ছড়িয়ে পড়ছে হাইড্রোজেন বোমার তেজস্ক্রিয়তা?

hydozen-bomaউত্তর কোরিয়া রোববার একটি শক্তিশালি পারমাণবিক পরীক্ষা করে৷ তারা দাবি করেছে, অত্যাধুনিক হাইড্রোজেন বোমা তৈরি করেছে তারা৷ সেটি আন্তর্মহাদেশীয় ব্যালেস্টিক মিসাইল প্রতিরোধ করার ক্ষমতা রাখে৷ চিনের মিনিস্ট্রি অফ এনভায়রনমেন্টাল প্রোটেকশন একটি বিবৃতিতে জানিয়েছে, হেইলোঝিয়াং, ঝিলিন, লিয়াওনিং ও শ্যানডংয়ে যেকটি তেজস্ক্রিয়তা রেকর্ডিংয়ের যন্ত্র আছে, প্রতিটিই সাধারণ লেভেলের রেডিয়েশনই পরিমাপ করেছে৷ রোববার তারা সীমান্ত এলাকাগুলিতে তেজস্ক্রিয়তা পরিমাপ করতে শুরু করে৷ পরীক্ষার ফলাফল জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে বলে জানানো হয়েছে৷ চীনের আর্থকুয়েক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন জানিয়েছে, রবিবার সকাল সাড়ে ১১টা নাগাদ ডেমোক্র্যাটিক পিপলস রিপাবলিক অফ কোরিয়ায় একটি ভূমিকম্প অনুভূত হয়৷ রিখটার স্কেলে এর মাত্রা ছিল ৬.৩৷ এর উপকেন্দ্র ছিল ০ কিলোমিটার৷ বিস্ফোরণের ফলেই এই ভূমিকম্প হতে পারে বলে জানিয়েছে তারা৷

রোববার উত্তর কোরিয়ার সেন্ট্রাল টেলিভিশনে ঘোষণা করা হয়, হাইড্রোজেন বোমার পরীক্ষা সফল হয়েছে৷ এই বোমাটি আন্তর্মহাদেশীয় ব্যালেস্টিক মিসাইল প্রতিরোধ করার ক্ষমতা রাখে৷ তবে চিন ও জাপানের বিদেশমন্ত্রকের তরফে জানানো হয়েছে, সেই বোমা বিস্ফোরণের ফলে কোনও বিশেষ ক্ষতি হয়নি৷ তবে রোববার পর্যন্ত এয়ার সেল্ফ ডিফেন্সের পক্ষ থেকে বাতাস থেকে কোনো নমুনা সংগ্রহ করা হয়নি৷

হাইড্রোজেন বোমায় ধ্বংসক্ষমতা: উত্তর কোরিয়া বলছে তারা রোববার যে পারমাণবিক বোমাটি পরীক্ষা করেছে সেটি হাইড্রোজেন বোমা অর্থাৎ যেটি ধ্বংসক্ষমতার বিচারে সাধারণ পারমাণবিক বোমার চেয়ে কয়েকগুণ শক্তিধর। পশ্চিমা বিশেষজ্ঞরা এখনো নিশ্চিতভাবে বলতে রাজি হচ্ছেন না যে বোমাটি হাইড্রোজেন বোমা। তবে তারা একযোগে স্বীকার করছেন, এখন পর্যন্ত উত্তর কোরিয়া যতগুলো পারমাণবিক বোমার পরীক্ষা চালিয়েছে, এটি ছিল তার মধ্যে সবচেয়ে শক্তিধর।

