আহমদ ছফা : দুঃখের দিনের দোহা

salimullah khanবুদ্ধিজীবীরা যা বলতেন, শুনলে বাংলাদেশ স্বাধীন হতো না। এখন যা বলছেন, শুনলে বাংলাদেশের সমাজ কাঠামোর আমূল পরিবর্তন হবে না।’

এই বিখ্যাত কথাটি যিনি একদিন উচ্চারণ করিয়াছিলেন এতদিনে তিনি বিগত হইয়াছেন। সেও আজ কম নহে, পনের বছর আগের কথা। আহমদ ছফা প্রাণত্যাগ করিয়াছিলেন ইংরেজি ২০০১ সালের ২৮ জুলাই। পরলোকযাত্রার আগের দশকে তিনি প্রায় প্রতি বছরই একটি একটি করিয়া ছোট ছোট বহি বাহির করিতেন। এই রকম এক বইয়ের নাম—‘রাজনীতির লেখা’ (১৯৯৩)। আরেকটি বহির নাম ছিল ‘আনুপূর্বিক তসলিমা এবং অন্যান্য স্পর্শকাতর প্রসঙ্গ’ (১৯৯৪)। আহমদ ছফা সচরাচর কোন নিবন্ধ একই সঙ্গে একাধিক বইয়ে ছাপাইতেন না। এটাই ছিল নিয়ম। আহমদ ছফার ব্যবসায় ছিল লেখা। তবে ব্যবসায় বিষয়ে তাঁহার বিশেষ লেখা ছিল না। জীবনের উপান্তে পৌঁছিয়া এদেশের ব্যবসায়ী অর্থাত্ বিষয়ী শ্রেণীর মন লইয়াও দুইচারি লেখা তাঁহাকে লিখিতে হইয়াছিল।

তাঁহার লেখা ‘বাংলাদেশের উঁচুবিত্ত শ্রেণী এবং সমাজবিপ্লব প্রসঙ্গ’ নাম দেওয়া একটি নিবন্ধ আছে। ভিতরের সাক্ষ্যপ্রমাণ দেখিয়া মনে হয় নিবন্ধটি ১৯৯০ সালের কোন একসময়ে লেখা। এই ক্ষেত্রে দেখিলাম তিনি তাঁহার সামান্য নিয়মের অতিক্রম করিয়াছিলেন। এই লেখাটি তিনি উপরে উল্লেখিত দুইটি সংগ্রহেই গ্রহণ করিয়াছিলেন। বর্তমানে সহজপ্রাপ্য ‘আহমদ ছফা রচনাবলি’র যথাক্রমে সপ্তম ও অষ্টম খণ্ডে ‘উঁচুবিত্ত’ লেখাটি পাওয়া যাইবে। এই পক্ষপাতদোষের নিশ্চয়ই কোন না কোন কারণ আছে। ধরিতে হইবে ঘটনা গুরুতর।

 

বিগত ১ জুলাই হইতে বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবী সমাজে যে ধরনের আলোচনার বন্যা দেখা দিয়াছে তাহাতে সামান্য কিছুক্ষণ ভাসিয়া মনে হইল আহমদ ছফার এই গুরুতর নিবন্ধটি আরেকবার পড়া যায়। বিষয় সামান্য নয়। ইংরেজি ১৯৮৯ সালের পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে—এপ্রিল মাসের কোন একসময়—বাংলাদেশের (প্রকৃত প্রস্তাবে ঢাকার) পুস্তক প্রকাশক সমিতি ধানমন্ডির মাঠে একটি গ্রন্থমেলার আয়োজন করিয়াছিলেন। ধানমন্ডির মাঠ মানে কলাবাগানের বিপরীত দিকের মাঠটি। মেলাটি—আহমদ ছফার কথায়—‘সাত কি আটদিন ধরে চলেছিল’। আমরা দেখিব এই মেলা আহমদ ছফারও চোখ খুলিয়া দিয়াছিল। কিভাবে বলিতেছি।

১. গ্রন্থমেলা বিষয়ে গ্রন্থকার ও বুদ্ধিজীবীদের অল্পস্বল্প আগ্রহ হওয়া স্বাভাবিক। আহমদ ছফারও হইয়াছিল। তিনি লিখিয়াছেন, ‘ঐ মেলায় বেচাবিক্রি কেমন হয় জানার আগ্রহ হয়েছিল।’ বয়ানটা বেশ শুনিবার মতো: ‘তাই একটুখানি কৌতূহলের বশেই প্রতিদিন সন্ধ্যেবেলা আমি ঐ মেলাতে গিয়েছি। কত টাকার বই বিক্রি হল প্রকাশকদের কাছে খোঁজখবর নিতে চেষ্টা করেছি। মুক্তধারার মতো প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীরা আমাকে জানালেন যে বইবিক্রির পরিমাণ কোনদিনই পাঁচশ টাকার উপরে যায়নি। অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের লোকেরাও জানালেন যে এই মেলায় এসে তাঁদের আসা-যাওয়ার খরচ পর্যন্ত ওঠেনি। অন্য একজন প্রকাশক আক্ষেপ করে বললেন, একেকটি মামুলি উপজেলার বইমেলায়ও এর চাইতে অধিক বইপত্র বিক্রি হয়ে থাকে। একটি উপজেলার বইমেলায়ও ধানমন্ডির চাইতে বেশি বইপত্র বিক্রয় হয়—এই তথ্যটি জানতে পেরে আমি একরকম আতঙ্কিত হয়ে উঠেছিলাম।’ ধানমন্ডি যে সে এলাকা ছিল না, এখনও এলাকাটি সম্পূর্ণ গৌরবশূন্য হইয়া গিয়াছে এমন কথা বলা যাইবে না। দেশের নেতৃশ্রেণীর মনুষ্যসাধারণ গুলশান ও বনানী প্রভৃতি এলাকার সহিত কাঁধে কাঁধ মিলাইয়া আজও এখানে বসবাস করেন।

ধানমন্ডি এলাকার বইমেলা কেন্দ্রে রাখিয়া লেখা আতঙ্কিত আহমদ ছফার কয়েকটি মন্তব্য এতদিন পরে পড়িয়া আমার মনে একটা প্রশ্ন দেখা দিয়াছে। ১৯৯০ সালে আহমদ ছফা যাহা শুনিয়াছিলেন সিকি শতাব্দী পর তাহাই কি বজ্রপাতের মতো সশব্দে আমাদের মাথায় বিস্ফোরিত হইতেছে? ঢাকার প্রকাশকরা সেদিন তাঁহাকে জানাইয়াছিলেন ধানমন্ডির মতো ধনী এলাকার মানুষজন বই পড়েন না, পড়িলেও বাংলা বই পড়েন না। স্বভাবদোষে প্রশ্ন করিতে পারি—কথাটা কি সত্য? কতদূর সত্য? যদি সত্য হয় ইহার পেছনের কারণ? বুদ্ধিজীবীরা কখনো বিষয়টা লইয়া ভাবিয়াছিলেন? ভাবিবার যোগ্য ভাবিয়াছিলেন? আমরা একটু পরে দেখিব বুদ্ধিমানদের মধ্যে কেহ কেহ ভাবিত হইয়াছিলেন। আহমদ ছফাও ছিলেন এই বুদ্ধিমানদের মধ্যে। ১৯৯০ সালে তিনি প্রায় হতবাক হইয়াছিলেন ঘটনার ঘনঘটায়। আহমদ ছফা উবাচ: ‘বাংলাদেশে বসবাস করে অথচ বাংলা ভাষার বইপত্র পাঠ করে না, এ কেমন কথা! বিষয়টি আমাকে ভাবিয়ে তোলে। বাংলা ভাষার বইপত্র না পড়া মানে তো বাঙ্গালি সংস্কৃতির সঙ্গে সম্পর্ক অস্বীকার করা। গোটা জাতির সবচাইতে শাঁসালো এবং সম্পন্ন অংশের সঙ্গে দেশের জ্ঞান, বুদ্ধি, কৃষ্টি ও সংস্কৃতির কোন সম্পর্ক না থাকলে দেশের কি রকম চেহারা দাঁড়ায়!’

