দক্ষিণ তিব্বতের প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিশ্বের বৃহত্তম জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণকে পুরোপুরি ‘চীনের অভ্যন্তরীণ বিষয়’ বলে দাবি করেছে বেইজিং। বুধবার (১৭ জুলাই) এক নিয়মিত ব্রিফিংয়ে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুও জিয়াকুন এ মন্তব্য করেন বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা আনাদোলু।
প্রকল্পটি নির্মিত হচ্ছে ইয়ারলুং ঝাংবো নদীর উপত্যকায়, যা ভারতের অংশে ব্রহ্মপুত্র এবং বাংলাদেশে প্রবেশ করে যমুনা নামে পরিচিত। ভাটির দেশ ভারত ও বাংলাদেশের উদ্বেগ প্রসঙ্গে গুও জিয়াকুন বলেন, “এই প্রকল্প নিচু এলাকার কোনো দেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে না। প্রকল্পটি দুর্যোগ প্রতিরোধ, নদীর ব্যবস্থাপনা এবং পানি ভাগাভাগিতে একটি ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।”
চীনা মুখপাত্র জানান, এই প্রকল্প নিয়ে তারা ভারত ও বাংলাদেশের সঙ্গে প্রয়োজনীয় যোগাযোগ করেছে এবং পানি সম্পর্কিত তথ্য বিনিময় ও বন্যা ব্যবস্থাপনায় পারস্পরিক সহযোগিতা অব্যাহত রয়েছে। গুও বলেন, “চীন আন্তঃসীমান্ত নদীগুলোর ব্যবস্থাপনায় বরাবরই দায়িত্বশীল আচরণ করেছে এবং এই প্রকল্পটিও আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখেই বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।”
প্রায় ১.২ ট্রিলিয়ন ইউয়ান (১৬৭.৮ বিলিয়ন ডলার) ব্যয়ে নির্মিতব্য প্রকল্পটি পাঁচ ধাপে বিভক্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র নিয়ে গঠিত হবে। প্রকল্পটি সম্পন্ন হলে বছরে ৩০০ বিলিয়ন কিলোওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে, যা বর্তমান বিশ্বের বৃহত্তম থ্রি গর্জেস ড্যামের তিন গুণ ক্ষমতাসম্পন্ন।
চীন এই প্রকল্পকে তাদের জাতীয় পরিবেশগত লক্ষ্য অর্জনের অংশ হিসেবে বিবেচনা করছে। দেশটির লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে কার্বন নিঃসরণ সর্বোচ্চ সীমায় নিয়ে যাওয়া এবং ২০৬০ সালের মধ্যে কার্বন নিরপেক্ষতা অর্জন।
চীনের দাবি, প্রকল্পটি পরিবেশগতভাবে সংবেদনশীল অঞ্চল এড়িয়ে নির্মাণ করা হচ্ছে এবং প্রকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তবে ভাটির দেশগুলো প্রকল্পের স্বচ্ছতা নিয়ে উদ্বিগ্ন।
ভারতের অরুণাচল প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী এক বিবৃতিতে আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, “এই বাঁধের কারণে রাজ্যের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত নদীর ৮০ শতাংশ পানি শুকিয়ে যেতে পারে।” একইসঙ্গে, কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূবিজ্ঞানী অধ্যাপক মাইকেল স্টেকলার সতর্ক করেছেন, “এই ধরনের বাঁধ শুধু পানিপ্রবাহ নয়, নদীর মাধ্যমে কৃষিকাজে ব্যবহৃত পুষ্টিসমৃদ্ধ পলিমাটির সরবরাহও বাধাগ্রস্ত করবে।”
বেইজিং প্রকল্পের ব্যয় ও সামগ্রিক লক্ষ্য জানালেও এখনও প্রকল্পের সময়সীমা, প্রযুক্তি, এবং বাস্তবায়নের রূপরেখা বিস্তারিতভাবে প্রকাশ করেনি। এই স্বচ্ছতার ঘাটতি ভারত ও বাংলাদেশের জন্য নিরাপত্তা ও পরিবেশগত ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলছে বলে পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন।