অভিশংসিত বিশ্ব নেতারা

Impeachmentপৃথিবীর প্রায় সবকটি দেশের সংসদের হাতেই সরকার বা রাষ্ট্রপ্রধানকে অপসারিত করার ক্ষমতা রয়েছে। প্রতিটি দেশই তাদের লিখিত বা অলিখিত সংবিধানের আলোকে এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারে। তবে এমন ঘটনার নজির খুব একটা দেখা যায় না। সম্প্রতি গত বুধবার নিজ দেশের উচ্চ কক্ষের সিনেট সদস্যদের ভোটে অভিশংসিত হয়েছেন ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট জিলমা হুসেফ।

দেশটির ৮১ জন সিনেট সদস্যের মধ্যে ৬১টি জনই ভোট দেন তার বিরুদ্ধে। নিজ প্রভাব খাটিয়ে অবৈধভাবে রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যয়ের অভিযোগে ক্ষমতা ছাড়তে হলো হুসেফকে। এ অভিশংসনের ফলে তিনি যোগ দিলেন সেই সব বিশ্ব নেতাদের দলে— যাদের মধ্যে কেউ কেউ অভিশংসিত হয়েছেন, আবার কেউ আইনি ঝক্কি এড়াতে পদত্যাগে বাধ্য হয়েছেন।

অবশ্য অভিশংসিত হওয়া থেকে বেঁচে গেছেন এমন নেতাও রয়েছেন। এ কাতারে সবচেয়ে বড় উদাহরণ হলেন সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন। ১৯৯৯ সালে যৌন কেলেঙ্কারির অভিযোগ ওঠার পর তাকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করা হলেও টিকে যান তিনি।

গত দুই দশকে নিজ দেশের ক্ষমতা থেকে অপসারিত বা পদত্যাগে বাধ্য হয়েছেন এমন নেতাদের নিয়ে আজকের আয়োজন।

যুক্তরাষ্ট্র:

ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারির দায়ে ১৯৭৪ সালের আগস্ট মাসে অবধারিত অভিশংসনের ঠিক আগ মুহুর্তে ক্ষমতা থেকে সড়ে দাঁড়ান তখনকার প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন।

ব্রাজিল:

১৯৯২ সালের ২৯ ডিসেম্বরে দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত হওয়ার পর প্রেসিডেন্ট ফার্নান্ডো ডি মেলোর বিরুদ্ধে অভিশংসন প্রক্রিয়া শুরু করে দেশটির সিনেট। তবে সিনেট শুনানি শুরুর আগেই পদত্যাগ করেন তিনি।

ভেনেজুয়েলা:

১৯৯৩ সালে মে মাসে অর্থ আত্মসাত্ ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের দায়ে বহিষ্কৃত হন তখনকার প্রেসিডেন্ট কার্লোস আন্দ্রেজ পেরেজ। তিন মাস পর  ৩১ আগস্ট দেশটির কংগ্রেসে অভিশংসিত হন তিনি।

ইকুয়েডর:

সরকারি ঋণভান্ডার থেকে অর্থ পাচারের অভিযোগ ওঠে প্রেসিডেন্ট আবদালা বুকারামের বিরুদ্ধে। ১৯৯৭ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব পালনে ‘শারীরিক ও মানসিকভাবে অক্ষম’ আখ্যা দিয়ে অপসারণ করা হয় বুকারামকে। এ ঘটনার মাত্র ছয় মাস আগেই ক্ষমতায় আসীন হয়েছিলেন তিনি।

এছাড়া ২০০৫ সালের এপ্রিলে অপসারিত হন তখনকার প্রেসিডেন্ট লুসিও গুতিয়েরেজ। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল দেশটির সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্টে ঘনিষ্ঠদের আসীন করার মাধ্যমে নিজের প্রভাব প্রতিষ্ঠা করা। এর বিরুদ্ধে ব্যাপক গণজাগরণ সৃষ্টি হলে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন গুতিয়েরেজ।

ইসরায়েল:

কর ফাঁকি ও দুর্নীতি কেলেঙ্কারির অভিযোগ ওঠায় পদত্যাগ করেন প্রেসিডেন্ট এজের উইজমেন। ২০০০ সালের জুলাইয়ে এ ঘটনা ঘটে। অভিশংসন এড়াতে আগেই পদত্যাগ করেন তিনি।

