নজরুলই দেখিয়েছেন বাংলাতেও স্লোগান হয়

kazi-nazrulকাজী নজরুল ইসলাম এমন একটি নাম যার সঙ্গে আলাদাভাবে কোনো বিশেষণ যোগ করতে হয় না। নজরুল নিজেই নিজের তুলনা, বাংলা সাহিত্যে যার অবাধ বিচরণ।
বাংলা সাহিত্যের গগণে উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে দ্যুতি ছড়িয়েছেন আজন্মকাল। বাংলা সাহিত্যে বিদ্রোহী কবি হিসেবে পরিচিত হলেও তিনি ছিলেন একাধারে কবি, সঙ্গীতজ্ঞ, ঔপন্যাসিক, গল্পকার, নাট্যকার, প্রাবন্ধিক, সাংবাদিক, চলচ্চিত্রকার, গায়ক ও অভিনেতা। তার কবিতা ও গান শোষণ ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে সংগ্রামী জাতিকে উদ্বুদ্ধ করেছে। মুক্তিযুদ্ধে তার গান ও কবিতা ছিল প্রেরণার উত্স। অন্যায় ও অবিচারের জন্য নজরুল সব সময়েই ছিলেন সোচ্চার। সমাজের প্রচলিত সব অন্যায়ের প্রতিবাদ উঠে এসেছে  কবিতার ভাষায়, যার কারণে তাকে বিদ্রোহী কবিও বলা হয়। পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশ দুই বাংলাতেই তার কবিতা ও গান সমানভাবে সমাদৃত।

নজরুল প্রসঙ্গে চিন্তাবিদ অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খান তার এক প্রবন্ধে বলেছেন, ‘কাজী নজরুল ইসলাম সেই বিরল মহাপুরুষদের মধ্যে যাহাদের মুখে ‘আমি আসিলাম, দেখিলাম আর জয় করিলাম’ কথাটি সত্য সত্যই মানায়। ছোটবড় কবিতার সঙ্গে সঙ্গে নজরুল ইসলাম গানও রচনা করিয়াছেন, তাহাতে নিজেই সুর করিয়াছেন। বাংলায় বিশেষ করিয়া গজলের চল করিয়াছেন নজরুল ইসলামই। নজরুলের গজল যেমন অপূর্ব তেমনি জনপ্রিয় যেমন তাহার বাণী তেমন তাহার ভাষা।’
তার সাহিত্যকর্মে প্রাধান্য পেয়েছে ভালবাসা, মুক্তি ও বিদ্রোহ। ধর্মীয় লিঙ্গভেদের বিরুদ্ধেও তার কলম চলেছে। ছোটগল্প, উপন্যাস, নাটক লিখলেও তিনি মূলত কবি হিসেবেই বেশি পরিচিত।

সলিমুল্লাহ খান নজরুলকে ভাগ্যবান কবি হিসেবেই দেখছেন, তারও অবশ্য কারণ আছে—‘এক অর্থে নজরুল ইসলাম ভাগ্যবান কবি। আবির্ভাবের অল্পদিনের মধ্যেই সারাদেশ তাহাকে বরণ করিয়া লইয়াছিল। তিরিশ বছর বয়স পাইবার আগেই দেশশ্রেষ্ঠ নেতা সমাজ তাহাকে ‘জাতীয় কবি’ বলিয়া বরণ করিয়াছিলেন। তাহার পর অনেক বীরের রক্তস্রোত ঢের মাতার অশ্রুধারা বহিয়াছে, কিন্তু নজরুল ইসলামের জয়জয়কার কখনও থামিয়া যায় নাই। দেশের জনসাধারণের মধ্যে তাহার আসন পাকা হইয়া উঠিয়াছে।’

কবির ঘনিষ্ট বন্ধু নৃপেন্দ্রকৃষ্ণ চট্টোপাধ্যায় তার সম্পর্কে বলেন; ‘তাহার সততা আজও আমার দুর্বল চোখে অন্তত ম্লান মনে হইতেছে না। অনেক ভাল কবির মধ্যে নজরুল শুধু একজন ভাল কবি নয়, অনেক ভাল গায়কের মধ্যে নজরুল শুধু একজন ভাল গায়ক নয়, অনেক ভাল সুরকারের মধ্যে নজরুল শুধু একজন ভাল সুরকার নয়; বাংলা কাব্য-সাহিত্যে, বাংলার সঙ্গীতে, বাংলার সুর-সৃজন-লোকে নজরুলের নেই কোন পিতৃ-পুরুষ, নেই কোন উত্তরাধিকারী। সে দাঁড়িয়ে আছে স্বতন্ত্র, একক, একটা সম্পূর্ণ নূতন ব্যক্তিত্ব ও শক্তি।’

