প্রচারণা শেষ আগামীকাল নারায়নগঞ্জে ভোট

base_1482259741-drty

নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে প্রার্থীদের প্রচারণার শেষ দিন ছিল গতকাল। আজ রাত পোহালেই ভোট প্রদান করবেন সিটি করপোরেশনের পৌনে পাঁচ লাখ ভোটার। এদিকে সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ বজায় রাখতে ভোটকেন্দ্রে যেকোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা হলে গুলির নির্দেশ দিয়েছেন পুলিশের ডিআইজি। তবে নির্বাচনী পরিবেশ স্বাভাবিক রয়েছে বলে জানিয়েছেন রিটার্নিং কর্মকর্তা।

পূর্বঘোষণা অনুযায়ী গতকাল মধ্যরাতে সিটি নির্বাচনের প্রচারণা শেষ হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই এদিন বিভিন্ন কাউন্সিলর ও মেয়র প্রার্থীর প্রচারাভিযান ছিল তুঙ্গে। দিনের শুরু থেকেই প্রধান দুই দলের মনোনীত প্রার্থীরা নগরীতে ব্যাপক প্রচারণা চালিয়েছেন। প্রার্থীদের বিশাল মিছিলে নগরী ছিল মুখর। ভোটারদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোট চেয়েছেন তারা। নির্বাচনী পরিবেশ সুষ্ঠু রয়েছে, এমন আশ্বাস দিয়ে তারা ভোটারদের কেন্দ্রে গিয়ে ভোট প্রদানের অনুরোধ জানিয়েছেন। নগরীর ২৭টি ওয়ার্ডে মোট ১৭৪টি কেন্দ্রে এবার ভোট অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এর মধ্যে ১৩৭টিকেই ঝুঁকিপূর্ণ বিবেচনা করে এরই মধ্যে প্রতিবেদন দিয়েছে সরকারি গোয়েন্দা সংস্থা। এ পরিস্থিতিতে ভোটকেন্দ্রে যেকোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা হলে গুলি চালানোর নির্দেশ দেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি মাহফুজুল হক নুরুজ্জামান। তবে নির্বাচনী পরিবেশ সম্পূর্ণ স্বাভাবিক রয়েছে বলে আশ্বস্ত করেছেন রিটার্নিং কর্মকর্তা নুরুজ্জামান তালুকদার।

রিটার্নিং কর্মকর্তা জানান, নির্বাচন ঘিরে নগরে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সাড়ে নয় হাজার সদস্যকে মোতায়েন করা হয়েছে। এত বড় নিরাপত্তাবেষ্টনী ভেদ করে কোনো অপরাধীই কোনো কর্মকাণ্ড চালাতে পারবে না। সিদ্ধিরগঞ্জ থানার ওসির বদলির বিষয়ে আওয়ামী লীগের প্রার্থী সেলিনা হায়াত্ আইভীর দাবি সম্পর্কে নুরুজ্জামান তালুকদার বলেন, এ ব্যাপারে আমাদের কাছে কোনো লিখিত অভিযোগ আসেনি। তাই এ ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়নি।

তিনি বলেন, স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী সিটি করপোরেশন এলাকায় অত্যন্ত সর্তকাবস্থায় রয়েছে। ফলে এখানে বিজিবির নিরাপত্তা প্রদান কার্যকর হবে। এখন পর্যন্ত নির্বাচনী পরিবেশ অত্যন্ত সুষ্ঠু ও স্বাভাবিক।

এদিকে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় রয়েছে বলে জানিয়েছেন পুলিশের ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি মাহফুজুল হক নুরুজ্জামান। গতকাল দুপুরে নগরীর মাসদাইর পুলিশ লাইন এলাকায় নির্বাচনের দায়িত্বে নিয়োজিত পুলিশ সদস্যদের ব্রিফিং শেষে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন।

নুরুজ্জামান বলেন, আইনে জনগণের জানমালের নিরাপত্তা ও আত্মরক্ষায় গুলি চালানোর বিধান রয়েছে। নির্বাচনে কেউ ভোটকেন্দ্র দখল ও ব্যালট বাক্স ছিনতাই বা জনগণের জানমালের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করার চেষ্টা করলে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী গুলি ছুড়বে। এর অন্যথা হলে সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে সম্পন্ন করতে নির্বাচন কমিশনের চাহিদার চেয়েও বেশি ফোর্স দেয়া হয়েছে জানিয়ে ডিআইজি বলেন, প্রয়োজন হলে আরো দেয়া হবে। এখানে সরকারি বা বিরোধী দল দেখার সময় নেই। সুষ্ঠু নির্বাচন, নাগরিক নিরাপত্তা ও শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষায় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী সব পদক্ষেপ নেবে। যারা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করবে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।

