পরবাসের কিছু খণ্ড স্মৃতি

australia
সিডনির সেন্টার পয়েন্ট টাওয়ার

দেশে তখন মাস্টার্স পরীক্ষা শেষে একটা প্রাইভেট ফার্মে চাকরি করছি। একদিন বিকেলে বাসায় ফেরার পথে আরামবাগ মোড়ে ট্রাফিক জ্যামে আটকা পড়ে আছি। ঠিক তখনই অস্ট্রেলিয়ায় সপরিবারে অভিবাসী আমার ছোট বোন নিশাত ফোন করল।

—ভাইয়া, তুমি অস্ট্রেলিয়ায় চলে এসো। আমাদের বাসার আশপাশেই বড় বড় ইউনিভার্সিটিগুলো। ইচ্ছামতো পড়াশোনা করতে পারবে। আজীবন। ডিমান্ড লিস্টের কোনো একটা ডিগ্রি কমপ্লিট করে অ্যাপ্লাই করে দিলেই মাইগ্রেশন হয়ে যাবে। তখন অনেক ভালো লাগবে তোমার। আর অস্ট্রেলিয়ান পাসপোর্ট নিয়ে বিশ্বভ্রমণ অনেক সহজ, জানো নিশ্চয়ই।

—হ, জানি। তবে ঢাকা শহরের ধুলাবালি, ডাস্টবিন, ময়লা নর্দমার গন্ধ। একটু বৃষ্টিতে রাস্তায় বাস বিকল। কোমর পানি, কখনো বুক সমান পানি সাঁতরে বাসায় ফেরা। কী সব অ্যাডভেঞ্চার। এসব কি তোদের অস্ট্রেলিয়ায় আছে?

—দেখ! সিরিয়াসলি বলছি। রসিকতা বন্ধ। ছোটবেলায় ভাইবোন একসঙ্গে পড়ালেখা করেছি। এখন কোথায় তুমি, কোথায় আমি। এভাবে আর ভালো লাগে না। তোমার ভাগনে-ভাগনি সারাক্ষণ কেবল তোমার গল্প করে।

—হ, বুঝতে পারছি। বললেই তো আর হয় না। ওই সব আইইএলটিএস, ফাইনালি এস আমার দ্বারা হবে না।

—হবে না কেন? পরীক্ষার পড়া ফেলে মাইকেল মধুসূদনের ক্যাপটিভ লেডি পড়তে। এডগার এলান পো, কখনো ও হেনরির গল্প আমাকে অনুবাদ করে শোনাতে। এসব নতুন কি আর। সুযোগ একবার হাতছাড়া হলে আর আসে না। সব ব্যবস্থা আমি করব। চলে এসো।

আমার জন্মের দেশটা যতই গরিব হোক, দুর্নীতি-দুর্দশা যতই থাকুক, কেন যেন খুব মায়া হয়। মাসে একবার বাড়ি যাই। মা-বাবাকে দেখি। ফুফু-খালাম্মার আদরমাখা রান্না খাই। আত্মীয়স্বজন বিভিন্ন জায়গায় মেয়ে দেখে। মা-বাবা এই ত্রুটি, সেই ত্রুটি বের করে প্রস্তাবগুলো বাতিল করে দেন। আবার কিছু কিছু প্রস্তাবে সায়ও দেন। জীবনটা খারাপ যাচ্ছে না তো। তবে নিশাতের সঙ্গে কথা বলে হঠাৎ কেমন যেন পরিবর্তনের হাওয়া লাগে মনে। যেমন কবি বলেছেন—থাকব নাকো বদ্ধ ঘরে, দেখব এবার জগৎটাকে। সুযোগ যখন আছে, বাংলাদেশের বদ্ধ ঘর থেকে একবার জগৎটাকে ঘুরে দেখা, ভালোই তো। তাই সেদিন চলন্ত রিকশায় বাসায় ফেরার পথে নিশাতের প্রস্তাবে সম্মতি দিয়ে দিলাম।

ভাইকে কাছে পাওয়ার আনন্দে নিশাত আর কথাই বলতে পারল না। এক চিৎকারে আমার দুই ভাগনে আর ছোট ভাগনিটাকে ডেকে বলল, এই জশ-ইমু-সামি! তোমাদের ছোট মামা অস্ট্রেলিয়ায় আসবে…! আর সঙ্গে সঙ্গেই এই তিনজনের লাফালাফি শুরু হয়ে গেল। স্কাইপে অন করে সব দেখতে পাচ্ছি।

নিশাত বলল—ভাই, তোমার আসা যাতে সফল হয়, এই কামনায় আজ বাসায় পার্টি দেব।
আমি অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে বললাম—দে, যা ইচ্ছা কর।

অন্যদিকে মুখ ফেরালাম এই জন্য যে, আমার এই ছোট বোন নিশাত একবার কোনো কিছু করবে বলে স্থির করলে করেই ছাড়ে। ওকে ফেরানোর কোনো উপায় থাকে না। তাই ওর প্রস্তাবে সম্মতি দেওয়া মানে ওখানে আমাকে যেতেই হবে। দেশের প্রতি আজন্মের মায়ার বন্ধনটাতে এ সময় খুব শক্ত একটা টান পড়ে। মনটা কেমন করে ওঠে।

writer-hafiz
লেখক

চৌদ্দ পুরুষ যেথায় মানুষ সে মাটি সোনার বাড়া—এ কথাগুলো কেন যে এমন ধ্রুব সত্য হয়ে অন্তরে বাজে, জানি না। কাগজপত্র সব চলে এলে ভিসা প্রসেসিংয়ে বেশ কয়েক দিন সময় লেগে যায়। তারপর নির্ধারিত দিনে প্রায় ১৩ ঘণ্টা আকাশে উড়ে সন্ধ্যায় সিডনিতে ল্যান্ড করি। বাইরে এসে দেখি, সবাই আমাকে রিসিভ করতে দাঁড়িয়ে আছে। ইমুর হাতে ফুলের একটি তোড়া। মামাকে পেয়ে ওর অভিব্যক্তির সে কী অবস্থা। তোড়াটা দিয়ে আমাকে বেশ জোরে এক ধাক্কা মেরে বলে—নাও।
ফুলের তোড়া হাতে ভাইবোন, ভগ্নিপতি সবাই জড়াজড়ি। এ সুযোগে ছোট ভাগনিটা মায়ের কোল ছেড়ে কখন যে আমার কাঁধের ওপর উঠে বসে গেল, টেরই পেলাম না।

জশ বলল—মামা, বাসায় তোমার রুমের বেড আর টেবিলের ওপর আমরা অনেক ফুল রেখেছি। আহা, আমার ভাগনে। কত বড় হয়ে গেছে। কেমন সুন্দর কথা কয়। সেই কবে দেশে গিয়েছিল বেড়াতে। একটু-আধটু কথা বলতে পারত তখন। আর ভাগনিটা তো জন্মের পর এখনো দেশেই যায়নি।
ভগ্নিপতি জোবায়ের বলল—আরে ভাই, কী যে অবস্থা। কয়েক দিন ধরে আপনার আসার দিন গুনতে গুনতে ওরা খাওয়া-ঘুম ছেড়ে দিয়েছে। তিনজনে মিলে আপনার রুমটাকে কতভাবে যে সাজানো-গোছানো চলছে…।

এত দিন পর দেখা। মনের অজান্তেই চোখ দুটো ভিজে এল। বড় ভাগনে জশের বয়স সাত। ইমুর পাঁচ আর ভাগনি সামিয়ার বয়স তিন বছর। ইংরেজি-বাংলা মিশিয়ে এক খিচুড়ি ভাষায় কথা বলে ওরা।

জোবায়ের ড্রাইভ করছে। অকল্পনীয় সুন্দর রাস্তা দিয়ে এগিয়ে চলল আমাদের গাড়ি। একটু খোলা জায়গায় এসে হাত উঁচিয়ে নিশাত বলল, ভাইয়া, ওই দেখো, অনেক উঁচুতে যে লাল বাতিটা দেখা যায়, ওটা হলো সেন্টার পয়েন্ট টাওয়ার।

