প্রাচীন মিশরীয় রানীদের সৌন্দর্য সচেতনতা

প্রাচীন সভ্যতার দেশ মিশরের ইতিহাস-ঐতিহ্য নিয়ে যেমন মানুষের আগ্রহের শেষ নেই। তেমনি কৌতুহলের কমতি নেই সেই সময়ের মিশরীয় রানীদের নিয়ে। ক্লিওপেট্রা থেকে শুরু করে নেফারতিতি, হাটেম্পশুট, কিংবা প্রথম রাজবংশীয় রানী মারনেইথ- সবাই বিশ্বের অগণিত মানুষের আগ্রহ আর আকর্ষণের শীর্ষে থেকেছেন যুগ যুগ ধরে।

সেসব আকর্ষণীয় রানীদের সৌন্দর্য চর্চা ও তাদের ব্যবহৃত বিভিন্ন শিল্পকর্ম নিয়ে ব্রিটিশ দাতব্য প্রতিষ্ঠান চ্যারিটেবল ট্রাস্ট চলতি বছর আয়োজন করে বেয়ন্ড বিউটি নামের এক শিল্প প্রদর্শনী। সেন্ট্রাল লন্ডনের টু টেম্পল পেলেসে আয়োজন করা হয় ওই অনুষ্ঠান। এতে উঠে আসে প্রাচীন মিশরীয় রানীদের সৌন্দর্য সচেতনতা।

৩৫০টির বেশি শিল্পকর্ম প্রদর্শন করা হয় এতে। দেখানো হয়, প্রাচীন মিশরীয়দের সাজসজ্জার কাজে ব্যবহৃত বিভিন্ন সামগ্রী। আজকের দিনে যাকে আমরা বলতে পারি ‘বিউটি প্রোডাক্ট’ বা সৌন্দর্য পণ্য। তৎকালীন সময়ে মিশরের এসব রানীদের দিয়ে প্রভাবিত ছিলেন সাধারণ নারীরাও। রানীদের অনুসরণ করে তারাও ব্যবহার করতেন বিভিন্ন প্রসাধনী।

মিশরীয় রানীদের ব্যবহৃত সামগ্রীর মধ্যে চিরুনি, তামা বা রুপার তৈরি আয়না, পাললিক শিলা থেকে তৈরি চিত্র অঙ্কনের কাজে ব্যবহৃত প্যালেট, সাজসজ্জার বিভিন্ন বস্তু এবং সুগন্ধি সংরক্ষণের পাত্রসহ সৌন্দর্য চর্চার অনেক বস্তুই প্রদর্শন করা লন্ডনের অনুষ্ঠানে। প্রদর্শিত মানুষের চুলের কিছু বিচ্ছিন্ন অংশ থেকে বোঝা যায়, পরচুলা ব্যবহার করতো প্রাচীন মিশরীয়রা। সে সময়ের নারী এবং পুরুষ- উভয়েই সৌন্দর্যের ব্যাপারে ছিলেন অত্যন্ত সচেতন।

মৃত্যুর পরও মৃতদেহের সৌন্দর্যের ব্যাপারে সচেতন থাকতেন মিশরবাসী। মৃতদেহগুলোর ত্বকের স্নিগ্ধতা, শান্ত চেহারা, তাদের চোখে লাগানো সুরমা, তাদের মমি করা লাশের ওপরে লাগানো মুখোশ এবং কাঠের কফিন থেকে বোঝা যায় তাদের সৌন্দর্য সচেতনতা। আধুনিক নৃবিজ্ঞানীদের জানান, প্রাচীন মিশরীয়দের সৌন্দর্য সামগ্রী ব্যবহারের সর্বব্যাপিতা দেখলে চোখে ধাঁধা লেগে যায়।

কল্পিত ক্লিওপেট্রা
কল্পিত ক্লিওপেট্রা

সৌন্দর্যের ব্যাপারে প্রাচীন ‍মিশরীয়দের সচেতনতা দেখলে মনে হবে, তারা তাদের বাহ্যিক সৌন্দর্য বর্ধনে আজকের দিনের মানুষের চেয়েও অনেক বেশি বুঁদ হয়ে থাকতেন। এমনকি সৌন্দর্য পরিমাপের জন্য তাদের ছিল বিশেষ মানদণ্ড। সেসব নিয়ে ভাবতে গেলে আমাদের আত্মভোলা হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি আছে! আজকের দিনের যেকোনো ধরনের প্রসাধনীর চেয়ে উন্নত মানের প্রসাধনী ব্যবহার করতেন মিশরের রানীরা।

