বিশ শতকে দেশে দেশে সেনা অভ্যুত্থান

revolutionতুরস্কে সেনা অভ্যুত্থান চেষ্টা এখন বিশ্বের আলোচনার প্রধান খোরাকে পরিণত হয়েছে।এ নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় নানা রকম মন্তব্য করা হচ্ছে।গণমাধ্যমগুলোও নানা রকম প্রতিবেদন ছাপছে। অনেকেই এই অভ্যুত্থান চেষ্টার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে দায়ী করছে।এর আগে তুরস্কে তিন তিনটি সেনা অভ্যুত্থানের পেছনেও যুক্তরাষ্ট্রের হাত থাকার অভিযোগ রয়েছে। এবার তুরস্ক যুক্তরাষ্ট্রকে সরাসরি দায়ী না করলেও যুক্তরাষ্ট্রের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে থাকা এরদোয়ানের তীব্র সমালোচক ফেতুল্লাহ গুলেনের দিকে আঙ্গুল তুলেছে তুরস্কের সরকার।

তবে যাই হোক এই শতাব্দীতে সেনা অভ্যুত্থানের ঘটনা তেমন একটা না ঘটলেও বিংশ শতাব্দীকে বলা হয়ে থাকে সামরিক অভ্যুত্থানের যুগ। বিশেষ করে এশিয়া, আফ্রিকা এবং দক্ষিণ আমেরিকার উন্নয়নশীল দেশগুলোতে অভ্যুত্থান হয় বেশি। স্নায়ুযুদ্ধ কালেই সেনা অভ্যুত্থানের খবর বেশি শোনা যেত। তখন দ্বন্দ্বটা ছিল ওই সময়কার দুই পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে।

যখন কোনো দেশের সরকার প্রধান ক্ষমতা, আঞ্চলিক রাজনীতি ও অর্থনৈতিক স্বার্থের ক্ষেত্রে শক্তিশালী দেশগুলোর জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াত, তখন ওইসব দেশে দ্রুত সরকার পরিবর্তন করতে সামরিক অভ্যুত্থানকে প্রধান অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতো এই দুই পরাশক্তি। এ ক্ষেত্রে ভাবাদর্শও ভূমিকা রাখতো। তবে তা ছিল শুধুমাত্র স্নায়ুযুদ্ধকালীন বাস্তবভিত্তিক রাজনীতির স্বার্থে।

দুই পরাশক্তিই বিভিন্ন দেশের রাজনীতি ও সামরিক বাহিনীতে হস্তক্ষেপ করতে তাদের গোয়েন্দা এজেন্টদের ব্যবহার করতো। তারা সামরিক অভ্যুত্থান সফল করতে অর্থের যোগান ও পরিকল্পনায় সহায়তা করতো। যাতে করে তাদের পছন্দের সরকার বা শাসক ক্ষমতা দখল করতে পারে।

এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে সফল যুক্তরাষ্ট্র। এশিয়া, আফ্রিকা এবং দক্ষিণ আমেরিকাতে বেশ কিছু সফল সামরিক অভ্যুত্থানে অর্থ সাহায্য ও কলকাঠি নেড়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। এর কারণ ছিল টেকসই সামরিক শাসককে ক্ষমতায় নিয়ে আসা। আর এই ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র বড় বাধা হিসেবে দেখত বামপন্থি বিপ্লবীদের। যা তারা করেছিল কিউবা, অ্যাঙ্গোলা এবং নিকারাগুয়ের ক্ষেত্রে। কারণ এসব দেশগুলোর সোভিয়েত শিবিরের দিকে ঝোঁক ছিল।

মার্কিন মদতপুষ্টে দক্ষিণ আমেরিকার বেশ কয়েকটি দেশে সবচেয়ে নৃশংস সামরিক অভ্যুত্থান ঘটেছিল। দেশগুলো হচ্ছে, গুয়াতেমালা, চিলি, আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল এবং এল সালভাদর। এসব দেশগুলোর শাসকরা বামপন্থি এবং তারা সোভিয়েত ইউনিয়নকে শক্তিশালী করে দক্ষিণ আমেরিকায় প্রভাব বিস্তারে কাজ করছিল।

অভ্যুত্থানের চক্রান্তের মাধ্যমে এই ধরনের পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছিল শাসকদের উৎখাত করার জন্য। তাদেরকে সোভিয়েত শিবিরের সহচর হিসেবে মনে করা হতো। আঞ্চলিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থের হুমকি হয়ে দাঁড়ালে এভাবেই যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য পশ্চিমা শক্তিশালী দেশ অভ্যুত্থান সৃষ্টি করতো। এশিয়ার দেশগুলোতে এমনটাই হয়েছিল।

