
বেগম খালেদা জিয়া
পুরো একটা কালের পুরোধা প্রতিনিধি অন্তিম যাত্রায়, নিখুঁত পরিবেশে উত্থান না হলেও জনতার ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে নিখুঁতভাবে পাশ করে উত্তীর্ণ হয়ে পরপারে পাড়ি জমিয়েছেন ঠিকই, শুধু রেখে গেলেন এক রাশ শূন্যতা আর অনিশ্চয়তার দোলাচলে যখনই তাঁকে দরকার ছিল খুব, তিনি আলোর দিশা হয়ে ঠিক যেমন অন্ধকারে বন্ধুর পথ দেশমাতৃকার জনগণকে সাথে নিয়ে হেঁটে গিয়েছেন বারংবার, জুলাইয়ের পর এবার যেন শেষবারের মতো আলোকবর্তিকা হয়ে দেশের মানুষকে দিশা দেখিয়ে নিজেই হারিয়ে গেলেন। তিনি হারিয়ে গেলেও বাংলাদেশে ক্ষমতা- আধিপত্যের লড়াই- বহিঃশত্রুর রক্তচক্ষু খুব কমই হারায়। রূপ বদলায়, কিংবা নীরব হয়ে পড়ে কিংবা দমকা হাওয়ার মতো আছড়ে পড়ে।
এই নীরবতার রাজনীতিকে যাঁরা সবচেয়ে গভীরভাবে ধারণ করেন, তাঁদের মধ্যে বেগম খালেদা জিয়া অন্যতম। বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী, বিশ্বের দ্বিতীয় মুসলিম নারী প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া হয়তো কোনো নিখুঁত চরিত্র নন।
তিনি একটি সময়ের প্রতিনিধি- কালের পরিচায়ক। গণতন্ত্রের আলোকবর্তিকা। একটি দেশ, মানুষের সেবা, নির্যাতনের স্মৃতি, এবং দীর্ঘ এক রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা এক নারী।
১৯৪৬ সালে জন্ম নেওয়া এক নক্ষত্র,এক সময় দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে প্রভাবশালী এক নেতৃত্ব, আজ তিনি নীরব- চির নীরব তবে সীমাবদ্ধ নন। তবু তাঁর অনুপস্থিতি রাজনৈতিকভাবে গভীর অর্থ বহন করে। এমন এক দেশে, যেখানে নেতৃত্ব দীর্ঘদিন ধরে ছিল উচ্চকণ্ঠ ও মুখোমুখি সংঘর্ষনির্ভর, খালেদা জিয়া সূক্ষ্ম এক বাস্তবতাকে সামনে রেখে ঠিক সেখানেই আনলেন পরিবর্তন। প্রতিহিংসাপরায়ণ পরাবাস্তবতাকে হারিয়ে খালেদা জিয়া হয়ে উঠলেন আপোসহীন বাংলাদেশপন্থী, বাংলাদেশের গণতন্ত্রের প্রতীক।
এ এক দুর্দমনীয় উত্থানের কল্পগাঁথা। এক সেনানায়কের স্ত্রী-যার জীবনের কেন্দ্র ছিল সংসার, সন্তান, ব্যক্তিগত পরিসর- হঠাৎই দেশের এক মহান অভিভাবক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের প্রয়াণে হাল ধরতে বাধ্য হন পুরো দেশের , একটা রাজনৈতিক দলের। স্বার্থান্বেষী ষড়যন্ত্রকারীদের বাংলাদেশকে রাজনৈতিকভাবে অভিভাবকশূন্য করে রাখবার পরিকল্পনাকে ভেস্তে দিতেই মহিয়সী এ নারী হাল ধরেন দেশের গণতন্ত্রের আন্দোলনের।
উচ্চাকাঙ্ক্ষা থেকে রাজনীতিতে আসেননি খালেদা জিয়া। তিনি এসেছিলেন শোক থেকে।
১৯৮১ সালের আগে তিনি মূলত অরাজনৈতিক ছিলেন- রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের স্ত্রী হিসেবেই পরিচিত ছিলেন বেশি। তাঁর হত্যাকাণ্ড খালেদা জিয়াকে এমন এক রাজনৈতিক শূন্যতার মুখোমুখি দাঁড় করায়, যেখানে ব্যক্তিগত ক্ষতি ও জাতীয় অস্থিরতা একে অপরের সঙ্গে মিশে যায়। এরপর যা ঘটেছিল, তা কেবল একজন নেত্রীর উত্থান নয়; বরং একটি প্রতীকের নির্মাণ- যা গড়ে উঠেছিলো বৈধতা এবং সামরিক শাসনের অসমাপ্ত ট্রমা থেকে। ক্ষমতার উত্তরাধিকারী না হয়ে হয়েছিলেন জনগণের ভালোবাসা পাবার একচ্ছত্র অধিকারী। ফলতই, তাঁর পক্ষেই সম্ভব হয়েছিলো ক্ষমতার ভাষা নির্মাণের। এবং সে ভাষার নির্মাণ করেছিলেন তিনি নিজেই ।
রূপান্তরহীন ক্ষমতা