সেদিকে তাকিয়ে দেখি। হ্যাঁ, তাই তো। সিডনি শহরের ছবিতে প্রথম চোখে পড়ে এই টাওয়ার। আজ বাস্তবে তার দেখা মিলল। উন্মুক্ত ঝাপসা অন্ধকারের ভেতর দিয়ে কেমন দেখা যায়…। গাড়ির কাচ নামিয়ে সিডনির বাতাসের ঘ্রাণটা নিতে বুকভরে শ্বাস নিই। আহা, একেই বুঝি বলে বাতাসের আসল স্বাদ।

কিছুটা টের পেয়ে জোবায়ের বলল, ঢাকা শহরের সঙ্গে তুলনা করলে এ দেশের রাস্তাঘাট আর পরিবেশ কেমন লাগছে ভাই?
আমি আর কিছু বলি না। বাইরের দিকে তাকিয়ে পরিবেশটাকে উপভোগ করছি। কীই-বা দরকার ওই সব দৃশ্য মনে করে। সেদিন নিজের দেশটাকে বেইজ্জতি করা আমার ভালো লাগে না।

এরই মধ্যে জশ বলে ওঠে, মামা, আমি যখন দেশে গেছি, নানাবাড়ি যাওয়ার সময় দেখেছি ওই যে একটা মানুষ বাইরে টয়লেট করছে। তারপর ওই যে ট্রেনটা চলে গেছে। আমি আর দেখতে পারি নাই পরে ওই মানুষটা কী করছে।
—ও আচ্ছা…। বলি আমি।

—তারপর এখানে আমি রাফি মামাকে জিগাইছি। রাফি মামা বলেছে, বাংলাদেশে কিছু মানুষের বাথরুম নাই। ওরা বাইরে গিয়ে টয়লেট করে। তারপর ওরা নদীতে গিয়া পাছা ধোয়।

আহা রে, দীর্ঘ জার্নির পর এইমাত্র এত সুন্দর একটা পরিবেশে প্রবেশ করলাম। আর এই বদের দল, আজগুবি সব বিষয় নিয়া কথাবার্তা শুরু করেছে। এদিকে জশকে কিছু না বলে বোন-ভগ্নিপতি দুজনই মুখ ঢেকে হাসাহাসি শুরু করে।

বললাম, জি মামা, দেশে গিয়ে আপনার রাফি মামাই হয়তো বাইরে টয়লেট করে আর নদীতে পাছা ধোয়। বাসায় এসে দেখি, নিচতলায় আমার বোন-ভগ্নিপতির একটা বাংলা গ্রোসারি আছে। রাফি ওই দোকানে পার্টটাইম চাকরি করে। কাজের ফাঁকে ফাঁকে রাফি আমার ভাগনে-ভাগনিদের নিয়ে বাংলাদেশের গল্প করে।
ক্লাস শুরু হতে আরও সপ্তাহখানেক দেরি। এই এক সপ্তাহ সময় সবাই মিলে এখানে-ওখানে নিমন্ত্রণ খাওয়া আর সুন্দর জায়গাগুলো ঘুরে দেখা হবে বলে আসার পথেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

সকাল সাড়ে আটটা। ভাগনে-ভাগনিদের নিয়ে বাইরে আসি। ইস্টার্ন সার্বাবের এই এলাকাটা ইস্ট লেকস নামে পরিচিত। ‘বাঙালি পাড়া’ নামে ইস্ট লেকসের খ্যাতি বহু আগে থেকেই। শনিবার সকাল। ছুটির দিন। রাস্তায় লোকজনের হাঁটাচলা প্রায় নেই বললেই চলে।

