দক্ষিণ কোরিয়া কি সমাধান দিতে পারবে?

hs-mon
ক্যাথারিন এইচ এস মুন

উত্তর কোরিয়ার একনায়ক কিম জং-উন ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যে কথার লড়াই চলছেই। এর মধ্যেই উভয় কোরিয়া স্বাধীনতা দিবস উদ্‌যাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। ১৯৪৫ সালে তারা জাপানি ঔপনিবেশিক শাসনের হাত থেকে মুক্ত হয়। এদিন এলে বোঝা যায়, উভয় দেশের অভিন্ন ইতিহাস রয়েছে। শুধু তা-ই নয়, দুই দেশের সামরিক বাহিনীর এই মুখোমুখি অবস্থানের অবসান ঘটানোর বিশেষ যোগ্যতা যে দক্ষিণ কোরিয়ার আছে, সেটাও বোঝা যায়।

কিম জং-উন বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাশালী রাষ্ট্রকে হুমকি দিয়ে যত মজাই পান না কেন, যুক্তরাষ্ট্র কখনোই উত্তর কোরিয়ার মূল লক্ষ্য ছিল না; বরং বিপরীতভাবে উত্তর কোরিয়ার মূল লক্ষ্য হচ্ছে কিম জং-উনের শাসন রক্ষা করা এবং তাঁর নেতৃত্বে দুই কোরিয়া একত্র করা। সে কারণে দক্ষিণ কোরিয়া সবচেয়ে গুরুতর হুমকির মুখে আছে। উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে তার বিবাদ মিটিয়ে ফেলার প্রয়োজনীয়তাও অত্যন্ত বেশি।

কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বার্ষিক যৌথ মহড়ার (আলচি ফ্রিডম গার্ডিয়ান-ইউএফজি) লক্ষ্য হচ্ছে দুই দেশকেই উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত করা। তাই এর মাধ্যমে দক্ষিণ কোরিয়ার লক্ষ্য অর্জিত হবে না; বরং উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে যখন যুক্তরাষ্ট্রের দ্বন্দ্ব চরম পর্যায়ে রয়েছে, তখন এই মহড়ার (২১ আগস্ট শুরু হবে) কারণে দ্বন্দ্ব চরম পর্যায়ে চলে যেতে পারে। এমনকি স্বাভাবিক সময়েও উত্তর কোরিয়া এই মহড়ার ব্যাপারে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখায়। গত বছর এই মহড়ার পর তারা পঞ্চম পারমাণবিক অস্ত্রের পরীক্ষামূলক উৎক্ষেপণ ঘটায়। আর এবার তো উত্তর কোরিয়া মার্কিন ভূমি গুয়ামে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার হুমকি দিচ্ছে। ট্রাম্প যদি কিমকে আরও উসকানি দেন, তাহলে এবার উত্তর কোরিয়ার প্রতিক্রিয়া তেমন প্রতীকী হবে না, সেটা আরও বিপর্যয়কর হবে।

এখন উত্তর কোরিয়া যদি আঘাত করে, তাহলে দক্ষিণ কোরিয়া-যুক্তরাষ্ট্র যে নিরোধের নীতি গ্রহণ করেছে, তা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। নিরোধের নীতি হলো, প্রতিপক্ষকে গুরুতর শাস্তির বিশ্বাসযোগ্য হুমকি দিয়ে সামরিক সংঘাতে জড়িত হওয়া থেকে বিরত রাখা। তা সত্ত্বেও উত্তর কোরিয়া ট্রাম্পের হুমকিকে অর্থহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছে। এই মাসের যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা যদি সামরিক সংঘাতের দিকে এগিয়ে যায়, তাহলে এই নিরোধের নীতি ব্যর্থ হবে।

এই দুই নেতা পরস্পরকে বিশ্বাস করেন না, পৃথিবীও তাঁদের বিশ্বাস করে না। চীনা নেতারা বহুদিন ধরে ট্রাম্পকে অনির্ভরযোগ্য মনে করেন। এবার ট্রাম্প উত্তর কোরিয়ার ব্যাপারে যে আবেগীয় প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন, তাতে চীন মনে করছে, এ ব্যাপারে যুক্ত হওয়ার তেমন কারণ নেই। যে শিনজো আবে পূর্ব এশিয়ায় ট্রাম্পের সবচেয়ে কট্টর সমর্থক, তিনিও ট্রাম্পের এই বিপজ্জনক নীতির অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক হয়ে উঠেছেন।

জাপান উত্তর কোরিয়ার চূড়ান্ত ঐতিহাসিক শত্রু, ফলে কিমের ওপর তাদের প্রভাব নেই। এই পরিস্থিতিতে একমাত্র দক্ষিণ কোরিয়াই বিশ্বাসযোগ্যভাবে শান্তিপূর্ণ সমাধানের অনুপ্রেরণা দিতে পারে। কিন্তু দেশটি এখন পর্যন্ত কূটনীতি ও শত্রুতার মধ্যবর্তী পথ মাড়িয়েছে। তারা একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এ ব্যাপারে একমত যে উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ ও সামরিক প্রস্তুতি রাখতে হবে, যার মধ্যে আছে থাড ক্ষেপণাস্ত্র নিরাপত্তাব্যবস্থার পূর্ণাঙ্গ মোতায়েন। অন্যদিকে তারা এই ইঙ্গিত দিয়েছে উত্তরের সঙ্গে যৌথ সামরিক সংলাপের ব্যাপারে তারা রাজি। এমনকি তারা কিমের সরকারকে যৌথভাবে স্বাধীনতা দিবস উদ্‌যাপনের অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানিয়েছে।

দক্ষিণ কোরিয়াকে এখন শক্তিশালী পদক্ষেপ নিতে হবে। দুর্বল প্রতিপক্ষকে কোণঠাসা করে তাদের আক্রমণাত্মক অবস্থানে ঠেলে দেওয়ার ঝুঁকি না নিয়ে দক্ষিণ কোরিয়ার উচিত হবে, এ বছরের যৌথ মহড়া অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করার অনুরোধ করা। ব্যাপারটা হলো দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র এ বছরের মার্চ-এপ্রিল এবং ২০১৬ সালে ৩ লাখ ২০ হাজার সেনার বিশাল যৌথ মহড়া করেছে, যা উল্লিখিত ইউএফজির সম্মিলিত শক্তির ছয় গুণ বেশি। ওই সময় যুক্তরাষ্ট্র স্ট্রাইক ফোর্স মোতায়েন করেছিল, যার মধ্যে পারমাণবিক অস্ত্রসমৃদ্ধ ইউএসএস কার্ল ভিনসনও ছিল। তারা বলেছিল, এটি বেপরোয়া আক্রমণ ঠেকাতে পারবে। তারা দক্ষিণ কোরিয়ায় ইউএসএস মিশিগান নামের পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিন ইউএসএস মিশিগান নোঙর করেছিল। এমনকি তারা উত্তর কোরিয়ায় ঢুকে কিম জং-উনকে উৎখাতেরও প্রস্তুতি নিয়েছিল।

এই পরিপ্রেক্ষিতে যৌথ সামরিক মহড়া বাতিল করা হলে দক্ষিণ কোরিয়ার পক্ষে উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে সামরিক সংলাপ চালানো যাবে। একই সঙ্গে দুই দেশের হটলাইন চালু করা সম্ভব হবে, যা গত বছর কেটে দেওয়া হয়েছিল। দক্ষিণ কোরিয়ার উচিত হবে, উত্তর কোরিয়াকে যৌথভাবে স্বাধীনতা দিবস উদ্‌যাপনে সমন্বয়ের দায়িত্ব দেওয়া। কোরীয়দের জন্য এটা প্রায় পবিত্র দিবস। সাবেক অভিন্ন কোরিয়া ও ভবিষ্যতের সম্ভাব্য একীভূত কোরিয়ার প্রতীক।

নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, দক্ষিণ কোরীয় প্রেসিডেন্ট মুন জে-ইনের প্রশাসন ইতিমধ্যে সেই প্রস্তাব দিয়ে সফলকাম হয়নি। তবে যৌথ মহড়া স্থগিত করে তিনি সেটা হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন। সে ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র-উত্তর কোরিয়া বিবাদে দক্ষিণ কোরিয়া মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হবে, শুধু যুক্তরাষ্ট্রের ধামাধরা নয়। ফলে পরিস্থিতি ঠান্ডা হলে তিন পক্ষের আলোচনার সম্ভাবনা উজ্জ্বল হবে।

উত্তর কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র—উভয়ের সঙ্গে সম্পর্ক থাকায় পরিস্থিতি ঠান্ডা করার ক্ষেত্রে সে অনন্য অবস্থানে আছে। এতে তার লাভবান হওয়ার সম্ভাবনা এত বেশি যে এই চেষ্টা তার না করার কারণ নেই।

স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট, অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন।

ক্যাথারিন এইচ এস মুন: ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের অনিবাসী জ্যেষ্ঠ ফেলো।