জাপানের চিঠি: পাহাড় ধসে লাশের মিছিলে দায়ী কে?

japanজাপানে ঘর থেকে বের হলে কোথায় যেতে হলে ট্রেনই ভরসা। তাই এই দেশের যোগাযোগের প্রধান যানবাহন হলো ট্রেন। আর এইসব ট্রেনের লাইনের দুই-তৃতীয়াংশ আবার পাতালে, মানে মাটির নীচে।

দেশটিতে আসার কয়েকদিন পর আমি এক গন্তব্যে যাওয়ার সময় এইরকম পাতাল ট্রেনে যাচ্ছিলাম। যা প্রায় ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ। পাহাড়ের পেট ভেদ করে চলে যাওয়া ট্রেনের লাইন।

আর এই সুড়ঙ্গ বা টানেলে ট্রেন চলার সময় হঠাৎ আমার মনে হয়েছিল, এই যে ট্রেনে আমি যাচ্ছি, হঠাৎ যদি ভূমিকম্প কিংবা পাহাড় ধসে যদি চাপা পড়ে যাই? তাহলে কী হবে?

আমার সহযাত্রী জাপানি সহপাঠীকে আমার শঙ্কার কথা জানাতেই সে চোখ কপালে উঠালো। আমার দিক এক পলক তাকিয়ে সে বলে উঠলো, “নাদিম, তুমি এইসব কেন ভাবছো? আমরা তো যুগ যুগ ধরে এই ট্যানেলের ট্রেন লাইনে চলছি, কই আমাদের মনে তো এমন প্রশ্ন কখনো জাগেনি।”

এর কিছুক্ষণ পর ট্রেনের জানালার ফাঁক দিয়ে পাহাড়ের কোলে গড়ে উঠা সুদৃশ্য বাড়িগুলোর প্রতি নজর পড়লো। বাড়িগুলো এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যেন পাহাড়ের সৌন্দর্য্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। না কাঁটা হয়েছে চূড়া কিংবা গাছপালা।

আমি আবার বোকার মতো প্রশ্ন করলাম, “আচ্ছা, এই যে সারি সারি অট্টালিকা তৈরি হয়েছে, তোমাদের দেশের ঘন ঘন ভূমিকম্পে এইগুলো ভেঙ্গে পড়ে না? পাহাড় তো দেখছি, কাঁটা হয়নি। তাহলে বাড়িগুলো করা হলো কীভাবে?”

japanএইবার আমার সহপাঠি আমাকে বললো, “তুমি যদি আমার বাসায় যাও, তাহলে তো অবাক হবে। আমার বাসা একবারে পাহাড়ের চূড়ায়। আর সেখানে এঁকেবেঁকে পাকা রাস্তা হয়েছে। বলতে গেলে, আমাদের তো কখনো মনে হয়নি, এই পাহাড় যদি ভেঙ্গে পড়ে কিংবা টাইফুনে বাড়ি উড়ে যায়। আসলে, তুমি যদি এই বাড়িগুলো তৈরি দেখতা, তাহলে তোমার ভেতর থেকে ভয় বের হয়ে যেত।”

সুজকি তাইচি নামে আমার ওই সহপাঠীর মুখে এবার শুনলাম বাড়ি তৈরির গল্প। সে বললো, “আমার বাবা সারাজীবনের সঞ্চিত অর্থ দিয়ে ওই বাড়িটি করেছে। ওই বাড়ির ভূমির উপরে তৈরি করতে যা খরচ হয়েছে, তার ২০ গুণ খরচ হয়েছে মাটির নিচে পাইলিং করতে। এইবার ভেবে দেখ, আমাদের বাড়ির খরচ কেমন পড়ে?”

সুজকিদের বাড়িটি তৈরি করার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সরকারি তদারকি ছিল। তাই এই বাড়ির কিছু হলে, এজেন্সির মাধ্যমে সরকার দেখভাল করে। শুধু তাই নয়, পাহাড়ে গড়ে তোলা ঘর যেন পর্বতের ক্ষতি না করে কিংবা অপরিকল্পিতভাবে বসতবাড়ি গড়ে না ওঠে, সেই ব্যাপারে আগে থেকে ওই জায়গা স্থানীয় সিটি কর্পোরেশন ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকে। যেখানে বাড়ি করা ঝুঁকিপূর্ণ, সেখানে কখনোই বাড়ি করার অনুমতি পাওয়া যায় না।

বাসায় এসে ইন্টারনেট ঘেঁটে দেখলাম, জাপানে পাহাড়ের বুকে-পেটে গড়ে উঠা লোকালয়ের রহস্য। দুর্যোগ প্রশমন ওয়েব সাইট ‘গেইকেন’ তুলে ধরেছে, কীভাবে এই পাহাড়কে বশ মানিয়ে মানুষের বসবাসের উপযোগী করা হয়। সহস্রাধিক দ্বীপের এই দেশে পাহাড় যে কেবল আশ্রয়স্থল নয়, এ যেন প্রকৃতির সাথে জাপানিদের মানিয়ে নেওয়ার অভিপ্রায়।

japanছবিতে দেখতে পাবেন, পাহাড় গাত্রে পাইলিং করে কনক্রিটের দেয়াল তৈরি করা হচ্ছে। স্তরে স্তরে গড়ে ওঠা বসতি আর রাস্তার সারি দেখলেই বুঝতে পারবেন, তারা কেন এই্গুলো নিরাপদ ভাববে না। অতিবৃষ্টি যেন বাড়িগুলোতে প্রভাব ফেলতে না পারে, এই জন্য পাইলিং মাঝ পথ দিয়ে কনক্রিটের ড্রেন করা হয়েছে। আর এই জলের প্রবাহ কমানোর জন্য উঁচু-নীচু সিঁড়ি করা হয়েছে। ফলে অতিবৃষ্টিতে জলের স্রোতের বেগ কমে যায়। যার কারণে পাহাড় ধসের সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।

তাছাড়া পাইলিংগুলোর মাঝ বরাবর কিছু স্প্রিং টাইপের ছোট ছোট প্যান্ট থাকে যা ভূমিকম্পে পাহাড় দুলাদুলি করলেও বাড়িতে কোন প্রভাব ফেলতে দেয় না।

এই দেশের আর একটি মজার বিষয় হলো, ‘ভূমি ধস সমিতি’। টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অধ্যাপক এই সমিতির সভাপতি হলেও সমগ্র দেশজুড়ে ১১টি শাখা রয়েছে। যাদের কাজ হলো, যেসব অঞ্চল ভূমিধসের শঙ্কা রয়েছে, সেই অঞ্চলে গবেষণা চালিয়ে বসবাস উপযোগী নতুন নতুন পদ্ধতি উদ্ভাবন করা। যদিও এই জন্য সরকার নিজে অর্থ খরচ করে।

আজ কয়েকদিন থেকে আমার জাপানি বন্ধুর সেই কথাগুলো মনে পড়ছে। আমার দেশে পাহাড়ের কোলে লেপ্টে থাকা মানুষগুলোর লাশের দীর্ঘ সারি আমাকে পীড়া দিয়ে চলছে।

বাংলাদেশের পাহাড়ি অঞ্চলের দুঃখ যেন থামছে না। লংগুদুর মানবসৃষ্ট অগ্নিকাণ্ডের রেশ কাটতে না কাটতে ‘মোরা’র মোচড়ে পড়েছিল দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল। আর সেখানে সর্বশেষ অতিথি হিসেবে যোগ দিয়েছে গেল সপ্তাহের পাহাড় ধস। প্রাকৃতিক দূর্যোগে পার্বত্যের তিন জেলায় দেড়শ’ তাজা প্রাণের ক্ষয় যেন বাংলাদেশের দুঃখ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

japanআপাতত এই দেড়শ’ প্রাণের চালানকে ‘নিয়তি’র পরিহাস বলে সবাই মেনে নিলেও আমি তা মানতে পারছি না। মৃত্যুর এই অস্বাভাবিক মিছিলটির দীর্ঘায়ণের জন্য কেবলমাত্র ‘সৃষ্টিকর্তা’র উপর ছেড়ে দিয়ে পার পাওয়া যাবে না। কিংবা বছর ঘুরে পার্বত্য অঞ্চলে পাহাড় ধসে গত এক দশকে যে তিনশ’ ছাড়িয়েছে তার জন্য বরাবরই আমার প্রকৃতিকে দুষছি। কিন্তু আমি এগুলোকে হত্যাকাণ্ড বলেই দাবি করছি।

এখন প্রশ্ন জাগতে পারে, কারা এই হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত? কেনই বা আমি হত্যাকাণ্ড বলে চালিয়ে দিচ্ছি? এই্ প্রশ্নের উত্তর দেব তবে তার আগে একটি পরিসংখ্যান দেখে আসা যাক।

সারা বিশ্বের ৭০ ভাগ জল হলেও ২০ ভাগই পাহাড়। আর ১০ ভাগ হলো সমতল। সম্ভবত বিশ্বের সিংহভাগ ধনী দেশের মোট আয়তনের তিনভাগের বেশি পাহাড়। তাই বলতে গেলে বিশ্বের জনবসতির জন্য আমরা পাহাড়ের চূড়া আর পাদদেশকে বেছে নিয়েছি।

সারা বিশ্ব যদি পাহাড়ের কোলে পাহাড়কে না বুলিয়ে ঘুমিয়ে থাকতে পারে তাহলে, আমরা কেন প্রাকৃতিক দুর্যোগ নাম ভাঙিয়ে পরাজয় মেনে নিচ্ছি? কেন বছর পর বছর ঝুঁকিপূর্ণ বসবাসে পাহাড়িদের নিরাপত্তা দিতে পারছি না? প্রকৃতির নাম দিয়ে মরে যাওয়া মানুষগুলোর দুঃখে কি আমাদের বিবেক তৃষ্ণার্থ হয় না?

japanপ্রতিদিন পত্রিকায় পাবর্ত্য অঞ্চলে পাহাড় কাটার খবর আসে। স্থানীয় প্রভাবশালীর দোহাই দিয়ে পাহাড় কেটে শিল্প-কলকারখানা তৈরি হচ্ছে, দেদারচে বৃক্ষ নিধন হচ্ছে। অপরিকল্পিত গর্ভধারণের মতো পাহাড়ের বুকে রাতারাতি বাড়ি তুলছে। এতো অরাজকতা চলার পরও এই দেশের সরকার চুপ মেরে বসে আছে। কারণ একটাই, যারা পাহাড় কাটছে কিংবা অবৈধ কারখানা পাহাড়ে বুকে তুলছে, তারা কোনো না কোনোভাবে রাজনৈতিক মেরুদণ্ড শক্তপোক্ত। তাই এই দেড়শ’ প্রাণ প্রকৃতির লীলা খেলাতে হারিয়ে গেল।

শুধুমাত্র সদিচ্ছা থাকলেই পাহাড়ে ভূমিধস রোধ করা সম্ভব। সরকার কেন পাহাড়ে পরিকল্পিত বসতি কিংবা বসতির জন্য আধুনিক প্রযুক্তি নির্ভর হচ্ছে না? জাপানের মতো দেশে যেখানে বছরে সাড়ে চার হাজার ভূমিকম্প হয়েও প্রাকৃতিক দুর্যোগে মৃত্যুর হার এক শতাংশে নিয়ে আসছে, সেখানে আমরা কেন পারি না? তারা তো প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে পাহাড়কে শাসন করছে, আমরা কেন পাহাড়িদের দুঃখ লাঘবে হাত বাড়াই না?

পাহাড়ের জনগোষ্ঠি মানেই আদিবাসী, সেকেলে কিংবা গোঁড়া, তা ভাবার চেয়ে এই মানুষগুলোকে সমাজে তুলে আনতে সরকারের ভূমিকা রাখতে হবে। পাপুয়া নিউগিনি যদি এগিয়ে যেতে পারে, তবে পাহাড়ের মানুষগুলোকে কেন এগিয়ে নেয়া হচ্ছে না?

আমরা চাই, সরকার শুধুমাত্র পাহাড়ের উন্নয়নে বিশেষ বরাদ্দ দিয়ে টেকশই বাড়ি-রাস্তাঘাট করে দিক। পাহাড়ি জমিখেকোদের শাস্তির বিধান করে প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা করুক। অন্যরা পারলে আমরাও পারবো। আমি মনে প্রাণে চাই, আর যেন কেউ পাহাড় ধসে নির্মম মৃত্যু না হয়।

লেখক: এস এম নাদিম মাহমুদ
ইমেইল: nadim.ru@gmail.com