এরই মধ্যে ওরা তিনজনই বায়না ধরল, মামা, ম্যাকডোনাল্ডস খাব।
—ঠিক আছে, চলো। সঙ্গে সঙ্গেই তিনজন ঠিক করে ফেলল, কে কি খাবে। ইমু খাবে চিকেন নাগেটস, জশ চিকেন বার্গার আর আমার কোলের ভাগনি বলে ওঠে, মামা, আমি কাব চিপস।

ইউনিভার্সেল স্ট্রিট ধরে তিনজনকে নিয়ে চলেছি। চিনি না কিছুই। অন্ধ হাতির মতো চলছি। আমাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে চলেছে জশ। হঠাৎ করে রাস্তার ওই পাশ দিয়ে অদ্ভুত রকমের মেদ ভুঁড়ির একজন মানুষকে হাঁটতে দেখা গেল। তিন কদম হাঁটতে তার সময় লাগে দেড় মিনিট। কোরবানির বাজারের সবচেয়ে বড় গরুটাও মনে হয় এত মোটা হয় না। লোকটাকে দেখে আমার নিজেরই শ্বাস-প্রশ্বাসে টান ধরে যায়। জশকে ডেকে বললাম, এই মিয়াসাব, ওই দেখেন একটা বলদ।
সে কি বুঝল না বুঝল জানি না। উল্টো আমাকেই বলে বসল, মামা চুপ থাক। তুমিই-ই একটা বলদ।

—ও আচ্ছা।
ইমু পেছনে হাঁটছিল। একদৌড়ে সামনে এসে জিজ্ঞেস করল, মামা, বলদ কি? বললাম, মামা, বাংলাদেশে কিছু মানুষ আছে। খুব বেশি মোটা। অলস। খায় আর ঘুমায়। কোনো কাজকর্ম করে না। খোদার খাসি। ওই সব মোটা মানুষদের বলা হয় বলদ।
—ও। সমস্বরে বলে ওরা।

তারপর কয়েক সেকেন্ড নীরবে হেঁটে কি যেন চিন্তা করতে করতে হঠাৎ ইমু অদ্ভুত রকমে লাফিয়ে উঠে বলল, ইয়াহ হো…। তাহলে আমার আব্বুও একটা বলদ।
এদিকে আমি নিজের কপালে কয়েকটা থাপ্পড় দিয়ে অদৃষ্টকে দোষারোপ করতে শুরু করি। আহা, কী এক আজব দেশে এসে পড়লাম। কী সব আজব বাচ্চা-কাচ্চা! লজ্জা-সংকোচ কিচ্ছু নাই। এখন যদি সে বাসায় গিয়ে ওর বাবাকে বলে, আব্বু, মামা বলেছে তুমি একটা বলদ। প্রেসটিজ পাংচার হওয়ার আর কিছু বাকি থাকবে না।
তারপর অনেক বাবা-সোনা ডেকে, বাংলাদেশের কালচারে শব্দটার যথাযথ অর্থ ব্যাখ্যা করে ইমুর মন থেকে কথাটা দূর করতে হলো। শেষে বললাম, মামা, আপনার আব্বু যদি আরও মোটা হয়ে পেটটা মটকির মতো হয়ে যায়, তবুও আব্বুকে কখনো বলদ বলতে নেই।

জশ বলে, মামা মটকি আবার কি?
এ কি জ্বালার মধ্যে পড়লাম। কথা বলতেই বিপদে পড়ি। শেষ পর্যন্ত জশকে মটকির ব্যাখ্যা দিতে দিতে ম্যাকডোনাল্ডসে চলে আসি। ফেরার পথে বের হয়েই দেখি, প্রায় ছয় ফুট লম্বা এক ছেলে। দুই কানে রিং, আবার চোখের সামান্য ওপরে আর ঠোঁটের কোণেও রুপালি রঙের রিং বসানো।
—ওরে বাপ রে বাপ, ছেলেটা তো খুবই স্মার্ট।

কোন আইসক্রিম খেতে খেতে জশ বলল, চুপ করো।
মনে হলো অন্যকে নিয়ে কথাবার্তা ওর পছন্দ নয়। তারপরও বললাম, আচ্ছা মিয়া সাব, মামারও খুব ইচ্ছে করছে ওই ছেলেটার মতো স্মার্ট হয়ে যেতে। কি বলেন, হয়ে যাই?

