
বাংলাদেশি কৃষিপণ্য বিশ্ববাজারে নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। সদ্য সমাপ্ত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশ থেকে প্রথমবারের মতো ১ বিলিয়ন বা ১০০ কোটি মার্কিন ডলারের কৃষিজাত পণ্য রপ্তানি হয়েছে। বর্তমানে বিশ্বের ১৪৫টি দেশে সুগন্ধি চাল, ফল, সবজি ও মাছ-মাংসের পাশাপাশি বিস্কুট, চানাচুর, নুডলস ও মসলার মতো প্রায় ১৭২ ধরনের পণ্য রপ্তানি হচ্ছে।
তবে এই অপার সম্ভাবনার মাঝেই বড় দুশ্চিন্তা হয়ে দাঁড়িয়েছে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) কাতার থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ। এলডিসি পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে শুল্কমুক্ত সুবিধা হারানো এবং নগদ প্রণোদনা বন্ধ হওয়ার আশঙ্কায় রপ্তানি ধরে রাখা নিয়ে উদ্বিগ্ন উদ্যোক্তারা।
রপ্তানির বর্তমান চিত্র ও প্রধান পণ্যসমূহ বাংলাদেশি কৃষিপণ্যের বড় বাজার এখন সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, ভারত, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র। এই পাঁচটি দেশেই মোট রপ্তানির প্রায় ৬০ শতাংশ পণ্য যায়। গত অর্থবছরে প্রক্রিয়াজাত পণ্য রপ্তানি হয়েছে প্রায় ৪০০ মিলিয়ন ডলারের। রপ্তানি হওয়া ১৭২টি পণ্যের মধ্যে শীর্ষে রয়েছে বিস্কুট, নুডলস, ফলের জুস, পরোটা ও চানাচুর। শুধু বিস্কুট রপ্তানি থেকেই এসেছে সাড়ে ৮৮ মিলিয়ন ডলার। এই খাতের শীর্ষ রপ্তানিকারক প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ গত বছর সাড়ে ৩১ কোটি ডলারের পণ্য বিদেশে পাঠিয়েছে, যার মধ্যে প্রধান ছিল মসলা।
এলডিসি উত্তরণে যে চ্যালেঞ্জের মুখে ব্যবসায়ীরা বর্তমানে সরকার কৃষিপণ্য রপ্তানিতে ২০ শতাংশ নগদ প্রণোদনা প্রদান করে। এছাড়া ৫ থেকে ১০ বছরের করপোরেট কর ছাড়, বিদ্যুৎ বিলে ২০ শতাংশ ছাড় এবং রপ্তানি আয়ের ওপর ৫০ শতাংশ কর ছাড়ের মতো নানা সুবিধা বিদ্যমান। কিন্তু এলডিসি থেকে উত্তরণের পর বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) নিয়ম অনুযায়ী এসব সরাসরি আর্থিক সহায়তা বন্ধ হয়ে যাবে।
ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা, প্রণোদনা ও শুল্ক সুবিধা উঠে গেলে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হবে। বাপা (BAPA)-এর সাধারণ সম্পাদক ইকতাদুল হক জানান, শুল্ক সুবিধা চলে গেলে ছোট প্রতিষ্ঠানগুলোর ঝরে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে। আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোতে বাংলাদেশি পণ্যে যেখানে ২০-৩০ শতাংশ শুল্ক দিতে হয়, সেখানে ভারত ও পাকিস্তান বিনা শুল্কে পণ্য রপ্তানি করছে। এই বৈষম্য দূর করতে সরকারের কূটনৈতিক তৎপরতা প্রয়োজন।
বিকল্প সহায়তার দাবি ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা এলডিসি পরবর্তী পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের চেয়ারম্যান আহসান খান চৌধুরী উৎপাদন ব্যয় কমানোর ওপর জোর দিয়েছেন। উদ্যোক্তারা নগদ প্রণোদনার বিকল্প হিসেবে বন্দর সুবিধার উন্নয়ন, ঋণের সুদহার হ্রাস, জাহাজ ভাড়া কমানো এবং গ্যাস-বিদ্যুৎ বিলে বিশেষ ছাড়ের দাবি জানিয়েছেন।
বিডার তথ্যমতে, দেশে প্রক্রিয়াজাত পণ্যের বাজার বর্তমানে ৩.২ বিলিয়ন ডলারের হলেও ২০৩০ সাল নাগাদ তা ৫.৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে। বিশ্বে ১৩ ট্রিলিয়ন ডলারের বিশাল প্রক্রিয়াজাত খাবারের বাজারে বাংলাদেশের অংশ বাড়ানোর সুযোগ অনেক। বিশেষ করে ২.৪ ট্রিলিয়ন ডলারের হালাল খাবারের বাজারে শক্তিশালী অবস্থান গড়া সম্ভব।
বাংলাদেশের কৃষিপণ্য রপ্তানি চিত্র ও চ্যালেঞ্জ
১. রপ্তানির মাইলফলক (২০২৪-২৫ অর্থবছর)
২. শীর্ষ ৫ রপ্তানি পণ্য (মোট রপ্তানির ৪৫%)
৩. প্রধান ৫ রপ্তানি বাজার (মোট রপ্তানির ৬০%)
৪. এলডিসি উত্তরণ: যে সুবিধাগুলো হারানোর ভয়
৫. ২০৩০ সালের লক্ষ্যমাত্রা
৬. উদ্যোক্তাদের দাবি (বিকল্প সহায়তা)
সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমের মতে, ছোট উদ্যোক্তাদের বিদেশি মেলায় সুযোগ দেওয়া এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে পারলে পণ্যের মান ও রপ্তানি দুই-ই বাড়বে।
সরকারের প্রস্তুতি রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) জানিয়েছে, তারা বিকল্প সহায়তা নিয়ে কাজ করছে। সরাসরি নগদ প্রণোদনার বদলে পণ্যের মানোন্নয়নে গবেষণা, অবকাঠামো উন্নয়ন, কার্গো সুবিধা বৃদ্ধি এবং কুল চেইন ভ্যান নিশ্চিত করার মতো দীর্ঘমেয়াদী সুবিধা দেওয়ার পরিকল্পনা চলছে। রপ্তানিকারকদের জন্য কর কাঠামো পুনর্বিন্যাস করার বিষয়টিতেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।