১৯৫২ সালে বামপন্থি জাতীয়তাবাদী শক্তি ইরানের ক্ষমতায় এসেছিল। যার কর্মকাণ্ড ছিল ইরানের রাজতন্ত্রের বাইরে। তিনি ক্ষমতায় এসে দেশের আমেরিকান এবং ব্রিটিশ তেল কোম্পানিগুলোকে জাতীয়করণ করার জন্য একটি প্রকল্প হাতে নেন। পরে ১৯৫৩ সালের দিকে যুক্তরাষ্ট্র এবং ব্রিটেনের হস্তক্ষেপে সামরিক বাহিনী অভ্যুত্থান ঘটিয়ে কৌশলে তাকে ক্ষমতাচ্যুত করে।

যুক্তরাষ্ট্র এসময় তাদের গোয়েন্দা এবং ইরানি এজেন্টদের ব্যবহার করেছিল। হাস্যকরভাবে, জাতীয়তাবাদী শাসককে হটাতে ইরানের ধর্মীয় নেতাদের একটি বড় অংশকেও তখন ব্যবহার করা হয়েছিল। পরবর্তীতে একটি সেনা অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ইরানের ওই শাসককে অপসারণ করা হয়।

ইন্দোনেশিয়াতে জাতীয়তাবাদী নেতা ও প্রেসিডেন্ট সুকর্ন বিরোধীদের অর্থায়ন করেছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। কারণ জাতীয়তাবাদী নেতা হওয়া সত্ত্বেও ইন্দোনেশিয়ার বৃহৎ কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে যোগসূত্র ছিল সুকর্নর। ১৯৬৫ সালের দিকে শাসকের ধীরগতির সংস্কার দেশে হতাশা বাড়ছিল। তারা তখন বামপন্থি সামরিক কর্তাদের সাহায্যে সুকর্নকে উৎখাত করতে মহিরা হয়ে উঠলো। পরে মার্কিন সমর্থিত একটি শক্তিশালী সামরিক বাহিনীর হস্তক্ষেপে এবং মৌলবাদী ধর্মীয় সংগঠনগুলোর সদস্যেদের গণহত্যায় প্ররোচিত করা হয়। কমিউনিস্ট পার্টি এবং তাদের সমর্থকদের বিরুদ্ধে ব্যাপক নৃশংসতার অভিযোগ ওঠে। ইন্দোনেশিয়ার হাজার হাজার নাগরিক এই গোলযোগে প্রাণ হারান। এরপরই মার্কিন মদতপুষ্ট ইন্দোনেশিয়ার সামরিক প্রধান জেনারেল সুহার্তো সেনা অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসেন।

১৯৭১ সালে কমিউনিস্ট বিরোধী এবং যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত থাইল্যান্ডের স্বৈরশাসক ফিল্ড মার্শাল থানম কিট্টিকাচর্ন সরকারের বিরুদ্ধে রাজপথে আন্দোলন শুরু হলে তিনি থাই সেনাবাহিনীর মধ্যে শুদ্ধি অভিযান চালান। তিনি মনে করেছিলেন, কিছু সোভিয়েত ইউনিয়ন সমর্থক সামরিক কর্মকর্তা তার বিরুদ্ধে অভ্যুত্থানের পরিকল্পনা করেছিল।

থাইল্যান্ডে ১৯৭৬ সালে মার্কিন মদতে আরেকটি সামরিক অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়েছিল। তখন সোভিয়েত এবং চীন সমর্থিত ছাত্র সংগঠনের একটি আন্দোলন সহিংস রূপ নেয়। পরে তাদেরকে নৃশংসভাবে হত্যা করে অভ্যুত্থানের নেতারা।

দক্ষিণ কোরিয়ায় ১৯৬১ এবং ১৯৭৯ সালে দুটি সেনা অভ্যুত্থানে সরাসরি সহযোগিতা করে যুক্তরাষ্ট্র। দক্ষিণ কোরিয়া এবং উত্তর কোরিয়ার মধ্যে যেকোনো আলোচনা চেষ্টার পদক্ষেপকে ব্যর্থ করে দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র।

১৯৭৫ সালে বাংলাদেশে সংঘটিত নৃশংস সেনা অভ্যুত্থানে যুক্তরাষ্ট্রের মদত ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।তবে এই অভিযোগের স্বপক্ষে অকাট্য কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

১৯৫৮ সালেও পাকিস্তানে সেনা অভ্যুত্থানে যুক্তরাষ্ট্রের হাত ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। ধারণা করা হয়, সোভিয়েত সমর্থিত বামপন্থি দল ন্যাপ ১৯৫৯ সালের নির্বাচনে জয় পেতে পারে।

আফ্রিকার বিভিন্ন সেনা অভ্যুত্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। পরবর্তীতে কেন্দ্রীয় আফ্রিকায় ঘন ঘন সেনা অভ্যুত্থান ও বিশৃঙ্খলার কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন উভয় পরাশক্তি আফ্রিকার দেশগুলোতে তাদের হস্তক্ষেপ উঠিয়ে নেয়। কারণ তারা মনে করেছিল, স্নায়ুযুদ্ধে প্রভাব রাখতে আফ্রিকায় যথেষ্ট সম্পদ বা আঞ্চলিক গুরুত্ব নেই। তবে যুক্তরাষ্ট্রের মদতে আফ্রিকায় সবচেয়ে নৃশংস সেনা অভ্যুত্থান ঘটেছিল ১৯৬০ সালে কঙ্গোতে। দেশটির বামপন্থি জনপ্রিয় জাতীয়তাবাদী প্রেসিডেন্ট প্যাট্রিস এমারি লোমুম্বা যখন সোভিয়েত ইউনিয়নের কাছে সহায়তা চেয়েছিল।

শুধু যে সোভিয়েত ইউনিয়ন সমর্থক হলেই যুক্তরাষ্ট্র সেনা অভ্যুত্থানে সহযোগিতা করেছে তা নয়। অনেক সময় মার্কিন সরকার সমর্থিত শাসকদের বিরুদ্ধেও তারা সামরিক অভ্যুত্থান ঘটিয়েছে।

১৯৬৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের অনুগত দক্ষিণ ভিয়েতনামের প্রধান ব্যক্তি নগো ডিন ডায়েমের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থানের অনুমোদন দেয় যুক্তরাষ্ট্র। ডায়েম সোভিয়েত সমর্থিত উত্তর ভিয়েতনামের সশস্ত্র বাহিনী এবং কমিউনিস্ট ভিয়েত কং গেরিলাদের বিরোধী সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। যুক্তরাষ্ট্র মনে করেছিল, কমিউনিস্ট হুমকি এবং দক্ষিণ ভিয়েতনামের অশান্তি নিরসনে ডায়েম যোগ্য ছিল না।

তুরস্ক মার্কিন নেতৃত্বাধীন ন্যাটো জোটের সহযোগী দেশ। কিন্তু ১৯৬০, ১৯৭১ এবং ১৯৮০ সালে দেশটিতে সংঘটিত সামরিক অভ্যুত্থানে মদত দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র।

স্নায়ুযুদ্ধকালীন যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় সোভিয়েত ইউনিয়ন খুব কম সংখ্যক সামরিক অভ্যুত্থানে জড়িত ছিল। এর প্রধান কারণ হচ্ছে, সোভিয়েত ইউনিয়নের নীতি ছিল অর্থের যোগান, বিপ্লব এবং জঙ্গি সৃষ্টি করে শাসকদের ক্ষমতাচ্যুত করা। উদাহরণস্বরূপ, দক্ষিণ আমেরিকার কোনো দেশে সোভিয়েত ইউনিয়নের সমর্থনে সেনা অভ্যুত্থান হয়নি। তার পরিবর্তে সোভিয়েত ইউনিয়ন বামপন্থি গেরিলা আন্দোলন ও শাসক সৃষ্টিতে ব্যাপক মনোযোগ দিয়েছিল।

১৯৪৫ সালে ইউরোপে প্রথম সেনা অভ্যুত্থান ঘটায় সোভিয়েত ইউনিয়ন। রোমানিয়ার কমিউনিস্ট পার্টি এবং সামরিক বাহিনীকে সহযোগিতা করে সোভিয়েত। উদ্দেশ্য ছিল, সব বিরোধী দলকে নিশ্চিহ্ন করে কমিউনিস্টপন্থি স্বৈরাচার শাসক ক্ষমতায় আনা। সোভিয়েত এই নীতির পুনরাবৃত্তি ঘটায় ১৯৪৮ সালে চেকোস্লোভাকিয়াতেও। যদিও ১৯৫০ থেকে ১৯৬০ সাল পর্যন্ত সিরিয়া, মিশর এবং ইরাকে সংঘটিত সেনা অভ্যুত্থানে সোভিয়েত ইউনিয়ন জড়িত ছিল না। কিন্তু দেশগুলোর ক্ষমতায় আসা সামরিক শাসকদের ওপর প্রভাব বিস্তার করেছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন। ১৯৬৯ সালে লিবিয়াতে সংঘটিত সেনা অভ্যুত্থানেও সোভিয়েত জড়িত ছিল না। তবুও লিবিয়ার সামরিক শাসক সোভিয়েতপন্থি ছিল।

১৯৯০ সালে স্নায়ুযুদ্ধের শেষ হওয়ার পর সামরিক শাসকের স্থলে গণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় আসতে থাকে। তারপর থেকে সেনা অভ্যুত্থানের ঘটনাও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসতে শুরু করে।

মূল লেখক: নাদিম এফ পারাসা। জ্যেষ্ঠ কলামিস্ট, ডন নিউজ।