—না, না, তুমি কোনো দিনও স্মার্ট হতে পারবে না। বিকজ, তুমি এমনেই ডাম।
—ও আচ্ছা।
বাসায় এসে তিনজনই বেশ মজা করে ম্যাকডোনাল্ডস খাচ্ছে। আমি তখন অনলাইনে একটা বাংলা পত্রিকা পড়ে বোন-ভগ্নিপতির সঙ্গে গল্প করতে শুরু করি। দেখো গতকাল রাজশাহীর একটা কলেজে ছাত্রদের মধ্যে মারামারি লাগলে পুলিশ যাচ্ছিল ওদের থামাতে। যাওয়ার পথে রাস্তায় গাড়ি উল্টে ছয়জন পুলিশ সদস্য মারা গেছে।
কেউ কিছু বলার আগেই জশ বলে উঠল—হি–হি–হি, বাংলাদেশের পুলিশ, শালা বলদ!
আরে, ব্যাপার কি? বাংলাদেশের একটা কষ্টের খবরেও সে তিরস্কারের হাসি হাসে? আর তো ধৈর্য ধরতে পারছি না। তারপর খাওয়া শেষ হলে জশকে ডেকে একটু আড়ালে নিয়ে বললাম, এই মিয়া সাব, বাংলাদেশে ছয়জন পুলিশ সদস্য মারা গেছে, এটা তো দুঃখজনক ঘটনা। আপনি একটু সহানুভূতি না দেখিয়ে উল্টো ওদের টিজ করলেন, বিষয়টা কি?
চুইংগাম চিবোতে চিবোতে জশ বলল, ওই যে কাউকে হেল্প করতে যাওয়ার সময় নিজের সেফটি আগে থিংক করতে হয়। ওরা তা না করে নিজেদেরই কিল করে ফেলেছে।
বোবার মতো পাশে বসে রইলাম কিছুক্ষণ। অস্ট্রেলিয়ায় জন্ম নেওয়া এই সাত বছরের ছেলেটিকে এখন কি বলব আমার মতো বোকার স্বল্পবুদ্ধিতে আর কুলিয়ে উঠল না।
দুপুরবেলা একে একে শাওয়ার নিয়ে সবাই খাওয়ার জন্য প্রস্তুত। কেবল ইমুকে দেখা যাচ্ছে না। হয়তো কোথাও বসে প্লেস্টেশন টেপাটিপি করছে। ঠিক তখনই বাথরুমে পানির ছলা ছল শব্দ শুনে এগিয়ে এসে ভেতরে উঁকি দিতেই দেখি, ইমু জন্মক্ষণের পোশাক পরে বাথটাবে পানির মধ্যে ডুবে আছে আর হাত নেড়ে ফেনা তুলছে। আমাকে দেখেই উঠে দাঁড়িয়ে বলল, এই! মামা, তুই কেন আমাকে দেখছস?

সঙ্গে সঙ্গেই দিগম্বর ইমু দৌড়ে আমার দিকে তেড়ে আসে। দোকানের ভেতর দিয়ে, বাসস্টপ পার হয়ে, ইউনিভার্সেল স্ট্রিটের মাঝামাঝি…। পেছনে পেছনে নিশাত দৌড়ে এসে ইমুকে ধরে ওড়নায় জড়িয়ে কোলে নিলে ভাগনে আর আমার নাগাল পেল না। যদি আজ আমাকে দৌড়ে ধরেই ফেলত, তবে কি হতো কে জানে।
কাছে এসে বললাম, এই নেংটাচোংটা মিয়াসাব। বাথটাবে তো শুধু আমিই দেখেছিলাম। মামাকে দৌড়ায়ে বাইরে এনে এখন রাস্তার এত লোক যে আপনে রে দেখল…।