২০০৭ সালের জুনে ধর্ষণ ও যৌন হয়রানির অভিযোগ ওঠার প্রেক্ষিতে পদত্যাগ করেন প্রেসিডেন্ট মোশে কাটসাভ। ২০১১ সালে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় সাত বছরের কারাদণ্ড হয় তার।

পেরু:

বাবা-মার মাধ্যমে জাপানের নাগরিকত্ব গ্রহণ করেন দেশটির প্রেসিডেন্ট আলবার্তো ফুজিমোরি। ২০০০ সালের ২১ নভেম্বর ফ্যাক্সের মাধ্যমে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব ছাড়ার আবেদন করেন তিনি। তবে তার পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেনি দেশটির কংগ্রেস। এর বদলে তার অভিশংসনের পক্ষে ভোটের আয়োজন করা হয়। দশ বছরের জন্য সরকারি কার্যালয় থেকে নিষিদ্ধ করা হয় তাকে। জাপান থেকে পেরুর কাছে হস্তান্তর করা হয় ফুজিমোরিকে। এর পর দুর্নীতি ও গণহত্যার আদেশ দেয়ার অভিযোগে ২৫ বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন তিনি।

ইন্দোনেশিয়া:

দায়িত্ব পালনে অযোগ্য ও দুর্নীতির অভিযোগে ২০০১ সালের ৩০ জুলাই ক্ষমতাচ্যুত হন প্রেসিডেন্ট আবদুররাহমান ওয়াহিদ।

লুিথয়ানিয়া:

অর্থের বিনিময়ে রুশ ব্যবসায়ীকে লিথুয়ানিয়ার নাগরিকত্ব প্রদানের অভিযোগ প্রমাণিত হয় প্রেসিডেন্ট রোনালদাস পাকসাসের বিরুদ্ধে। এরপর ২০০৪ সালের ৬ এপ্রিল অভিশংসিত হন তিনি, পাশাপাশি সরকারি যেকোনো কর্মকাণ্ড থেকে নিষিদ্ধ করা হয়। অবশ্য ২০০৯ সালে ইউরোপীয় পার্লামেন্টে নির্বাচিত হন তিনি।

জার্মানি:

২০১২ সালে ফেব্রুয়ারিতে ফেডারেল প্রেসিডেন্সি থেকে পদত্যাগ করেন তখনকার প্রেসিডেন্ট ক্রিস্টিয়ান উলফ। অর্থের বিনিময়ে অবৈধ প্রভাব খাটানোর অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। পরবর্তীতে অবশ্য এ অভিযোগ ভুয়া প্রমাণিত হয়।

প্যারাগুয়ে:

ভুমিধসে ১৭ জন নাগরিক নিহত হওয়ার ঘটনায় দায়িত্বে অবহেলার জন্য ক্ষমতাচ্যুত হতে হয় দেশটির প্রেসিডেন্ট ফার্নান্ডো লুগোকে। ২০১২ সালের ২২ জুন এ ঘটনা ঘটে।

গুয়াতেমালা:

শুল্ক ফাঁকি দিয়ে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে পণ্য আমদানির অনুমতি দেয়ার অভিযোগ ওঠে প্রেসিডেন্ট অট্টো পেরেজের ওপর। ২০১৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর বহিষ্কৃত হন তিনি। অভিশংসন প্রক্রিয়া শুরুর দুদিনের মাথায় পদত্যাগ করেন তিনি।

তবে অভিশংসনের প্রস্তাব উঠলেও তা সফল হয়নি এমন নজিরও আছে পৃথিবীতে।  এ তালিকায় আছেন— ১৯৯৯ সালে রাশিয়ার বোরিস ইয়েল্টসিন, ২০০৩ সালে প্যারাগুয়ের লুইস গনজালেজ মাচ্চি, ২০০৪ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার রোহ মু-হুয়েন এবং ২০১৫ সালে মাদাগাস্কারের হেরি রাজাওনারিমামপিয়ানিনা।

এছাড়া নিম্মকক্ষে অভিশংসন প্রস্তাব গৃহিত হলেও উচ্চকক্ষের ভোটে ক্ষমতায় টিকে গেছেন রাজনীতিতে এমন নজির আছে দুইবার। দুটি ঘটনার সাক্ষী যুক্তরাষ্ট্র। ১৮৬৮ সালে অ্যান্ড্রু জনসন ও ১৯৯৯ সালে বিল ক্লিনটন অভিশংসন হওয়া থেকে বেঁচে যান।

সূত্র: এএফপি