার মুখে থাকতে হয়। আর এতে বেড়ে যায় দুশ্চিন্তা।’

উদারণ হিসেবে এই গবেষক বলেন, ‘মালয়েশিয়া পাম সেক্টরের একটা কাজ আছে। যেখানে পাম নামক একটি ফুল তুলতে হয়। সেই ‍ফুল যদি পায়ে পড়ে সঙ্গে সঙ্গে ফুলে উঠে। এরকম অনেক প্রতিকূল অবস্থায় অমানবিকভাবে কাজ করতে হয় আমাদের শ্রমিকদের। আর এগুলো অকাল মৃত্যর প্রধান কারণ। আমরা সরকারকে এসব ব্যাপারে বিশেষ করে যথাযথ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে পরীক্ষা-নীরাক্ষা করে শ্রমিক পাঠানোর জন্য বার বার বলে আসছি। কিন্তু তারা এখনো এসব সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন করতে পারেনি। অপরদিকে অনেকেই টাকার বিনিময়ে ভুয়া মেডিকেল রিপোর্ট দেখিয়ে বিদেশ চলে যায়। ফলে আনফিটনেস থাকার কারণে রোগ আরো বেশি হয়।’

এ ব্যাপারে অভিবাসী কর্মী উন্নয়ন প্রোগ্রামের (ওকাপ) নির্বাহী পরিচালক ওমর ফারুক চৌধুরী বলেন, ‘আসলে এসব মৃত্যর কারণ হলো প্রতিকূল আবহাওয়া এবং ওয়ার্ক আওয়ারের বেশি কাজ করা। অনেক শ্রমিককেই সেখানে নির্দিষ্ট সময়ের চাইতে বেশি কাজ করতে হয়। অনেকেই দেশে বেশি টাকা পাঠানোর চিন্তায় অল্টাইম কাজ করতে চায়। ফলে এক সময় তাদেরকেই মৃত্যুরকোলে ঢলে পড়তে হয় এই অল্প বয়সেই।’ এজন্য বিদেশে শ্রমিক পাঠানোর আগে কর্ম পরিকল্পনা ও তার স্বাস্থ্যের সঙ্গে সেই দেশের আবহাওয়া স্যুট করবে কি না তা পরীক্ষা করে পাঠাতে হবে বলেও জানান তিনি।(বাংলামেইল)