পদোন্নতি পেতে চবি শিক্ষিকার জালিয়াতি

cu-teacherচট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগের উম্মে হাবিবা নামে এক শিক্ষিকার বিরুদ্ধে স্বামীর এমফিল গবেষণার অভিসন্দর্ভ এর অধিকাংশ নকল করে প্রভাষক পদ থেকে সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতির আবেদন করার অভিযোগ উঠেছে।

যা চলতি বছরের এপ্রিলে বাংলাদেশ ইতিহাস পরিষদ থেকে ‘বাংলাদেশের সংসদীয় নির্বাচনের ইতিহাস ও নারীর অংশগ্রহণ’ নামে প্রবন্ধ আকারে প্রকাশিত হয়েছে।

অথচ ওই প্রবন্ধটির সঙ্গে তার স্বামী নজরুল ইসলামের অভিসন্দর্ভ ‘গণমাধ্যম ও বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ নির্বাচন (১৯৯১-২০০৮)’ হুবহু মিল রয়েছে। পাশাপাশি রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগের এই শিক্ষিকার জমা দেয়া ভারতের শিলংয়ের (Man & Society) জার্নালে প্রকাশিত আরেকটি ইংরেজি প্রবন্ধের মান ও সেটি তার নিজের লেখা কিনা এ ব্যাপারেও প্রশ্ন উঠেছে।

এদিকে এমফিল গবেষক স্বামীর অভিসন্দর্ভ থেকে ওই শিক্ষিকা প্রবন্ধ নকল করলেও, সে অভিসন্দর্ভে নানা ধরনের ভুল রয়েছে বলে জানা যায়। ফলে এটির মানও প্রশ্নবিদ্ধ।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত ২০ এপ্রিল প্রভাষক উম্মে হাবিবা সহকারী অধ্যাপক হিসেবে পদোন্নতির আবেদন করেন। পরবর্তীতে ৩ মে বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ইয়াহইয়া আখতারের সভাপতিত্বে বিভাগীয় পরিকল্পনা কমিটির ২৭৮তম সভায় তার আবেদনপত্রে উল্লেখিত প্রকাশনা ও জার্নালসমূহের মান বিষয়ে অভিযোগ ওঠে।

অভিযোগের ভিত্তিতে গত ১৫ মে বিভাগীয় পরিকল্পনা কমিটিতে তার আবেদন যাচাই-বাছাই করে ইসলামী ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের এমফিল গবেষক নজরুল ইসলামের উপস্থাপিত ‘গণমাধ্যম ও বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ নির্বাচন (১৯৯১-২০০৮)’ অভিসন্দর্ভের ভূমিকা, দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও উপসংহার ব্যতীত পুরো অংশের হুবহু মিল থাকার প্রমাণ মেলে। এছাড়া সভায় ইংরেজি প্রবন্ধটি যথার্থ ও মানসম্মত নয় বলে কমিটির অধিকাংশ সদস্য মত দেন ও বিস্ময় প্রকাশ করেন।

তবে সভায় বিভাগের শিক্ষক প্রফেসর ড. ভূঁইয়া মো. মনোয়ার কবীর ওই শিক্ষিকার পক্ষে অবস্থান নেন। সভা চলাকালীন অন্যান্য সদস্যদের হয়ে এই যাত্রায় ওই শিক্ষিকাকে ক্ষমা করে দেয়ার অনুরোধ করেন।

তবে এ বিষয়ে জানতে তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, যারা এ ধরনের অভিযোগ করেছে তাদের কাছে জিজ্ঞাসা করেন। আমি কিছু বলতে চাই না। দুটো সভার একটিতে ছিলাম আমি। সিদ্ধান্ত প্ল্যানিং কমিটির। সভার সভাপতি ভালো বলতে পারবেন কে কার পক্ষে কী অবস্থান নিয়েছিল।

এখানে পাল্টাপাল্টির কিছু নেই উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, সভায় সর্বসম্মতিক্রমেই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। সে সিদ্ধান্তের পক্ষেই আমার অবস্থান।

এ সময় বিভাগের শিক্ষকদের উদ্দেশ্যে এই শিক্ষিকা বলেন, আয়নায় আমিসহ সবার নিজের চেহারা দেখা উচিত। কে কী মানের গবেষণা করে তা যাচাই করারও অনুরোধ করেন তিনি।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সমাজ বিজ্ঞান অনুষদে ২-৩ বছর আগে নৃ-বিজ্ঞান বিভাগের এক শিক্ষক পদোন্নতি পাওয়ার জন্য ভারতের শিলংয়ের Man & Society জার্নালে প্রকাশিত প্রবন্ধ উপস্থাপন করে। পরবর্তীতে বিভাগের পরিকল্পনা কমিটি তা বাতিল ঘোষণা করে।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, সাবেক উপাচার্য প্রফেসর ড. আনোয়ারুল আজিম আরিফের আমলে ২০১৫ সালে উম্মে হাবিবা রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগে প্রভাষক পদে নিয়োগ পান। তবে এই শিক্ষিকার নিয়োগে এক ছাত্রনেতার প্রত্যক্ষ প্রভাব খাটানোর অভিযোগ রয়েছে। সাবেক চবি ছাত্রলীগ নেতা ও বর্তমানে ফিজিক্যাল অ্যাডুকেশন বিভাগে খণ্ডকালীন শিক্ষক নজরুলকে বিয়ের মৌখিক শর্তে দলীয় প্রভাব খাটিয়ে উম্মে হাবিবা প্রভাষক পদে নিয়োগ পান।

এদিকে, অভিযোগের বিষয়ে উম্মে হাবিবা বলেন, নারী হিসেবে বিভাগে সবসময় বৈষম্যমূলক আচরণ এবং কুমিল্লা অঞ্চলের বাসিন্দা হওয়ায় আঞ্চলিক প্রতিহিংসার শিকার আমি। সিনিয়র শিক্ষকদের আগে মাত্র দুই বছরে আমার প্রকাশনা বের হওয়ায় তারা এটি মেনে নিতে পারেননি।

তিনি আরও বলেন, বিভাগের একটি পক্ষের রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের শিকার আমি। তবে বিভাগের সম্মানের স্বার্থে আবেদনপত্রটি প্রত্যাহার করে নেব।

বিভাগীয় পরিকল্পনা কমিটির সভাপতি ও বিভাগীয় চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ইয়াহইয়া আখতার বলেন, পরিকল্পনা কমিটির সভার আলোচনাগুলো আমরা বাইরে প্রকাশ করি না। সভায় যে সিদ্ধান্তগুলো হয়েছে এ বিষয়ে সিনিয়র শিক্ষকদেরও পরামর্শ নেয়া হচ্ছে।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, গত দুই দিন আমি ছুটিতে থাকায় ওই শিক্ষিকা বিভাগীয় সিদ্ধান্তের বিষয়ে কী উত্তর দিয়েছেন তা জানতে পারেনি।