বাংলাদেশ মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাক

al mahmudনানা দুশ্চিন্তা ও দুর্ভাবনায় দিন কেটে যাচ্ছে। আমার পক্ষে তো কলম গুটিয়ে বসে থাকা সম্ভব নয়। তবে বাংলাদেশকে নিয়ে এখন আর বড় কোনো স্বপ্ন রচনার সুযোগ নেই। শুধু ভাবি বাংলাদেশ থাকলে আমরাও থাকব, বাংলাদেশের ভাগ্যের সাথেই আমাদের অদৃষ্ট ওতপ্রোতভাবে সম্পর্কিত। ইনশাআল্লাহ সবকিছু ঠিকমতোই পার হয়ে যাবে।

আমার লেখার বিষয় যখন আমাতে এসে দাঁড়ায় তখন একটু ‘আমি আমি’ তো এসেই যায়, এই ‘আমি’ শব্দটার মধ্যে যে ব্যক্তিত্ব লুকিয়ে থাকে তা অত্যন্ত দু:খ ও কষ্ট দিয়ে মথিত হয়ে আছে। দিন কেটে যায়। সকাল আসে আবার সন্ধ্যা হয়। এই আবর্তনের মধ্যে নিজের চিন্তা শত সহস্রাধিক ডালপালা মেলে দিয়ে আমাকে প্রবোধ দিতে থাকে। চিন্তার দিক দিয়ে আমি সুস্খির মানুষ না হলেও শেষ পর্যন্ত স্থিরতাই এসে আমাকে সান্ত্বনা দিতে থাকে।

 বড় কথা হলো এখনো আমি লিখতে পারছি। আমার বয়সী আর একজনও লেখার দায়দায়িত্ব বহন করে লেখার কাজ চালিয়ে যেতে পারছে না। আমার এই পারঙ্গমতার জন্য আমার প্রভুর কাছে গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি। লেখালেখির জগৎ এখন বাংলাদেশের জন্য একরকম অন্ধকারাচ্ছন্নই বলা যায়। এর মানে এই নয়, এ দেশে চিন্তা-ভাবনা করার মতন মানুষ আর অবশিষ্ট নেই। অনেক নতুন মানুষ ও তরুণ প্রজন্ম সময়ের সাক্ষী হয়ে নি:শব্দে নিজের কাজ করে চলেছে। আমার সাথে পরিচয় বা দেখা-সাক্ষাৎ না হলেও আমি জানি তারা আছে। এবং তারা একই সাথে তাদের সৃজনশীল কাজ করে চলেছেন।

যারা প্রতিবাদী মানুষ তাদের সৃজনশীল কর্মে বর্তমান সময়ের বিরুদ্ধে নালিশের বাক্য যোজনা করে চলেছেন। এই অবস্থাটা বন্ধ্যাত্বের অন্ধকারে আচ্ছন্ন হয়ে থাকবে এটা ভাবি না। নিশ্চয়ই এ অবস্থার একটা পরিবর্তন ঘটে যাবে। সহসাই ঘটে যাবে। এ দেশে সবচেয়ে বিপদ হলো ঈমানদার মানুষের। তারা অবশ্য মুখে যা খুশি তা-ই বলতে পারেন না। হিসাব করে কথা বলতে হয়। তাহলেও কেউ কারো কথা বলার বা লেখালেখি করার স্বাধীনতা তো আর মুলতবি রাখতে পারেন না। এ অবস্খা কত দিন চলবে তা কে জানে? আমার মনে হচ্ছে মানুষের রুদ্ধ কণ্ঠ আর রুদ্ধ থাকবে না। সহসাই তা ফেটে পড়বে প্রতিবাদে। আমার আক্ষেপ হলো, এই ঢাকা হাজারো লেখকের আবাসভূমি। এখানেই বাংলা ভাষা সতত স্বাধীনতার স্ফূর্তি পেয়ে বেজে উঠেছিল। এখন এই নিস্তব্ধতার পিরিয়ডে কে কোথায় ছিটকে পড়েছেন, তা আমার জানা না থাকলেও আমার বিশ্বাস প্রতিবাদের তুফান আসছে, এই তুফান ঠেকাবার সাধ্য বর্তমান নিস্তব্ধতার নেই।

মানুষকে বাক্য স্ফূর্তির স্বাধীনতা দিতে হবে। দিতে হবে সমালোচনা ও প্রতিবাদে মুখর হওয়ার অধিকার। যারা এই দেশটিকে নিয়ে নানা স্বপ্নের কথা বলেন, তাদের স্বপ্নকে সার্থক করার আয়োজন করতে হবে। এ দেশে কোনো কালেই মানুষের মুখে সেলাই দেয়া যায়নি।

ঢাকা শহর অনেক প্রাচীনকাল থেকেই বুদ্ধিবৃত্তির স্বাধীনতা ভোগ করে এসেছে। এই শহরকে যারা চেনে তারা সবাই জানে বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে একাত্তরের স্বাধীনতা যুদ্ধ পর্যন্ত মানুষের অধিকারের জন্য মানুষের লড়াই অব্যাহত থেকেছে। যারা সাহিত্যের কাজ করেন, তারা দেশের নানা প্রান্ত থেকে এই ঢাকায় এসে স্বস্তিবোধ করেন। কারণ, ঢাকা হলো বিপ্লবের ধাত্রী। নতুন চিন্তার নিয়ামক শক্তি। ঢাকা হলো প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশের নির্ভীকতার রাজধানী। ঢাকাকে কেউ নতজানু করতে পারেনি। আশা করছি, আগামী ভবিষ্যতে এই মহানগরীর মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকার স্বাধীনতাকে কেউ চ্যালেঞ্জ করতে পারবে না।

সাহিত্যে নতুন বিপ্লব সৃষ্টি করতে হলে নতুন চিন্তায় উদ্ভাসিত গল্প উপন্যাস কবিতা রচনা করতে হবে। আমাদের লেখকের কোনো অভাব ছিল না, কিন্তু সাম্প্রতিক পরিস্খিতিতে অনেকেই লেখালেখি ছেড়ে দিয়েছেন। এটা অশুভ লক্ষণ।

সুদিনের জন্য অপেক্ষা করলে সুদিন আসে না। সুদিনকে ডেকে আনতে হয়। ডেকে আনতে হয় রক্তরাঙা পথে। কোনো বিপ্লবই সহজ কাজ নয়। কারণ, রক্তদান ছাড়া মানুষের সুখ মানুষের করায়ত্ত হয় না। এ দেশে অনেক শৃঙ্খল, অনেক অনিয়ম-অনাচার ভেঙে ফেলতে হবে। এবং ভেঙে ফেলার জন্য তারুণ্যের সমাবেশ ঘটাতে হবে। এমন তরুণ যিনি বিশ্বাস ও ঈমানে বলীয়ান। আমরা নাস্তিকতা ও দোদুল্যমানতা অনেক দেখেছি। দীর্ঘকাল এদের গায়ের জোরের শাসন আমাদের ওপর চাপিয়ে দেয়া হয়েছে। এখন এ থেকে মুক্তির সংগ্রাম শুরু হয়েছে। ঈমানদার তারুণ্যের কণ্ঠস্বর আমরা শুনতে পাচ্ছি। ইনশাআল্লাহ এরাই বিশ্বাসের বিজয়কে সুনিশ্চিত করবেন। এই ঢাকা মহানগরীতে বাল্য থেকেই আমার বসবাস, আমি এই মহ্গারীকে অন্তর দিয়ে ভালোবাসি, এর স্বভাব-চরিত্র আমার জানা আছে। এর মন-মানসিকতা ঈমান দিয়ে আপ্লুত, এটা নাস্তিকতা ও দোদুল্যমান চরিত্রের সাথে আপস করে চলতে পারবে না। তবে এর ভেতরে অনেক বর্ণচোরা বিশ্বাসঘাতকের দল নিজেদের চেহারা ও চরিত্র গোপন করে গা-ঢাকা দিয়ে আছে। এরা জানে না, তাদের অস্তিত্বও বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের সাথেই জড়িত। আমি বহুবার বলেছি, আমাদের সৃজনশীল মানুষের খুবই দরকার। সবকিছুরই সংখ্যা বাড়ছে, কিন্তু সৃজনশীল উদ্ভাবক শক্তিসম্পন্ন মানুষের সংখ্যা বাড়ছে না। এ ব্যাপারে ক্ষেত্র তৈরি করে দেয়ার প্রয়াস চালাতে হবে। লেখক মানুষ যদি আত্মগোপন করে থাকেন, তাহলে ষড়যন্ত্রকারীরাই সুবিধা লোটার চেষ্টা করে। আমার কথা হলো, আপনি যদি ঈমানদার লেখকের সৃজনশীলতার অধিকারী হয়ে থাকেন তাহলে আত্মগোপন করে থাকাটা এই সময়ের জন্য খুবই অন্যায়। বিশ্বাসী মানুষের ঈমানদার চরিত্রের পরিচয় বহন করতে হবে। আত্মপ্রকাশ করতে হবে। আত্মোৎসর্গ করতে হবে। লিখে জানাতে হবে যে, আপনি আছেন।