জাতীয় কবি নজরুল অঝোরে পান করেছেন রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য সুধা। তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো, তার কোনো সৃষ্টিতেই রবীন্দ্রনাথের কোনো ছাপ নেই। বরং তিনি রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য সুধা থেকে তৈরি করেছিলেন ভিন্ন আরেকটি ধারা।
আর এ জন্যই হয়ত নৃপেন্দ্রকৃষ্ণের দ্বিধাহীন স্বীকারোক্তি; ‘নজরুলের প্রতিভার বৈশিষ্ট্যকে বুঝতে হলে, তার প্রকৃত মূল্য ও মর্যাদা দিতে হলে, আমাদের সর্বপ্রথম মনে রাখতে হবে সে কথাকে, নজরুল জন্মেছিল রবীন্দ্রনাথের সর্বব্যাপী নিশ্ছিদ্র প্রতিভার পূর্ণ প্রভাবের যুগে ও সে যুগের প্রত্যেক তরুণ সাহিত্য- প্রয়াসীর মত সে আকণ্ঠ পান করেছিল রবীন্দ্রনাথের কাব্য সুধা। শুধু তাই নয়, সর্বাঙ্গ ভাসিয়ে সে ডুব দিয়েছিল রবীন্দ্রনাথের গানে আর রবীন্দ্রনাথের সুরের গভীরে, তেমন করে আজকের যুগের তরুণদের দেখি না। কিন্তু নজরুল প্রতিভার অনন্য সাধারণত্ব ও স্বাতন্ত্র্য হলো, যখন সে কবিতা লিখলো, যখন সে নিজে গান রচনা করলো, সুর সৃষ্টি করলো, তখন তার কবিতার একটি অক্ষরের মধ্যে, তার গানের একটা আন্দোলনের মধ্যে, তার সুরের একটা দীর্ঘশ্বাসের মধ্যে, তার প্রকাশের ক্ষীণতম ভঙ্গির মধ্যে, এমন কি তার ভাষারীতির মধ্যে কোথাও দেখা গেল না রবীন্দ্র-প্রতিভার বিন্দুমাত্র প্রভাবের লক্ষণ।’

নজরুলের সমসাময়িক আরেক কবি নারায়ণ চৌধুরীর মতে, ‘এত বিচিত্র ঢঙের গান বাংলা দেশের আর কোন সুরকার আজ পর্যন্ত রচনা করেননি।’ তিনি বলছেন; ‘কাজী নজরুল ইসলাম সবশুদ্ধ আনুমানিক তিন হাজার গান লিখে ছিলেন। পৃথিবীর সঙ্গীত রচনার ইতিহাসে এইটেই বোধহয় সর্বোচ্চ রেকর্ড’।

নজরুল কেবল কবিতা কিংবা গানের মধ্যে নিজেকে আটকে রাখেননি। তার প্রতিভার জ্যোতি বাংলা গদ্যভাষায়ও নতুন ধারার সৃষ্টি করেছে। নজরুল প্রসঙ্গে ভারতবর্ষীয় কমিউনিস্ট দলের নেতা কমরেড মুজফফর আহমদ বলেন, ‘আমাদের ভাষা মিষ্ট। আমাদের ভাষা সুকোমল। শ্রেষ্ঠ গীতি কবিতা আমাদের ভাষায় রচিত হতে পারে, এই ছিল আমাদের ধারণা। আমাদের ভাষায় জোর নেই, সংগ্রামশীলতা নেই, এই ধারণা আমাদের ভিতরে বদ্ধমূল ছিল বলেই আমরা স্লোগান দিতাম হিন্দুস্তানীতে। নজরুল ইসলামের অভ্যুদয়ের পর আমরা বুঝেছি যে বাঙলা ভাষাও জোরালো, সংগ্রামশীল ও অসীম শক্তিশালিনী।’ এ কথা সত্য যে নজরুল বাঙ্গালিদের কাছে প্রমাণ করতে পেরেছেন বাঙলা ভাষা দিয়েও আন্দোলন করা যায়, এই ভাষাতেও আন্দোলনের স্লোগান দেয়া যায়।