প্রচারণার শেষ দিন সেলিনা হায়াত্ আইভী নিজ ওয়ার্ড (১৬ নম্বর) ও ১৮ নম্বর ওয়ার্ডে গণসংযোগ করেছেন। সকাল থেকে দুপুর অবধি ১৬ নং ওয়ার্ডের দেওভোগ, বাবুরাইল, বেপারিপাড়া, পাক্কারোড এলাকায় ভোটারদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোট চান তিনি। পরে বিকাল থেকে রাত অবধি ১৮ নং ওয়ার্ডের নিতাইগঞ্জ, শীতলক্ষ্যা, সুকুমপট্টি, আলামিন নগর ও সৈয়দপুর এলাকায় গণসংযোগ করেন তিনি। এ সময় সাংবাদিকদের তিনি বলেন, নির্বাচনে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী অত্যন্ত কঠোর অবস্থানে রয়েছে। নারায়ণগঞ্জের মানুষ যাতে নির্বিঘ্নে কেন্দ্রে গিয়ে ভোট দিতে পারেন, সেজন্য আমি আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে আরো তত্পর হওয়ার আহ্বান জানাব।

শামীম ওসমানের ভূমিকা সম্পর্কে আইভী বলেন, নির্বাচনে তার ভূমিকা কখনই নেতিবাচক ছিল না। উনি তো দলের একজন নেতা। সুতরাং উনি সবসময়ই ইতিবাচক ছিলেন ও থাকবেন।

তিনি বলেন, আমি অবাধ, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু একটি নির্বাচন চাই। তৃণমূল থেকে উচ্চপর্যায়ের সব নেতাকর্মী আমার সঙ্গে আছেন। নির্বাচনে বিজয়ী হলে আমি আমার চলমান কাজগুলো শেষ করব। এ সময় তিনি তার গৃহীত বিভিন্ন প্রকল্পের কথা তুলে ধরেন। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে বিভিন্ন উন্নয়ন পরিকল্পনার কথাও তিনি তুলে ধরেন। নিজের সন্ত্রাসবিরোধী অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে তিনি বলেন, সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে আমার অবস্থান একই আছে। পৌরসভার মেয়র থাকাকালে আমি সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলাম, এখনো তা থেকে সরে আসিনি।

এদিকে বিএনপির প্রার্থী সাখাওয়াত হোসেন খান নগরীর ১৪ ও ১৭ নম্বর ওয়ার্ডে গণসংযোগ করেছেন। ১৪ নং ওয়ার্ডের উকিলপাড়া, গলাচিপা, নন্দীপাড়া, ভুইয়ারবাগ, দেওভোগ আখড়া ও ১৭ নং ওয়ার্ডের বৃহত্তর পাইকপাড়া, ভুইয়াপাড়া, বড় কবরস্থান ও ছোট কবরস্থান এলাকায় নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে তিনি প্রচারণা চালান। বিকালে নগরীর ১৪ নং ওয়ার্ডের মাসদাঈর, জামতলা ও ইসদাঈর এলাকায় প্রচারণা চালান সাখাওয়াত হোসেন। গণসংযোগকালে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, আমি অনেক অভিযোগ দিলেও কোনোটারই সুরাহা হয়নি। তার পরও নির্বাচন সুষ্ঠু হবে ও জনগণ ভোটকেন্দ্রে যাবেন বলে আমি আশাবাদী। আমি আশা করি, নির্বাচন কমিশন ও সরকার একটি সুষ্ঠু নির্বাচন উপহার দেবে।

প্রচারণার শেষ দিনও সেনা মোতায়েনের দাবি জানিয়েছেন সাখাওয়াত হোসেন। তিনি বলেন, এখনো সময় আছে, অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের স্বার্থে সেনা মোতায়নের জন্য আমি সরকার ও নির্বাচন কমিশনের কাছে দাবি জানাচ্ছি।

তিনি বলেন, আজ ধানের শীষের পক্ষে গণজোয়ার সৃষ্টি হয়েছে। একটা পরিবর্তনের পক্ষে মানুষ রায় দিতে চান। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর দিকে ‘বিশেষ সুবিধা’ নেয়ার অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, সরকারি দলের প্রার্থী বিশেষ সুবিধা আদায়ের জন্য বিভিন্নভাবে কাজ করছেন। আমার পোলিং এজেন্টদের ওপরও প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করা হচ্ছে। বন্দর এলাকায় ১৮-২০ ফিটের নৌকা টানানো হয়েছে। এ বিষয়ে অভিযোগ দিলেও তা আমলে নেয়া হয়নি। বিভিন্ন স্থানে আমার পোস্টার ছিঁড়ে ফেলা হচ্ছে। এ ব্যাপারেও আমি নির্বাচন কমিশনে জানিয়েছি। কিন্তু এক্ষেত্রেও কোনো ব্যাবস্থা নেয়া হয়নি। আমরা চাই, নির্বাচনটা লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডে হোক। সেক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসন নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করবে বলে আমরা আশা করি।

তবে সাখাওয়াত হোসেনের এ অভিযোগ খারিজ করে আইভী বলেছেন, ওনার অভিযোগ একেবারেই সঠিক নয়। নির্বাচনী প্রচারণায় কিংবা তার নেতাকর্মীদের সঙ্গে কেউ খারাপ আচরণ করলে তা সরাসরি আমাকে জানানোর কথাও তাকে বলা হয়েছে। কিন্তু উনি শুধু মিডিয়ার কাছেই অভিযোগ করছেন। বণিকবার্তা।