প্রকাশক সমিতির আক্ষেপ মূল্যবান—এ সত্যে সন্দেহ নাই। এমনও তো হইতে পারে, বাংলাদেশের ছাপাখানা হইতে যে সকল বইয়ের নিক্ষেপ হয় সেগুলি ভদ্রলোকের পড়ার যোগ্য নয়। তাঁহারা হয়তো কলিকাতায় ছাপা বইপত্র পড়িয়া থাকেন। কিন্তু আহমদ ছফা মনে করেন এই সংকট আমাদের দেশের বইপত্রের মানে খুঁজিলে চলিবে না। খুঁজিতে হইবে শাসক বা নেতৃশ্রেণীর চরিত্রে। তিনি নিজেকেই সাক্ষী মানিলেন: ‘আমি অত্যন্ত বিস্মিত হয়ে লক্ষ্য করেছি আমাদের জাতীয় জীবনের মূলস্রোতের সঙ্গে আমাদের উচ্চবিত্ত শ্রেণীর কোন সংযোগ নেই। আমি নানা কার্যব্যপদেশে ধানমন্ডি, গুলশান, বনানী এলাকার অনেক আধুনিক রুচিসম্পন্ন ধনাঢ্য ভদ্রলোকদের বাড়িতে যাতায়াত করেছি। ঐ সকল এলাকায় কমসংখ্যক মানুষই ঘরে বাংলা ভাষায় কথা বলে থাকেন। তরুণ কমবয়েসি ছেলেমেয়েরা সে সকল বাংলা শব্দ ব্যবহার করে থাকে যেগুলোর ইংরেজি প্রতিশব্দ তারা জানে না। আর বাংলা বললেও এমন একটা ভঙ্গিতে বলে, মনে হবে আপনার প্রতি কৃপাবশত সে এই ভাষাটিতে বাতচিত করছে।’

আহমদ ছফার এই কথাগুলি এত সত্য যে আমার প্রথম প্রথম বিশ্বাসই হইতে চাহে নাই। সূর্য এত সত্য, তাহার দিকে খালি চোখে তাকান যায় না। তিনি যখন এই লেখাটি লেখেন তখন তখনই ইহা পড়িবার সৌভাগ্য হয় নাই আমার। কর্মদোষে তখন আমি বিদেশে। অনেকদিন হইল ফিরিয়াছি, কিন্তু এখনও বিশ্বাস করিতে পারিতেছি না। কেতাব খুলিয়া দেখি, আহমদ ছফা পুনর্বাচ: ‘এই সমস্ত ভদ্রলোক এবং ভদ্রমহিলা আকারে-প্রকারে, ভাবেভঙ্গিতে আপনাকে জানিয়ে দিতে কসুর করবেন না, নেহায়েত করুণা করেই, দায়ে পড়ে, ঠেকে এই দেশটিতে বসবাস করছেন। তাঁদের বাড়িঘরের আসবাবপত্রে, সাজ-সরঞ্জামে বাংলাদেশের কোন চিহ্ন আপনি খুঁজে পাবেন না। এঁদের ঘরের ছেলেমেয়েরা ভিসিপিতে বিদেশি ছবি দেখে থাকে। বিদেশি সঙ্গীত শুনে সঙ্গীতপিপাসা মেটায়, আচারে-ব্যবহারে কথাবার্তায় এমন একটা ভঙ্গি ফুটিয়ে তোলে যেন তারা এদেশের কেউ নয়।’ এই লেখার পর ছাব্বিশ বছর পার হইয়াছে। ভিসিপি জিনিশটা কি পদার্থ ছিল তাহাও ভুলিয়া গিয়াছি। একজনকে জিজ্ঞাসা করিয়া স্মরণ করিতে হইয়াছে। গত দুই যুগের শিল্পবিপ্লবে শুদ্ধ পুথি নহে, দেশের সহিত বিদেশের প্রভেদই বুঝি লোপ পাইতেছে।

২. আহমদ ছফা যাহা বলিয়াছিলেন তাহার সূক্ষ্ম একটা প্রতিধ্বনি শুনিলাম অকালপ্রয়াত চলচ্চিত্রকার আলমগীর কবিরের লেখা একপ্রস্ত বিশ্লেষণেও। এই বিশ্লেষণটি খুব সম্ভব ১৯৮০ সালের দশকে লেখা। পত্রিকা সম্পাদকের দেওয়া তথ্য অনুসারে, তিনি মৃত্যুর কিছুদিন আগে পত্রিকা বরাবর লেখাটি পাঠাইয়াছিলেন। তাঁহার অকালমৃত্যুর কিছুদিন পর—২৯ জানুয়ারি ১৯৮৯ তারিখে—লেখাটি দৈনিক ‘সংবাদ’ পত্রিকায় স্থান পায়। এই বিশ্লেষণযোগে আলমগীর কবির দেখাইতেছিলেন, ‘বাণিজ্যিক ছবির নির্মাতা ও দর্শকের যৌথ সহযোগিতায় রুচির ক্রমবর্ধমান অবক্ষয় নিশ্চিত করে সিনেমা আজ এদেশে এক মূলত প্রতিক্রিয়াশীল ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। “এদেশে” বলছি এজন্যে যে পার্শ্ববর্তী ভারত, শ্রীলঙ্কা, এমনকি পাকিস্তানেও দর্শকের শ্রেণীচরিত্রের এমন ব্যাপক পরিবর্তন আসেনি, যদিও বাংলাদেশের বিনোদন ছবির ধরন-ধারণ, চলন-বলন ও অন্যান্য চুটকি উপকরণ প্রধানত বম্বে, কোন কোন সময় হীরামন্ডি—সংস্কৃতি—নির্ভর পাকিস্তানী, ছবি থেকে ধার করা।’

