দ্বিতীয়বার মেয়র হলেন আইভী

দ্বিতীয়বার মেয়র হলেন আইভী
দ্বিতীয়বার মেয়র হলেন আইভী

শঙ্কা, উদ্বেগ থাকলেও শেষ পর্যন্ত উৎসবমুখর পরিবেশেই ভোট দিলেন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের (নাসিক) ভোটাররা। দ্বিতীয়বারের মতো অনুষ্ঠিত এ নির্বাচনে ডা. সেলিনা হায়াত্ আইভীর ওপরই আস্থা রাখলেন নগরবাসী। প্রতিদ্বন্দ্বী সাখাওয়াত হোসেন খানকে ৭৯ হাজার ৫৬৭ ভোটে হারিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মেয়র নির্বাচিত হলেন আওয়ামী লীগের এ প্রার্থী।

ভোট গণনা শেষে গতকাল রাতে নারায়ণগঞ্জ ক্লাবের স্থাপিত নিয়ন্ত্রণ কক্ষে সেলিনা হায়াত্ আইভীকে বেসরকারিভাবে নির্বাচিত ঘোষণা করেন রিটার্নিং কর্মকর্তা নুরুজ্জামান তালুকদার। তিনি জানান, ১৭৪টি  কেন্দ্রের  পুরো বেসরকারি ফলাফল পাওয়া গেছে। প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনের পর এতে আইভী পেয়েছেন ১ লাখ ৭৫ হাজার ৬১১ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি মনোনীত সাখাওয়াত হোসেন খান পেয়েছেন ৯৬ হাজার ৪৪ ভোট।

নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর এক প্রতিক্রিয়ায় সেলিনা হায়াত্ আইভী বলেন, এ জয় জনগণের। এ জয় আমি বঙ্গবন্ধু ও ’৭১-এর শহীদদের প্রতি উৎসর্গ করছি। বিজয়ের মাসে নারায়ণগঞ্জবাসী আরেকটি বিজয় পেল।

তিনি বলেন, আমি আগেই বলেছিলাম, মানুষের জন্য আমি কাজ করেছি, তাদের সেবা ও এলাকার উন্নয়নে কাজ করেছি। এ কারণে মানুষ আমাকেই বিজয়ী করবে। দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব পেয়ে ভবিষ্যত্ লক্ষ্য সম্পর্কে তিনি বলেন, আমার আগামী দিনের পথ চলা আবার শুরু হলো। এবার অসমাপ্ত কাজগুলো দ্রুত সমাপ্ত করব। একই সঙ্গে নির্বাচনে মানুষের কাছে ভোট চাইতে গিয়ে যেসব সমস্যা সম্পর্কে অবহিত হয়েছি, তা স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পের মাধ্যমে সমাধান করব।

এদিকে বিএনপি মনোনীত সাখাওয়াত হোসেন খান তাত্ক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় বলেন, এ নির্বাচনের কাস্টিং ভোট ও ফলাফলের মধ্যে কিছু অসামঞ্জস্যতা রয়েছে। ভোট গণনা ও ফলাফলের ক্ষেত্রে সূক্ষ্ম ত্রুটি হয়েছে। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলেও নির্বাচন কমিশন সরকার দ্বারা প্রভাবিত হয়ে থাকতে পারে।

সকাল ৮টায় শুরু হয়ে কোনো বিরতি ছাড়াই বিকাল ৪টা পর্যন্ত চলে ভোটগ্রহণ। নির্বাচনী এলাকায় মোট ভোটার ৪ লাখ ৭৪ হাজার ৯৩১ জন। ভোট দিয়েছেন ২ লাখ ৯৬ হাজার ৩৬ জন। ৬২ দশমিক ৩৩ শতাংশ ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। ভোট বাতিল হয়েছে ৭ হাজার ৯৭১টি।