মাটির নিচে ১০ কিলোমিটার গভীরে এ বিস্ফোরণের পর রিক্টার স্কেলে ৬.৩ মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছে, যা পাশের চীনের বেশ কিছু এলাকাতেও ভূকম্পনের সৃষ্টি করে। বিস্ফোরণের পর ভূকম্পনের মাত্রা বিবেচনা করে অনেক বিশেষজ্ঞ বলছেন, উত্তর কোরিয়ার পরীক্ষা করা বোমাটির শক্তি ছিল ১০০ কিলোটনের মতো। অর্থাৎ ১৯৪৫ সালে জাপানের নাগাসাকি শহরে যুক্তরাষ্ট্রের যে পারমাণবিক বোমা তাৎক্ষণিক ৭০ হাজার মানুষের জীবন নিয়েছিল, উত্তর কোরিয়ার এবারের বোমাটির শক্তি তার চেয়ে পাঁচ গুণ বেশি। যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির অধ্যাপক ভিপিন নারাং বলেছেন, বোমাটি হাইড্রোজেন বোমা হোক আর না হোক, এটি দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো বড় একটি শহর পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন করে ফেলা সম্ভব।

বিশ্বের ভয়াবহতম কিছু পারমাণবিক বিস্ফোরণ: উত্তর কোরিয়ার পরীক্ষা করা বোমাটি যদি হাইড্রোজেন বোমা হয়ও, তার পরেও এখন পর্যন্ত বিশ্বে ভয়াবহ যেসব পারমাণবিক বোমার পরীক্ষা হয়েছে, সেগুলোর সাথে এটির তুলনা কতটা করা যায়? এখন পর্যন্ত পৃথিবীর বুকে মানুষের সৃষ্ট সবচেয়ে বড় বিস্ফোরণ হয়েছিল ১৯৬১ সালে যখন তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন ‘জার বোমবা’ বা ‘বোমার রাজা’ নামে একটি পারমাণবিক বোমা পরীক্ষা করে। ওই হাইড্রোজেন বোমার শক্তি ছিল ৫০ হাজার কিলোটন।

আর্কটিক অঞ্চলে নোভায়া জেমলিয়া নামে দ্বীপপুঞ্জের যে জায়গায় ওই দানবীয় বোমাটি পরীক্ষা করা হয়েছিল, তার ৩৫ মাইলের মধ্যে সব ভবন, স্থাপনা ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। এমনকি শত শত কিলোমিটার দূরেও ভবনে ক্ষতি হয়েছিল। ফিনল্যান্ড, নরওয়ের মতো অনেক দূরের দেশেও বহু বাড়ির জানালার কাচ ভেঙে পড়েছিল। তবে বিশ্বের প্রথমবারের মতো হাইড্রোজেন বোমার পরীক্ষা করে যুক্তরাষ্ট্র ১৯৫২ সালে, প্রশান্ত মহাসাগরের মার্শাল দ্বীপে। সেটির শক্তি ছিল ১০ হাজার কিলোটন।

৫০ কিলোমিটার দূরে একটি জাহাজে বসে সেই পরীক্ষা পর্যবেক্ষণ করেছিলেন মার্কিন পদার্থ বিজ্ঞানী হ্যারল্ড অ্যাগনিউ। তিনি পরে বলেছিলেন, ‘অত দূরে বসে যে তাপ সে দিন বোধ করেছিলাম তা জীবনেও ভুলব না। ক্রমাগত তাপ আসছিল। ভীতিকর এক অভিজ্ঞতা ছিল সেটি।’

পরীক্ষার পর ধোঁয়ার কুণ্ডুলি ৫০ কিলোমিটার উপরে উঠে গিয়েছিল, ছড়িয়ে পড়েছিল ১০০ কিলোমিটার পর্যন্ত। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে শক্তিশালী পারমাণবিক পরীক্ষা ছিল ১৯৫৪ সালে ওই মার্শাল দ্বীপেরই বিকিনি অ্যাটল এলাকায়। শক্তি ছিল ১৫ হাজার কিলোটন। পরীক্ষার পর ১১ হাজার কিলোমিটার পর্যন্ত তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়েছিল। শত শত বহু মানুষকে নিরাপদে সরিয়ে নেয়া হয়েছিল, যারা আর কখনই বাড়িতে ফিরতে পারেনি।