আহমদ ছফা উদাহরণ দিয়াছিলেন ধানমন্ডির। আলমগীর কবির দিলেন—ঘটনাচক্রে—গুলশানের। সম্প্রতি গুলশান সংবাদ-শিরোনাম উপায় করিয়াছে বলিয়া কথাটা আচমকা মনে পড়িল। ১৯৮৯ সনে কবির দেখিয়াছিলেন গুলশান এলাকার সিনেমা হলে ঐ মহল্লার কোন খাস বাসিন্দা ছবি দেখার কষ্টটা স্বীকার করেন না। কবিরের লেখাটা শুরু হইয়াছে এইভাবে: ‘ঢাকার গুলশান মড়েল টাউন অভিজাত পাড়া। দেশী উচ্চবিত্ত, বিদেশী দীর্ঘমেয়াদী আগন্তুক এবং অধিকাংশ কূটনৈতিক দূতাবাস ও কর্মচারীদের আবাসিক এলাকা। তদানীন্তন ঢাকা উন্নয়ন সংস্থার পরিকল্পনামাফিক গুলশানের বাসিন্দাদের উপযোগী বিপণী কেন্দ্র, পার্ক, কৃত্রিম হ্রদ, আন্তর্জাতিক রেস্তোরাঁসহ এলাকার উপযুক্ত স্থানে একটি সিনেমা হলেরও ব্যবস্থা করা হয়েছে। কোন পর্যবেক্ষক যদি একদিন এই সিনেমাটির শো ভাঙ্গার সময় উপস্থিত থাকেন তাহলে একটি আশ্চর্য ঘটনা লক্ষ্য করবেন। দেখবেন শতকরা প্রায় একশজন দর্শকই লুঙ্গির ওপরে হাওয়াই শার্ট পরা আর পা দুইটি প্লাস্টিক স্যান্ডেলে আবৃত। এদের সবারই বসবাস গুলশান এলাকা বহির্ভূত পার্শ্ববর্তী গ্রামসমূহে।’ কে জানে এতদিনে হয়তো সেই হলটিই লোপ পাইয়াছে।

আলমগীর কবির কিন্তু আরো লিখিয়াছিলেন, ‘সেখানে যে সকল ছবি দেখানো হয় সেগুলো শৈল্পিক-মানবিবর্জিত তথাকথিত বাণিজ্যিক বায়োস্কোপ। সুতরাং গুলশানবাসীদের এই হলে এসে ছবি দেখার কোন কারণ নেই।’ তিনি প্রশ্ন তুলিয়াছিলেন—কেন এমন হইল? তাঁহার বিচারে প্রথম প্রথম—অর্থাত্ সেই ১৯৩০ সালের দশকে—বাংলা চলচ্চিত্র ছিল ‘ভীষণ রকমের জনপ্রিয় নবেল, গল্প ও নাটক-নির্ভর’। কবিরের মতে, ‘বাংলা ছবির এই বিশেষ চরিত্রটি এর মূল দর্শকশ্রেণীর চরিত্র নির্ধারণে সহায়তা করেছিল। শিক্ষিত বাঙ্গালি মাত্রেই ছিলেন সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষক এবং তদানীন্তন আর্থ-সামাজিক কারণে এঁদের অধিকাংশই ছিলেন সকল স্তরের মধ্যবিত্ত [শ্রেণী থেকে] উদ্ভূত। এঁরাই ছিলেন বাংলা ছবির মূল দর্শক। বাংলা উপন্যাসের আবেদন কদাচিত নিম্নবিত্তকে আকর্ষণ করত। এ কারণেই বাংলা ছবির দর্শকের মধ্যে নিম্নবিত্ত শ্রমজীবীর সংখ্যা ছিল নিতান্তই নগণ্য। কিন্তু তারাও ছবি দেখতেন এবং [দেখতেন] বিপুল সংখ্যায়। বাংলা ছবি নয়, সুদূর বম্বে বা লাহোরে নির্মিত “সর্বভারতীয়” হিন্দি উদ্ভট ছবি যেমন “হান্টারওয়ালী”, “তুফান মেইল”, “পাঞ্জাব মেইল”, “শেখ চিল্লী” প্রভৃতি।’

