জাপানে বৃষ্টিভেজা বিকেলে চন্দ্রিমা উদ্যানের স্মৃতি

plasid
বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে লেখক

১৯ আগস্ট শনিবার আমার যাওয়ার কথা ছিল সাদো আইল্যান্ড। সেদিন ওখানে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। এর মধ্যে ফোন দিলেন আবিদ ফাহিম রাজু। বললেন বাংলাদেশ থেকে কয়েকজন এসেছেন। তারা তাদের এক বন্ধুর বাসায় মিলিত হয়ে একসঙ্গে লাঞ্চ করবেন। তিনিও সেখানে থাকবেন। এরপর কাছেই কাওয়াছাকিতে ফায়ার ওয়ার্কস দেখতে যাবেন। রাজু আমাকেও তাদের সঙ্গে যোগ দিতে অনুরোধ করলেন। নতুনদের সঙ্গে পরিচয় হওয়ার অভ্যাস বা ইচ্ছে আমার দীর্ঘদিনের। রাজুকে সম্মতি দিয়ে সাদো আইল্যান্ড যাওয়ার প্রোগ্রাম পিছিয়ে দিলাম।

সাদো আইল্যান্ডে তিন দিনের এক উৎসব হয়। এবার সেই উৎসবের ত্রিশ বছর পূর্তি উদ্‌যাপন করা হবে। এ জন্য বিশেষ উৎসবের আয়োজন করা হয়েছে। তিন দিনের সেই উৎসবে আমার সঙ্গে সহিদুল হকের যাওয়ার কথা ছিল। তিনি আমাকে রেখেই চলে গেলেন। আমি সহিদুলকে কথা দিলাম, রাজুদের সঙ্গে ফায়ার ওয়ার্কস দেখে রোববার সেখানে যাব এবং সোমবার তার সঙ্গে ফিরে আসব।

এ দিকে ওই দিন দুপুরে ফোন এল জোনায়েদ আহমেদের কাছ থেকে। ফোন ধরতেই তিনি বললেন, আপনার নাকি আমার বাসায় আসার কথা। সবাই চলে এসেছে। আপনিও চলে আসেন। আপনি এলেই সবাই মিলে ভাত খাব। বলেই সেল ফোনে এসএমএস করে তার বাসার ঠিকানা পাঠিয়ে দিলেন। আমি আগা মাথা কিছু বুঝছিলাম না। আমি কার বাসায় যাব সেটাও জানতাম না। রাজু আমাকে দাওয়াত দিয়েছে তার বন্ধুর বাসায় নিয়ে যাবে বলে। কিন্তু রাজুর বন্ধুটা যে কে, তা না বলাতে আমি ধাঁধায় পড়লাম। কখনো কখনো আমি ইচ্ছে করেই এমন ভুল করি। বিস্তারিত না জেনেই কারও দাওয়াত রাখি কিছুটা ভিন্ন রকমের আনন্দ করার জন্য। জোনায়েদ বলল, রাজুরা এসে গেছে। আপনি চলে আসেন। তখনই বুঝতে পারলাম ঘটনা কি হয়েছে।

বাসা থেকে বের হওয়ার কথা ছিল তিনটার দিকে। জোনায়েদের ফোন পেয়ে এক ঘণ্টা আগেই বেরিয়ে পড়লাম। আমার বাসা থেকে অনেকটা কাছে তাদের ঠিকানা। সেল ফোনে এসএমএস করে পাঠানো ঠিকানা ইন্টারনেটে সার্চ দিয়ে বের করে নিলাম কোন ট্রেনে কত সময় লাগবে আর কত ভাড়া। সব জেনে রওনা দিলাম তড়িঘড়ি করে। ঠিক ৪৫ মিনিটের মধ্যে গিয়ে পৌঁছলাম জোনায়েদের বাসার কাছে নাকানো সিমা স্টেশনে। গিয়ে দেখি স্টেশনের সামনে জোনায়েদ দাঁড়িয়ে আছে। দেখেই হাসি দিয়ে হাত মেলাল। তার সঙ্গে বাসায় গেলাম। গিয়ে দেখি সম্প্রতি দেশ থেকে আসা কয়েকজন ছাত্র সবাই আমার অপেক্ষায়। যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই খাবার সামনে চলে এল।

জোনায়েদ সস্ত্রীক থাকে। দুজনই স্টুডেন্ট। জোনায়েদকে আমি চিনি। তবে প্রথম কবে, কোথায় দেখা হয়েছে তা মনে নেই। সেই বলল, যাত্রাবাড়ীতে তার জাপানপ্রবাসী মামার বাসায় মামার ছেলের জন্মদিনের পার্টিতে কয়েক বছর আগে প্রথম দেখা হয়। ঘটনা মনে পড়লেও তার চেহারা আমার মনে পড়ছিল না। তবে সে পরিচয় বাদ দিয়ে নতুন করে পরিচয় হওয়ার কথা বললাম। আমাকে পেয়ে তারা খুব আন্তরিকতা দেখাল। ভালো লাগল তাদের আন্তরিকতা দেখে।

