
ফাইল ছবি
বাংলা সাহিত্য, সংগীত ও সাম্যের চেতনায় যিনি আজও বাঙালির অনুপ্রেরণার প্রতীক, সেই জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২৭তম জন্মবার্ষিকী আজ। বিদ্রোহ, মানবতা ও অসাম্প্রদায়িকতার এই মহান কবিকে স্মরণ করতে রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে ময়মনসিংহের ত্রিশাল, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, মানিকগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে নানা আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, কবিতা আবৃত্তি, নজরুলসংগীত পরিবেশনা ও স্মরণানুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে।
এবারের জন্মবার্ষিকীকে ঘিরে সরকারিভাবে ব্যাপক কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে, যার অংশ হিসেবে প্রধানমন্ত্রী আগামী এক বছরকে ‘নজরুল বর্ষ’ হিসেবে ঘোষণা করেছেন।
জাতীয় কবি কাজী জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে আজ রোববার (২৪ মে) রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে নানা স্মরণানুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। ময়মনসিংহের ত্রিশালে কবির স্মৃতিবিজড়িত জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় ও নজরুল একাডেমি প্রাঙ্গণে দিনব্যাপী সাংস্কৃতিক উৎসবের মধ্য দিয়ে জাতীয় পর্যায়ের মূল অনুষ্ঠানটি উদযাপিত হচ্ছে, যেখানে গতকাল শনিবার (২৩ মে) উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আগামী এক বছরকে ‘নজরুল বর্ষ’ হিসেবে ঘোষণা করেছেন।
এছাড়া রাজধানীর বাংলা একাডেমি, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি ও নজরুল ইনস্টিটিউটসহ মানিকগঞ্জের তেওতা এবং কক্সবাজারসহ দেশের বিভিন্ন জেলা প্রশাসন ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে সেমিনার, নজরুল পুরস্কার প্রদান, পুস্তক প্রদর্শনী, স্মৃতি চারণ এবং বর্ণাঢ্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে।
১৮৯৯ সালের ২৪ মে পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার আসানসোল মহকুমার চুরুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন কাজী নজরুল ইসলাম। বাংলা সাহিত্য ও সংগীতে আধুনিকতার অন্যতম প্রধান পথিকৃৎ হিসেবে বিবেচনা করা হয় তাঁকে। কবিতা, গান, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ ও সাংবাদিকতাসহ সাহিত্যের প্রতিটি শাখায় তিনি রেখে গেছেন তাঁর প্রতিভার অনন্য স্বাক্ষর।
কবির শৈশব, কৈশোর ও তারুণ্যের জীবনের পরতে পরতে জড়িয়ে ছিল চরম অভাব ও অবিরাম সংগ্রাম। জীবিকার তাগিদে তাঁকে রুটি বানানোর দোকান থেকে শুরু করে লেটোর দলেও যোগ দিতে হয়েছিল। পরবর্তীতে ১৯১৭ সালে তিনি সেনাবাহিনীতে যোগ দেন এবং ৪৯ নম্বর বাঙালি পল্টনের সৈনিক হিসেবে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অংশ নেন।
সেনাবাহিনীতে কর্মরত থাকা অবস্থাতেই করাচি সেনানিবাসে বসে নজরুল তাঁর সাহিত্যচর্চা পুরোদমে শুরু করেন। ১৯১৯ সালের মে মাসে ‘সওগাত’ পত্রিকায় তাঁর প্রথম গদ্য রচনা “বাউণ্ডুলের আত্মকাহিনী” প্রকাশিত হয়। মূলত এখান থেকেই তাঁর আনুষ্ঠানিক সাহিত্যিক জীবনের সূত্রপাত ঘটে। করাচিতে বসেই তিনি “হেনা”, “ব্যথার দান”, “মেহের নেগার” ও “ঘুমের ঘোরে”-র মতো বেশ কিছু বিখ্যাত গল্প রচনা করেন।
১৯২১ সালের ডিসেম্বর মাসে কুমিল্লা থেকে কলকাতা ফেরার পথে নজরুল বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে দুটি বৈপ্লবিক কর্মের জন্ম দেন। এর একটি হলো কালজয়ী ‘বিদ্রোহী’ কবিতা এবং অন্যটি ‘ভাঙ্গার গান’ সঙ্গীত। এই সৃষ্টি দুটি বাংলা কবিতা ও গানের চেনা ধারাকে সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছিল। বিশেষ করে ‘বিদ্রোহী’ কবিতার অভাবনীয় জনপ্রিয়তার কারণে তিনি ‘বিদ্রোহী কবি’ হিসেবে দেশজুড়ে পরিচিতি লাভ করেন।
১৯২২ সালে নজরুলের প্রথম এবং সবচেয়ে বিখ্যাত কবিতা-সংকলন ‘অগ্নিবীণা’ প্রকাশিত হয়। এই কাব্যগ্রন্থটি প্রকাশের সাথে সাথেই এর প্রথম সংস্করণ শেষ হয়ে যায় এবং এটি বাংলা কাব্যের জগতে এক অভূতপূর্ব পালাবদল নিয়ে আসে। এই গ্রন্থের “প্রলয়োল্লাস”, “আগমনী”, “খেয়াপারের তরণী” ও “কামাল পাশা”-র মতো সাড়া জাগানো কবিতাগুলো বাংলা কবিতার মোড় চিরতরে ঘুরিয়ে দেয়। একই বছর তাঁর গল্প সংকলন ‘ব্যথার দান’ ও প্রবন্ধ-সংকলন ‘যুগবাণী’ প্রকাশিত হয়।
কাজী নজরুল ইসলাম কেবল দ্রোহের কবিই ছিলেন না, তিনি ছিলেন একাধারে সুরস্রষ্টা ও সংগীতজ্ঞ। তিনি প্রায় চার হাজার গান রচনা ও সুরারোপের মাধ্যমে বাংলা সংগীত জগৎকে এক বিশাল সমৃদ্ধি এনে দেন। পাশাপাশি, তাঁর রচিত “খুকী ও কাঠবিড়ালি”, “লিচু-চোর” কিংবা “খাঁদু-দাদু”-র মতো শিশুতোষ কবিতাগুলো বাংলা শিশুসাহিত্যে অত্যন্ত নান্দনিক ও জনপ্রিয় সংযোজন হিসেবে টিকে আছে।
স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে শেখ মুজিবুর রহমানের উদ্যোগে কবিকে সপরিবারে স্বাধীন বাংলাদেশে আনা হয় এবং তাঁকে বাংলাদেশের জাতীয় কবির মর্যাদা দেওয়া হয়। দীর্ঘদিনের অসুস্থতা শেষে ১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট ঢাকায় এই মহান কবি শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে তাঁকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত করা হয়।
সাহিত্য বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান বিশ্বে যখন বৈষম্য, জাতিগত বিদ্বেষ ও ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা মারাত্মক উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, তখন কাজী নজরুল ইসলামের সাম্য, মানবতা ও অসাম্প্রদায়িকতার দর্শন নতুন করে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। তাঁর জীবন ও সৃষ্টি আজও কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ে অন্যায় ও শোষণের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রধান প্রেরণার উৎস হয়ে আছে।












