আলমগীর কবির লিখিয়াছেন, ‘কালে হিন্দি ছবির প্রভাব এমনই বৃদ্ধি পায় যে, শিক্ষিত বাঙ্গালি দর্শকও প্রভাবিত হয়ে পড়েন। তবুও মধ্যবিত্তই বাংলা ছবি এবং সামাজিক আখ্যানভিত্তিক হিন্দি ছবির প্রধান নিয়মিত দর্শক হিশেবে থেকে যায়।’ সে সময় এদেশে যে সকল ছবি বাজারে চলিতেছিল তাহাদের বিষয়ে কবিরের মন্তব্য মনোসংযোগ করিবার মতো: ‘নিম্নরুচির বাণিজ্যিক ছবিতে যারা অর্থলগ্নি করেন বা যারা এসব ছবির নিয়মিত প্রদর্শক তারা কঠিন ব্যবসায়ী।’

এইসব ছবির একটা রাজনৈতিক তাত্পর্যও আলমগীর কবির আবিষ্কার করিয়াছিলেন। ‘তাছাড়া,’ তিনি লিখিয়াছিলেন, ‘এইসব জৈবিক বিনোদনসর্বস্ব ছবির একটা রাজনৈতিক দিকও আছে। সার্বিক নৈরাজ্য এবং হতাশার প্রেক্ষাপটে এ জাতীয় ছবি গণ-আফিমের কাজ করে। তাই প্রত্যেক গণ-বিরোধী সরকার এসব ছবিকে রাজনৈতিক দোসর ভেবে পর্যাপ্ত নির্মাণ ও প্রচার সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করে।’ এই অবস্থা হইতে রাতারাতি পরিত্রাণের পথ আলমগীর কবির বাতলাইতে পারেন নাই। তিনি শুদ্ধ আশা প্রকাশ করিয়াছিলেন, ‘দেশ বঙ্গোপসাগরে ভেসে না গেলে সুবাতাস একদিন নিশ্চয়ই বইবে।’

বিশ্ব জুড়িয়া চলচ্চিত্রকলার প্রায় শতবর্ষ পূর্তির পূর্বক্ষণে (লেখার মুহূর্তে ৯২ বছরে) আলমগীর কবির গভীর হতাশায় ডুবিয়া গিয়াছিলেন। তাঁহার কথায়, ‘চলচ্চিত্রের সেই হারিয়ে যাওয়া দিনগুলো আর ফিরবে না। বিভাগোত্তর ওপার বাংলায় চলচ্চিত্রের মাধ্যমগত উত্কর্ষ উন্নতির চরম শিখরে পৌঁছাচ্ছে। এসেছেন সত্যজিত, ঋত্বিক, মৃণাল, বুদ্ধদেব, উত্পলেন্দু বা অপর্ণার মতো দীপ্তবীর্য চলচ্চিত্র-স্রষ্টা।’ তিনি অপার বেদনায় মূঢ় হইয়াছিলেন: ‘এপার বাংলায় একই স্টার্টিং পয়েন্ট থেকে আমরা দৌঁড়েছি বিপরীত দিকে—সাহিত্য থেকে লোকসাহিত্যে—সেখানে থেকে অন্ধকারাচ্ছন্ন শূন্যতায়।’ আলমগীর কবিরের গোড়ায়ও আছে এদেশের নতুন কুশীলব শ্রেণির চরিত্র বিচারের অভিন্ন তাগিদ। এই চরিত্র নিছক পরিবেশ বা বংশগতির ফসল এমন মনে করা ঠিক হইবে না। চরিত্রের পিছনে ইতিহাস আছে। (বাকি অংশ আগামীকাল)

বণিকবার্তার সৌজন্যে।