জাপানে প্রতি বছরই বাংলাদেশ থেকে শিক্ষার্থী আসছে জাপানিজ ভাষা শিখতে কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করতে। আমরা যখন এসেছি, জাপানে অধিকাংশই এসেছিলাম শুধুই কাজ করার উদ্দেশে। এখন যারা আসছেন তাদের উদ্দেশ্য অর্থ উপার্জন হলেও আসার পথ ও পদ্ধতি হচ্ছে ভিন্ন। আগত সবাই প্রায় শিক্ষিত। কমপক্ষে এইচএসসি বা পিএইচডি করা। অনেকে সেমিনারে আসেন বেশি। যেখানে যাই, যাদের সঙ্গে দেখা হয়, তাদের সঙ্গে কথা বলার সময় লক্ষ্য করি, তাদের মধ্যে শিক্ষার আলোই প্রকাশ পায় সর্বদা। চোখে মুখে থাকে এক সোনালি স্বপ্ন। জোনায়েদের বাসায় এসেও যাদের পেলাম তাদের কয়েকজন দেশে মাস্টার্স সম্পন্ন করেছেন। কেউ সম্পন্ন না করেই এসেছেন। জাপানে নতুন আসাদের সঙ্গে কথা বলতে যেমন ভালো লাগে তেমনই আড্ডা দিয়েও সময় কাটে ভালো।

এখানে এসে যাদের সঙ্গে আমার নতুন পরিচয় হলো তারা হলেন কাইজেন রাজু, মো. শরিফুল ইসলাম সুমন, ফজলে এলাহী পলাশ, তানজিম আহমেদ, রাহাতুল জাহান আরমান ও হিমেল আহমেদ। হোস্ট ছিল জোনায়েদ ও তার সহধর্মিণী হিমু। খাবার শেষ করেই পূর্বপরিকল্পিত ফায়ার ওয়ার্কস দেখার জন্য বেরিয়ে পড়ি। কয়েকবার ট্রেন পরিবর্তন করে আমরা চলে গেলাম নির্ধারিত স্থান কাওয়াছাকি-তামাকোতে নদীর ধারে। সেখানে যেতেই দেখি বোমা ফাটিয়ে টেস্ট করতে শুরু করে দিয়েছে। একই সময় মাথার ওপর আকাশও তার রং বদলে কালো হতে শুরু করেছে। সেদিন কোথাও বৃষ্টি হওয়ার পূর্ব ঘোষণা ছিল না। অনেকটা হঠাৎ করেই পরিষ্কার নীলাকাশ দ্রুত কালো হচ্ছিল।

বাসা থেকে ফোন করে ইউকি বলল, বাসার কাছে প্রচণ্ড বৃষ্টি হচ্ছে সঙ্গে বজ্রপাতও। বলার কিছুক্ষণ পরেই আমরা যেখানে গেলাম ফায়ার ওয়ার্কস দেখতে, সেখানেও বজ্রপাত শুরু হয়ে গেল। আমরা তখন বোমার শব্দ আর বজ্রপাতের শব্দ আলাদা করতে পারছিলাম না। মাঠের মধ্যে আয়োজন করে বসার কিছু সময়ের মধ্যেই দূরে দেখা গেল বৃষ্টি ঝরতে শুরু করেছে। ভেবেছিলাম দূর দিয়েই হয়তো চলে যাবে সেই বৃষ্টি। কিন্তু না কবিতা জন্ম দেওয়ার মতন বৃষ্টি মুহূর্তেই যেন কবিতা সব মুছে ফেলার মতন করে ঝরতে শুরু করল। আমরা দিগ্‌বিদিক কোনো কিছু না বোঝার আগেই বাতাস এসে আসে পাশের সব উড়িয়ে নিয়ে যেতে শুরু করল। সেটা নিয়ে মজা করতে করতে ঝুপঝুপিয়ে ভিজিয়ে দিল। দৌড়ে গিয়ে টয়লেটে আশ্রয় নেবার ব্যর্থ চেষ্টা করলাম। মাঠ ভরা হাজারো দর্শক, যে যেভাবে পারছিলেন নিজেদের বৃষ্টি থেকে রক্ষা করার চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু সবাই ব্যর্থ। মাঠের ওপর দাঁড়িয়ে বসেই কাকভেজা ভিজলাম।

japan
বৃষ্টি থেকে রক্ষা পাওয়ার চেষ্টা

দীর্ঘদিন এমন করে বৃষ্টিতে ভেজার যে শখ ছিল, তা মিটিয়ে দিল কাওয়াছাকির এই ফায়ার ওয়ার্কস দেখতে আসা বিকেল। কিছুদিন আগেই ফেসবুকে বিভিন্নজনের কত কাব্যিক স্ট্যাটাস পড়েছি। বৃষ্টির সম্ভাবনা হলেই যেন লেখকেরা কই মাছের মতন সরব হয়ে ওঠেন। সেদিন বৃষ্টিতে ভিজে জাপান আসার এক মাস আগের এক ঘটনা মনে পড়ল। পড়ন্ত বিকেলে পাখিকে (ছদ্মনাম) নিয়ে শেরেবাংলা নগর চন্দ্রিমা উদ্যানে গিয়েছিলাম ঘুরতে। তখন মাথার ওপর সূর্য প্রচণ্ড উত্তাপ ও আলো ছড়াচ্ছে। পরিষ্কার আকাশ। কোথা থেকে হঠাৎ একখণ্ড মেঘ এসে ঝুপঝাপ বৃষ্টি ঝরিয়ে গেল। দৌড়ে কোথাও যাওয়ারও উপায় ছিল না। বাধ্য হয়ে সেখানে দাঁড়িয়ে ভিজতে হলো দুজনকেই। উদ্যান ভরা আমাদের মতন আরও অনেক জুটি ছিল। সবার একই অবস্থা হয়েছিল। সেই যে ভিজেছি। তার ছাব্বিশ বছর পর আবার জাপানে আমি বৃষ্টিতে ভিজলাম। সঙ্গে পাখি না থাকলেও বৃষ্টিকে উপভোগ করার মতো লোকের অভাব ছিল না।

পি আর প্ল্যাসিড: জাপানপ্রবাসী