শুধু হাঁকডাক বা হা-হুতাশ করলে জাতির দুর্ভাগ্য ঘোচে না। এর জন্য সংঘবদ্ধ হয়ে ঈমানদার তরুণের লড়াই প্রয়োজন। আমার জানা আছে যে, এ ধরনের লড়াই চালাবার মতন মানুষ আমাদের আছেন। তবে তারা সংঘবদ্ধ নন। নেতৃত্বের অভাবে এরা যত্রতত্র ছড়িয়ে-ছিটিয়ে নিজেদের নৈঃশব্দের মধ্যে ঢেকে রেখেছেন। ইচ্ছার আকুলতা ছাড়া কোনো আদর্শকে বিজয়ী করা যায় না। বাসনা থাকতে হবে বিজয়ের বাসনা। ত্যাগ-তিতিক্ষা থাকতে হবে এবং আমিত্বের অহঙ্কার ছাড়তে হবে।

যারা লিখে বাঁচতে চায় আমি সে ধরনের মানুষেরই দলভুক্ত। লিখতে হলে শিখতেও হয়, কিন্তু বর্তমান সময়টা নতুন উদ্ভাবনার জন্য অসুবিধাজনক, কার কাছে শিখব? সবাই তো আত্মরক্ষার জন্য অìধকারে মুখ লুকিয়ে আছেন। কিন্তু সময়ের দাবি হলো আত্মপ্রকাশের দাবি, আমি নিজের গৃহ থেকে বিভিন্ন জায়গায় যাওয়ার আমন্ত্রণ পাই। প্রতিশ্রুতিও দিতে হয়। অথচ প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে পারি না। এখন ভেবেছি, আর কাউকে কোনো প্রতিশ্রুতি দেব না। নিজের ঘরে থেকে আমার যতটুকু সাধ্য তা লিখে জানাব। এই সময়টা আমরা ডেকে আনিনি। এটা আপতিকভাবে আমাদের ওপর আপতিত হয়েছে। দু:খ-কষ্টের মধ্যে মানুষ অভ্যস্ত হয়ে যাওয়ার ভান করলেও হৃদয়ের যন্ত্রণা ধামচাপা দিতে পারছে না। যেকোনো সময় একটা মানবিক প্রতিবাদের ঝড় উঠতে পারে বলে আমার আশঙ্কা হয়। তবে ঝড় দুর্যোগ দুর্ভাবনা বাংলাদেশের নিয়তি হয়ে উঠবে এটা আমাদের কাম্য নয়। অবশ্যই এর একটা বিহিত ব্যবস্খা আছে, আর সেটা হলো নিজের জায়গায় দাঁড়িয়ে সাধ্যমতো প্রতিবাদের ভাষা উচ্চারণ করা। আমি আগেই বলেছি, সুদিন এমনি আসে না। তাকে ডেকে আনতে হয়। এর প্রাথমিক কাজ হলো বিশ্বাসী মানুষের মধ্যে পারস্পরিক চেনাজানা বাড়ানো। আত্মীয়তার বìধন সৃষ্টি করা। অর্থাৎ সংগঠিত হওয়ার প্রয়াস করা। ঐক্যবদ্ধ ঈমানদার মানুষের স্রোত ঘূর্ণি তুলে এগিয়ে আসার সম্ভাবনাকে আমি স্বপ্নের মধ্যে অবলোকন করি। আমি যাদের জন্য লিখি আমি তো তাদের চেহারা দেখতে পাই না। তাহলেও এ কথা জানি কেউ অìধ হলে প্রলয় বাধ থাকে না। ঝড় যখন আসবে তখন ঝড়ের ঝড়ো হাওয়া আমাকেও তোলপাড় করে বয়ে যাবে। এটাই নিয়ম।

অনেকে বলেন, আমি নিজের কথা একটু বেশি উথাপন করি। কথাটা মিথ্যা নয়। কারণ কেন জানি মনে হয় বাংলাদেশের উদ্ভাবনা ও অস্তিত্বের সাথে আমার একটা সম্পর্ক আছে। আমি ইচ্ছা করলেই এই সম্পর্কের বিপরীতে দাঁড়াতে পারি না। আমার এখনো মনে আছে, স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় দলে দলে ছেলেরা ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। ওই মুক্তির লড়াইয়ের সাথে কোনো কিছুর তুলনা হয় না। সেই সময়ের মনোভাব ছিল শুধু আত্মদানের মনোভাব। আবার বাংলাদেশের জন্য ঈমানদার মানুষের স্রোত তৈরি করতে হবে। সংঘটিত করে তুলতে হবে আসন্ন আত্মত্যাগের মহিমায় উজ্জ্বল একটি দিনের।

বাংলাদেশ কোনো সহজ স্বাভাবিকতার মধ্যে সৃষ্টি হয়নি। এর জন্য অনেক মানুষ অকাতরে আত্মবলি দিয়েছেন। এখন যদি সেটা আমরা ভুলে যাই আমাদের পরিণতি হবে মর্মান্তিক। আমরা জনগণের সাথে বেঈমানি করতে পারব না। আমরা দেশবাসীকে ঈমানের প্রতিশ্রুতি শুনিয়েছি। সে জন্য বাংলাদেশ হবে ঈমানদার মানুষের মাতৃভূমি।

এমন ভাবা যায় না যে, ষড়যন্ত্রকারীরা হাত গুটিয়ে, চুপ করে বসে আছে। সব সময় তারা বাংলাদেশকে অন্যের প্রভাবে প্রভাবিত করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। কিন্তু বাংলাদেশের জনগণ একবাক্যে নি:শ্বাসে-প্রশ্বাসে যে হাওয়া টানছে সেটা হলো স্বাধীন স্বার্বভৌম বাংলাদেশের ঝড়ো হাওয়া। আল্লাহর রহমতে বাংলাদেশ প্রাচ্যে বিশ্বাসী মানুষের সাফল্যের এক দৃষ্টান্ত হয়ে টিকে থাকবে। ইনশাআল্লাহ বাংলাদেশকে কোনো আধিপত্যবাদী শক্তির হুমকিতে প্রকম্পিত দেখা যাবে না।

আবার সাহিত্যের কথায় ফিরে আসি। যারা স্বতন্ত্র স্বাধীন সুন্দর কাব্য সৃষ্টির প্রয়াসী তারা জেগে উঠুন। তাদের হাতে বাংলাদেশের একটি স্বতন্ত্র আধুনিক কাব্য ভাষার সম্ভাবনা দেখতে পাচ্ছি। এ নিয়ে আগেও লিখেছি। আবারো বলতে চাই, কবিতা হলো মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির সবচেয়ে স্বপ্নময়তার ভিত্তি রচনাকারী। এ দেশে এ মুহূর্তে কবিদের হাতে একটি নতুন কাব্যভাষা নির্মিত হওয়ার তাগাদা সৃষ্টি হয়েছে। এই তাগাদা মিটাতে হলে সাহসের সাথে নতুন কবিতার আয়োজন করতে হবে।

এই সুযোগ বারবার আসবে না, কালোর আবর্তনে একেকটি জাতি এক-আধবার এই সুযোগ উপভোগ করার যোগ্য হয়ে ওঠে। বাংলাদেশের আকাশে যতই দুর্যোগের ঘনঘটা থাক এর সৃজনশীল ক্ষেত্রে এখন জোয়ারের উপচানো সময়। এই সময়ের দাবি পূরণ করতেই হবে, লিখতে হবে সবচেয়ে আধুনিকতম নতুন কবিতা। আমার ওপর সব লেখার চাপ সৃষ্টি করা ঠিক হবে না। এই কাজ সবার মধ্যে ভাগ-বন্টন করে নিতে হবে। তবেই আসবে কাব্য ভাষায় নতুন সৃজনশীলতা ও উদ্ভাবনার জোয়ার। আমি প্রথমেই বলেছি, বাংলাদেশে ঈমানদার মানুষের একটি ঘূর্ণি তোলার উদ্ভাবনার জোয়ার আসছে। কিন্তু তা যে এত তাড়াতাড়ি আসবে, আমি নিজেও ভাবতে পারিনি। এই সময়টাকে ঠিকমতো ব্যবহার না করতে পারলে সময় কারো জন্য বসে থাকবে না। সে কালস্রোতে মিলিয়ে যাবে।

এটা কোনো সঙ্কেত বাক্য নয়। এটা সত্য ও স্বাভাবিক গতি সম্বন্ধে একজন অভিজ্ঞ লোকের সতর্কবাণী মাত্র। লিখতে হবে লেখকের সমস্ত হৃদয়ের শক্তি উজাড় করে। জাতির জন্য স্বপ্ন সৃষ্টির দায়িত্ব হলো কবিদের। অলসতার কোনো সুযোগ নেই। যদিও অনেক সময় আলস্যকে উদ্ভাবনার কারণ বলে মনে হয়। আমাদের জন্য আলস্য একেবারেই অপঘাতস্বরপ। আমরা সদা জাগ্রত সৃজনশীল মানুষের ভূমিকায় সতর্ক থাকব। এর চেয়ে বড় প্রতিজ্ঞা আর কিছু নেই। বাংলাদেশ মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাক, এটাই আমাদের প্রার্থনা। নতুনবার্তা।