নিজেদের আবেদনময়ী করার ব্যাপারে খুবই সচেতন ছিলেন তারা। আজকের দিনের নারীরা নিজেদের চোখকে আকর্ষণীয় (স্মোকি আই) করার জন্য যে রকম সাজসজ্জা করে, প্রাচীন মিশরীয় রানীরাও। একইভাবে নিজেদের চোখকে আকর্ষণীয় করতে সুরমা ব্যবহার করতেন তারা। সম্প্রতি এক গবেষণায় বেরিয়ে এসেছে এসব তথ্য। এতে দেখা যায়, চোখের চারপাশে ব্যবহৃত ভারী সুরমা তাদের চোখকে সূর্যের তীব্রতা থেকেও রক্ষা করতো। অর্থাৎ, সৌন্দর্য বর্ধন ছাড়া ব্যবহারিক কারণেও চোখে সুরমা ব্যবহার করতেন তারা।

শুধু সুরমা নয়, সব সৌন্দর্য সামগ্রী ব্যবহারের পেছনেই একটি ব্যবহারিক উদ্দেশ্য থাকতো। পরচুলা ব্যবহারের মাধ্যমে একদিকে রানীরা নিজেদের সৌন্দর্য বাড়িয়ে তুলতেন, অপরদিকে উকুন থেকে নিজেদের রক্ষায়ও কাজে লাগতো এটি। তাদের ব্যবহৃত মণিমুক্তাগুলোও ছিল শক্তি ও ধর্মীয় তাৎপর্যের প্রতীক। আবেদনময়ী ভঙ্গিতে থাকা মাটির একটি নারীমূর্তি থেকে বোঝা যায় গায়ে উল্কি আঁকতো প্রাচীন মিশরের নারীরা। নিজের সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্যই এ ধরনের উল্কি আঁকতেন তারা।

প্রাচীন মিশরীয় সুন্দরীদের সবচেয়ে ভালো উদাহরণ তখনকার সময়ের দুই বিখ্যাত রানী ক্লিওপেট্রা এবং নেফারতিতি। এদেরকে বলা হয় ‘কুইন অব নীল’ বা নীল নদের রানী। আদিকাল থেকে আজ পর্যন্ত রানী ক্লিওপেট্রা হয়ে আছেন ‘সুন্দরীদের আদর্শ’। ১৯১২ সালে রানী নেফারতিতির একটি চিত্রকর্ম আবিষ্কৃত হওয়ার পর সৌন্দর্যের দিক দিয়ে এটি ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। বর্তমানে জার্মানির রাজধানী বার্লিনের একটি জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে ওই চিত্রকর্ম। ধারণা করা হয়, ফারাও আখেনাতেনের স্ত্রী ছিল নেফারতিতি।

ক্লিওপেট্রার জীবনীকার এবং নেফারতিতির ওপর একটি গবেষণামূলক বইয়ের লেখক জয়সি টিলডেলস্লে জানান, প্রাচীন মিশরের ওই দুই রানীকেই বর্তমানে আবেদনময়তার প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ক্লিওপেট্রার চিত্র প্রমাণ করে, প্রাচীন মিশরের সব রানীই ছিলেন অনন্য সুন্দরী। তবে ক্লিওপেট্রা ছিলেন এদের চেয়ে ব্যতিক্রম।

নেফারতিতি সম্পর্কে টিলডেলস্লে মনে করেন, তার বক্ষটি আর পাঁচটি মিশরীয় শিল্পকর্মের মতো নয়। এটা সম্পূর্ণ আলাদা। আর এ কারণে ১৯২৩ সালে যখন নেফারতিতির মূর্তিটি জার্মানিতে উন্মুক্ত করা হয়, তখন এটি হৈ চৈ ফেলে দেয়। নেফারতিতির বক্ষের সৌন্দর্যের কারণে বিশ শতকে গণমাধ্যমগুলোতে তিনি একজন তারকায় পরিণত হন।

বার্লিনে নেফারতিতির মূর্তি
বার্লিনে নেফারতিতির মূর্তি

বিবিসি অবলম্বনে