—না, তুমি আমাকে কেন দেখেছ? আমি অনেক লজ্জা পাইছি।
নিশাত বলল, এখন দেখো ভাই, কী এক পাগলের কারখানায় আমি আছি। মামাকে পেয়ে খুশিতে ওদের মাথা ঠিক নেই।
এভাবেই হাসি আনন্দে চলে এল ঈদ। দেশের কথা খুব বেশি মনে পড়তে লাগল। মনে পড়তে লাগল বাবা–মা, বন্ধু–বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন সবার কথা। অচেনাকেই চেনা ভেবে নিয়ে মেট্রাভিল পাবলিক স্কুলের ছোট্ট মাঠে প্রবাসী বাঙালি ভাইবোনদের নিয়ে ঈদের নামাজ পড়ি। জামাত শেষে বের হওয়ার পথে দেখা গেল বেশ বড় একটা পাত্রে জিলাপি রাখা আছে। আর লোকজন জড়ো হয়ে মনের আনন্দে জিলাপি খাচ্ছে।
জশ বলল, মামা। জিলাপি খাবা।
—না।
—কেন খাবা না। সবাই খাচ্ছে। বাবাও তো খাচ্ছে।
—হ, খাবেই তো। বিনা পয়সায় পেলে লোকে আলকাতরাও খায়।
ইমু বলে, মামা, আলকাতরা কি?
—মামা, আলকাতরার ইংলিশ মিনিং হলো Tar।
—অ, বুঝতে পারছি। ওই যে, যেগুলো দিয়া রাস্তা বানায়।
—জি, মিয়াসাব।
—Tar মানুষে খায় কীভাবে।
আহা, একে তো এই পরবাস। আনন্দহীন ঈদ। এদিকে ভাগিনার সঙ্গে এই আলকাতরা ইস্যুতে বড় হাসি পেল। তবে কী কারণে যেন কথা বলতে ইচ্ছে করছে না আর।

বিকেলবেলায় জশকে নিয়ে এলাম ইস্ট লেকস পার্কে খেলা করতে। ইমু আর সামিয়াকে নিয়ে নিশাত গেল পাশের এক বাঙালি বাসায়। ফেরার পথে বার্বার অ্যাভিনিউ ধরে সামনে যেতেই দেখা গেল একটা বাড়ির দেয়ালের ওপর দিয়ে কমলাগাছ ঝুঁকে আছে রাস্তার ওপর। আর অসংখ্য পাকা কমলায় ছেয়ে আছে ঘাস।
বললাম, এই মিয়া সাব, চলেন, আমরা কমলাগুলো নিয়ে যাই।

সঙ্গে সঙ্গেই জশ উত্তর দিল, না, এটা ডিজঅনেস্টি হবে। এই হাউসের অনারকে না বলে তুমি এগুলো নিতে পারো না।
—তাই তো!

—আর তুমি হাউস অনারকে বলতেও পারো না। বিকজ, বললে এটা হবে বিগ শেইম। তুমি তো শপিং থেকেই কিনতে পারো! এগুলো নিবা কেন?
সেদিন সেই সন্ধ্যার আগে আগে আমার চোখেই যেন নেমে এল নিঝুম সন্ধ্যা। আমার ভাগনে জশ, এই সাত বছরের ছেলেটির চারিত্রিক দৃঢ়তা আর আদর্শের কাছে পদে পদে মার খেয়ে হঠাৎ মনটা যেন কেমন করে ওঠে। অবচেতনের ভেতর থেকে একটা আকুতি বেরিয়ে আসে। আহা, আমার দেশের প্রতিটি মানুষের চারিত্রিক দৃঢ়তা আর আদর্শ যদি আমার এই ভাগনের মতো হতো। মনে হয় আমরা আরও ভালো থাকতাম। তখন হয়তো সসম্মানে সারা পৃথিবী ঘুরে বেড়াতে পারতাম আমার বাংলাদেশের পাসপোর্ট নিয়েই।

লেখক: ইসহাক হাফিজ, অস্ট্রেলিয়া থেকে
ইমেইল: ishaque21@hotmail.com