নগরীর তিন থানা— সদর, বন্দর ও সিদ্ধিরগঞ্জ নিয়ে গঠিত এ সিটি করপোরেশনের ১৭৪টি কেন্দ্রে সারা দিন সর্বত্র ছিল ভোটের উৎসব। জয়-পরাজয়কে ছাপিয়ে আলোচনায় ছিল ভোটের পরিবেশ। নারী-পুরুষ উভয়ের উপস্থিতিই ছিল লক্ষণীয়।

ভোট শুরু হওয়ার আগেই বিভিন্ন কেন্দ্রে নারী ও পুরুষ ভোটারদের দীর্ঘ লাইন দেখা যায়। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত কেন্দ্রগুলোর বাইরে ও ভোটার সারিতে দাঁড়ানো বেশির ভাগের বুক ও গলায় ঝুলছিল নৌকা ব্যাজ। কেন্দ্রের ভেতরে নির্বিঘ্নে দায়িত্ব পালন করলেও কেন্দ্রের বাইরে ধানের শীষ ব্যাজ তেমন দেখা যায়নি।

১৭৪টি কেন্দ্রের মধ্যে মাত্র একটিতে বিএনপি প্রার্থীর এজেন্টকে বের করে দেয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। ১২ নম্বর ওয়ার্ডের এবিসি হাইস্কুল কেন্দ্রে বিএনপির পোলিং এজেন্ট খায়রুল ইসলামকে বের করে দেয়ার অভিযোগ তোলেন বিএনপি নেতা তৈমুর আলম খন্দকার। আর মহিলা কলেজ কেন্দ্রে দুই কাউন্সিলর প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। বিচ্ছিন্ন এ দুটি ঘটনা বাদ দিলে আর কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি।

ভোট সুষ্ঠু হলেও আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় সরকারদলীয় সংসদ সদস্য শামীম ওসমানের বিরুদ্ধে। বেলা ২টায় নারায়ণগঞ্জ বার একাডেমি কেন্দ্রে নৌকা প্রতীকে ভোট দিয়ে ব্যালটটি সাংবাদিকদের সামনে উঁচিয়ে ধরেন তিনি। ভোটারদের ভোটকক্ষের ‘গোপনকক্ষে’ গিয়ে ব্যালটে সিল মারার বিধান থাকলেও শামীম ওসমান তা করেননি।

প্রকাশ্যে ভোট দিয়ে আচরণবিধি লঙ্ঘনের বিষয়ে শামীম ওসমান বলেন, সংবাদের খোরাক দেয়ার জন্য আমি নিজেকে রক্তাক্ত করলাম।

প্রকাশ্যে সিল মারা বা ব্যালট দেখানো আচরণবিধির লঙ্ঘন ও বেআইনি। বিষয়টি নিয়ে কমিশন অভিযোগ পেলে পরবর্তী করণীয় ঠিক করা হবে বলে জানান নির্বাচন কমিশনের যুগ্ম সচিব মো. শাজাহান।

ভোটারদের প্রধান আকর্ষণ ছিল মূলত মেয়র পদকে ঘিরেই। নারায়ণগঞ্জ সদর, সিদ্ধিরগঞ্জ ও বন্দর উপজেলা নিয়ে এ সিটিতে মোট ২০১ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। এর মধ্যে পাঁচজন লড়েছেন মেয়র পদে। লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) প্রার্থী কামাল প্রধান ও কল্যাণ পার্টির রাশেদ ফেরদৌস বিএনপি মনোনীত প্রার্থী সাখাওয়াত হোসেন খানকে (ধানের শীষ) সমর্থন দিয়ে নির্বাচন থেকে সরে গেছেন। বাকি চার প্রার্থী হলেন— আওয়ামী লীগের সেলিনা হায়াত্ আইভী (নৌকা), বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির মাহবুবুর রহমান ইসমাইল (কোদাল), ইসলামী আন্দোলনের মাসুম বিল্লাহ (হাতপাখা), ইসলামী ঐক্যজোটের এজহারুল হক (মিনার)। এছাড়া নির্বাচনে ২৭ ওয়ার্ডের ২৭টি কাউন্সিলর পদে প্রার্থী ১৫৬ জন এবং সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলরের নয়টি পদে ৩৮ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন।