বিল গেটসের পছন্দের পাঁচ বই

অনেকেই হয়তো ভাবেন, ধনী মানুষরা বই পড়ার সময় পান না। তবে এ ধারণা একেবারেই যে ভুল, তার জ্যান্ত প্রমাণ বিশ্বের শীর্ষ ধনী বিল গেটস। বিশ্বখ্যাত প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান মাইক্রোসফটের এই সহপ্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক প্রধান নির্বাহী নিজে যেমন প্রচুর বই পড়েন, তেমনি অন্যদেরও বই পড়ার ব্যাপারে উৎসাহিত করেন।

নিজের পছন্দের বইয়ের তালিকা প্রায়ই তিনি অন্যদের সঙ্গে ভাগাভাগি করেন নিজের ব্লগ গেটসনোটস ডটকমের মাধ্যমে। বিশ্বের সেরা ধনী এই ব্যক্তির দেওয়া পাঁচটি বই সম্পর্কে জেনে নিন, পারলে পড়েও ফেলুন।
১. ‘সেভেনেভস’, নীল স্টিফেনসন
নীল স্টিফেনসনের লেখা সায়েন্স ফিকশন বই ‘সেভেনেভস’ সম্পর্কে বিল গেটস লিখেছেন, ‘গত এক দশকে আমি কোনো সায়েন্স ফিকশন বই পড়িনি। আমার এক বন্ধুর কথা শুনে এই বইটি পড়া শুরু করি। বন্ধুটিকে ধন্যবাদ, এই বইটা পড়তে বলার জন্য। প্রথম বাক্য থেকেই উপন্যাসটির প্লট শুরু, যখন চাঁদটা বিস্ফোরিত হয়। মানুষ বুঝতে পারে, আগামী দুই বছরের মধ্যে এক ভয়ংকর বন্যায় পৃথিবীর সবকিছু তলিয়ে যাবে। আর তাই পৃথিবীকে রক্ষার্থে এক হয় সবাই। শুরু হয় মহাকাশযান তৈরির কাজ। পৃথিবী ছেড়ে মহাকাশে যত বেশি মানুষকে পাঠানো যায়, সে চিন্তায়। আপনারা হয়তো মহাকাশ নিয়ে এত বিস্তারিত পড়তে পড়তে ধৈর্য হারিয়ে ফেলতে পারেন; কিন্তু লেখক স্টিফেনসন যিনি কি না সিয়াটলে থাকেন, লেখার আগে তাঁর গবেষণাটা ঠিকঠাকভাবে করেছেন। আমার কাছে প্রযুক্তিগত বিষয়ের বিস্তারিত আলোচনাগুলো ভালো লেগেছে। ‘সেভেনেভস’ পড়ার মাধ্যমে আবারও আমার সায়েন্স ফিকশন পড়ার ঝোঁক ফিরে এলো।’
২. ‘হাউ নট টু বি রং’, জর্ডান এলেনবার্গ 
এই বই সম্পর্কে বিল গেটস লিখেছেন, ‘এলেনবার্গ একজন গণিতবিদ ও লেখক। এ বইতে তিনি বর্ণনা করেছেন, অজ্ঞাতসারে গণিত কীভাবে আমাদের জীবনকে প্রভাবিত করে। প্রতিটি অধ্যায় শুরু হয় খুব সহজ বিষয় দিয়ে, যেমন—ইলেকটোরালের রাজনীতি অথবা ম্যাসাচুটসের লটারি। এবং পরে সেটাকে ঘুরিয়ে বিষয়টার সঙ্গে গণিত কীভাবে জড়িত, তা সুন্দরভাবে বুঝিয়ে দেন এলেনবার্গ। কিছু কিছু ক্ষেত্রে বিষয়গুলো বেশ জটিল হয়ে উঠেছে। কিন্তু লেখক লেখাগুলো এমনভাবে লিখেছেন যে শেষ পর্যন্ত পাঠককে পড়তেই হবে। বইটির বড় বিষয় হচ্ছে, এলেনবার্গ যেমনটা লিখেছেন, অঙ্ক করার মানে হচ্ছে গায়ে আগুন লাগার পরও যুক্তিযুক্ত আচরণ করা। আর সে কারণেই আমরা জীবনের সব সময়ই কোনো না কোনোভাবে অঙ্ক করে যাচ্ছি।’
৩. ‘দ্য ভাইটাল কোয়েশ্চেন’, নিক লেন
নিক লেনের এই বই নিয়ে বিল গেটস লিখেছেন, ‘নিক হচ্ছে সে রকম সত্যিকারের চিন্তাবিদদের একজন, যে আপনাকে তাঁর মতো করে ভাবতে বাধ্য করবে। আরো অনেকের এই লোকের কাজ সম্পর্কে জানা উচিত। বৈজ্ঞানিকভাবে ভুল একটি জিনিসকে তিনি ঠিক করার চেষ্টা করছেন। আর এই শক্তি তিনি নিচ্ছেন সব প্রাণীর কাছ থেকে। তিনি বলতে চাইছেন, কীভাবে আমাদের জীবন শুরু হয় এবং কীভাবে তা আস্তে আস্তে জটিল হয়ে ওঠে, সেটা বোঝার জন্য আমাদের বুঝতে হবে শক্তি কীভাবে কাজ করে। এটা শুধু তত্ত্বীয় কোনো বিষয় নয়। মাইটোকন্ড্রিয়া (আমাদের দেহকোষের শক্তিঘর) ক্যানসার ও অপুষ্টির বিরুদ্ধে লড়াই করতে পারে। এমনকি নিকের দৃষ্টিভঙ্গি যদি পরবর্তী সময়ে ভুলও প্রমাণিত হয়, আমি মনে করি মানুষের উৎস জানার ক্ষেত্রে শক্তির (এনার্জি) যে ভূমিকা রয়েছে, সেটা জানানোর ক্ষেত্রে নিকের গবেষণা উল্লেখযোগ্য অবদান রাখবে।’
৪. ‘দ্য পাওয়ার টু কম্পিট’, রিয়োচি মিকিতানি ও হিরোশি মিকিতানি
এ বইটি নিয়ে বিল গেটস লিখেছেন, ‘আজ থেকে ৩০ বছর আগে আমি প্রথম জাপান ভ্রমণ করেছিলাম মাইক্রোসফটের কাজে। তখনকার জাপানের জন্য আমি এক ধরনের দুঃখ অনুভব করি। আজকের জাপান অবশ্যই অনেক শক্তিশালী, যারা বৈশ্বিক অর্থনীতির খোঁজখবর রাখেন, তাঁরা এতে দ্বিমত পোষণ করবেন না জানি। ১৯৮০-এর দশকে জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে প্রতিবেশী দক্ষিণ কোরিয়া ও চীনের দ্বারা কুক্ষিগত হয়েছিল আর কীভাবেই বা তারা আবার নিজেদের ছন্দে ফিরে এসেছে, সেসব বিষয়ের বিস্তারিত পাবেন এই বইটিতে। আর এসব বিষয় উঠে এসেছে জাপানি অর্থনীতিবিদ রিয়োচি ও তাঁর ছেলে হিরোশির মধ্যে কথোপকথনের মধ্যে। ২০১৩ সালে মারা যান রিয়োচি। আর রিয়োচির ছেলে হিরোশি ইন্টারনেট প্রতিষ্ঠান রাকুতেনের প্রতিষ্ঠাতা। যদিও হিরোশির সব কথার সঙ্গে আমি একমত নই, তবে আমার মনে হয় তাঁর বেশ কিছু আইডিয়া দারুণ। ‘দ্য পাওয়ার টু কম্পিট’ আগামী দিনের আকর্ষণীয় একটি দেশের দিকে তাকানোর জন্য খুব ভালো একটি সুযোগ।
 ৫. ‘সেপিয়েন্স : আ ব্রিফ হিস্টরি অব হিউম্যানকাউন্ড’, নোয়া ইউভাল হারারি
এটাই গেটসের এবারের তালিকায় থাকা শেষ বই। এ বইটি বিল গেটস ও তাঁর স্ত্রী মেলিন্ডা গেটস দুজনেই পড়েছেন। বিল গেটস লিখেছেন, ‘আমি ও মেলিন্ডা দুজনেই এই বইটা পড়েছি। এবং রাতে খাবার টেবিলে আমরা দুজনেই এটা নিয়ে আলোচনা করেছি। মাত্র ৪০০ পাতার মধ্যে পুরো মানব সম্প্রদায়ের ইতিহাস লিপিবদ্ধ করার এক দুরূহ কাজ করেছেন লেখক হারারি। এ ছাড়া তিনি আমাদের আজকের মানবজাতি ও সামনের দিনের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, জিনতত্ত্ব প্রকৌশল ও অন্যান্য প্রযুক্তি নিয়ে লিখেছেন, যা ভবিষ্যতে আমাদের জীবনধারা পাল্টে দেবে। তবে তাঁর কিছু বক্তব্যের সঙ্গে আমার দ্বিমত আছে। বিশেষ করে তিনি দাবি করেছেন, চাষাবাদ শুরু করার আগে মানুষের জীবন উন্নততর ছিল। আমার এ বিষয়ে নিজস্ব কিছু বক্তব্য আছে। মানবজাতি নিয়ে যাঁদের আগ্রহ রয়েছে, তাঁদের অবশ্যই এই বইটি পড়া উচিত।’