আহমদ ছফার ভাষা অনুযায়ী, ‘তুর্কি জাতির জন্য মোস্তফা কামাল যা করেছিলেন, বাঙালি মুসলমানের জন্য তার মত কিছু একটা করতে চাইতেন নজরুল ইসলাম।’ তার এ কথার সূত্র ধরে অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খান বলছেন, ‘বাঙালি মুসলমান জাতির আকাশে একদা যে হীনমন্যতার মেঘ গাঢ় হইয়া উড়িতেছিল, নজরুলের কারণে তাহা আজ বহুল পরিমাণে কাটিয়া গিয়াছে। বাঙালি হিন্দুজাতির পক্ষেও নজরুল ইসলামকে আদর না করা সম্ভব হয় নাই।’
নজরুল একদিকে যেমন ছিলেন হিন্দু-মুসলমানের সম্প্রতি এবং ঐক্যে পুরাপুরি বিশ্বাসী তেমনি অন্যদিকে মুসলমান সমাজের গতিচিন্তায়ও সমান মগ্ন। কাজী নজরুল ইসলাম যে ইসলামি বিষয়বস্তু নিয়ে অনেক কবিতা আর অসংখ্য গান লিখেছেন, বিষয়টা আকস্মিক কিছু নয়। এ বিষয়েও আহমদ ছফার সোজাসুজি কথা, ‘নজরুলের একটা স্থির লক্ষ্য ছিল। নজরুল ইসলাম, ইসলাম ধর্ম এবং বাঙালি সংস্কৃতির মধ্যবর্তী ঐতিহাসিক ব্যবধানটুকু যথাসম্ভব কমিয়ে আনার একটা উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন।’

নজরুলের লেখালেখিতে বাস্তব অভিজ্ঞতার ছাপ ছিল লক্ষণীয়। তত্কালীন সমাজে বিরাজমান নানা সমস্যা, অবিচার, সম্ভাবনা, ভালোবাসা, প্রেম, ঘৃণা সব কিছুই জীবন্ত হয়ে ওঠে কবির লেখায়। কবিতার প্রতিটি বাক্যে যেমন প্রেম উথলে উঠেছে, তেমনি শোষণ ও বঞ্চনার প্রতিও বিদ্রোহী কণ্ঠ গর্জে উঠেছে বারবার। ঘৃণাকে জয় করার চেষ্টা করেছেন ভালোবাসা দিয়ে। যেমনটা কবি বলছিলেন—

‘ফুল যদি নিই তোমার হাতে
জল রবে গো নয়ন পাতে;
অশ্রু নিলে ফুটবে না আর প্রেমের মুকুল।’
আবার অন্যায় অবিচারের যখন প্রতিবাদ করেছন তখন আবার ভিন্ন নজরুল হয়ে পাঠকের সামনে হাজির হয়েছেন। বলিষ্ঠ কণ্ঠে উচ্চারিত হয়েছে প্রতিবাদের সুর। যে সুর অত্যাচারী শাসকের ভিত কাপিয়ে দিয়েছিল। জ্বালাময়ি কণ্ঠে শাসকদের শোষণের বিরুদ্ধে তার হুঁশিয়ারি—

আমি দূর্বার
আমি ভেঙে করি সব চুরমার!

আমি অনিয়ম উচ্ছৃঙ্খল
আমি দ’লে যাই যত বন্ধন, যত নিয়ম কানুন শৃঙ্খল
আমি মানি না কো কোন আইন,
আমি ভরা-তরী করি ভরা-ডুবি, আমি টর্পেডো, আমি ভীম ভাসমান মাইন…
কাজী নজরুল ইসলাম প্রেমের কবি, বিরহ-বেদনা ও সাম্যের কবি। বাংলা সাহিত্য-সঙ্গীত তথা সংস্কৃতির প্রধান পুরুষ। তবে, ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে তার লেখনী ধূমকেতুর মতো আঘাতে জাগিয়ে দিয়েছিল ভারতবাসীকে। তিনি পরিণত হন বিদ্রোহের কবিতে। আজও তার নানা ধরনের লেখার মধ্য থেকে বিদ্রোহের পংক্তিমালা বাঙালির হৃদয়ে অনাচারের বিরুদ্ধে উচ্চকণ্ঠে আওয়াজ তুলে।

তথ্যসূত্র ; বাঙালি মুসলমানের মন—আহমেদ ছফা।

নজরুল ইসলামের শতোত্তর জন্মদিনে— অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খান