তিনবার বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। সংসদীয় গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা- এই রাজনৈতিক দাবিগুলো তাঁর শাসনামলেই প্রাতিষ্ঠানিক ভাষা পেয়েছে। কিন্তু গণতন্ত্রের মর্যাদা সমুন্নত রাখতে তাঁকে বারবার ষড়যন্ত্রকারীদের সঙ্গে লড়াই করতে হয়েছে, দুইবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে খালেদা জিয়া প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচনী রাজনীতির একটি অধ্যায়কে দৃশ্যমান করেছিলেন। তাঁর সরকার গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার উপস্থিতি নিশ্চিত করেছিল, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকেও গভীরভাবে শক্তিশালী করতে চেয়েছিলো।
তাঁর রাজনীতি ছিল টিকে থাকার রাজনীতি- দেশকে গঠনের রাজনীতি। কারণ তিনি এমন এক রাষ্ট্রে ক্ষমতায় এসেছেন,
যেখানে নারী নেতৃত্বকে মেনে নেওয়া হয়—কিন্তু নিয়ন্ত্রণ ছাড়া নয়।
তিনি ছিলেন রাষ্ট্রপ্রধান, তবু তাঁকে প্রতিনিয়ত প্রমাণ করতে হয়েছে—তিনি “যোগ্য”।
পুরুষতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির ভেতর দাঁড়িয়ে খালেদা জিয়া নারীর ক্ষমতাকে স্বাভাবিক করে তুলেছিলেন- ভাষণের মাধ্যমে নয়, বরং ধারাবাহিক উপস্থিতির মাধ্যমে। তিনি নাটকীয়তা ছাড়াই শাসন করেছেন; জনসম্মুখের জাঁকজমকে অস্বস্তি বোধ করলেও কখনো পিছু হটেননি।
খালেদা জিয়ার শেষ সময়ের নীরবতাকে দূরভিসন্ধিমূলক আইনি রায়, দীর্ঘমেয়াদী নির্যাতন, অসুস্থতা এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রান্তিককরণের ফল হিসেবেই বিবেচনা করে সবাই। কিন্তু রাজনীতিতে নীরবতার অর্থই সব সময় নিষ্ক্রিয় নয়।
খালেদা জিয়া এমনই এক ব্যক্তিত্ব, যার নীরবতাও গভীর ও কোলাহলপূর্ণ। জনগণের কন্ঠের সমুচ্চারিত কোরাস।
তাঁর অনুপস্থিতির শূন্যতা অপূরণীয়ই বটে। তবে তাঁর প্রস্থান গৌরবময়। তাঁর দলে নেতৃত্ব খণ্ডিত; জাতীয় কল্পনায় তাঁর অবস্থান অনির্ধারিত—না পুরোপুরি মুছে গেছে, না পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
এই অর্থে, খালেদা জিয়া হয়ে উঠেছেন অসমাপ্ত কিছুর স্মারক: এমন এক গণতান্ত্রিক প্রতিশ্রুতি, যা পূর্ণতা পায়নি; এমন এক রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব, যা তার প্রয়োজনীয়তা হারিয়েও টিকে আছে; এমন এক রাষ্ট্র, যা স্থায়ী সংঘাতপূর্ণ ভূরাজনৈতিক দ্বন্দ্বে আটকে রয়েছে।
তাই তো তিনি বলেছিলেন- আমরা বন্ধু সবার। কিন্তু প্রভুত্ব মানবো না কারো।
সুকান্তের লাইনের মতোই ছিলেন বেগম খালেদা জিয়া-
“সাবাশ, বাংলাদেশ, এ পৃথিবী অবাক তাকিয়ে রয়-
জ্বলে-পুড়ে-মরে ছারখার—তবু মাথা নোয়াবার নয়।”
বেগম খালেদা জিয়াই ছিলেন আসলে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের মুখচ্ছবি।
রাজনৈতিক ইতিহাস সাধারণত দৃশ্যমানতাকে উদযাপন করে—মিছিল, ভাষণ, ঘোষণা। খালেদা জিয়ার পরবর্তী জীবন এই ধারণাকেই প্রশ্ন করে। তাঁর পিছু হটা একটি ভিন্ন প্রশ্ন তোলে: ক্ষমতা যদি আর নিজেকে প্রদর্শন করতে না চায়, তখন কী ঘটে?
একটি ব্যবস্থায়, যা নিরবচ্ছিন্ন সক্রিয়তা, শব্দ ও নিয়ন্ত্রণের ওপর দাঁড়িয়ে আছে, সেখানে তাঁর স্থিরতা অস্বস্তিকর। এটি এমন এক রাজনীতির ভঙ্গুরতা উন্মোচন করে, যা কেবল উপস্থিতি ও উচ্চকণ্ঠার ওপর নির্ভরশীল।
তিনি আর প্রতিদ্বন্দ্বী নন, কিন্তু এখনো একটি মানদণ্ড। খালেদা জিয়ার রাজনীতিতে প্রবেশ কোনো পরিকল্পিত ক্যারিয়ার পথ ছিল না। এটি ছিল ইতিহাসের এক নির্মম বাঁক। একজন সেনানায়কের স্ত্রী হিসেবে তাঁর জীবন ছিল মূলত গৃহকেন্দ্রিক, রাষ্ট্রকেন্দ্রিক নয়। কিন্তু স্বামী হত্যার পর তিনি বুঝলেন-এই রাষ্ট্রে নীরব থাকা মানেই মুছে যাওয়া।
এই জায়গাটিই তাঁকে আলাদা করে। তিনি রাজনীতিতে এসেছিলেন ক্ষমতার লোভে নয়, বরং শূন্যতার ভেতর দাঁড়িয়ে টিকে থাকার তাগিদে। তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের ক্ষত রাজনীতিকে করেছে কঠোর, আর তাঁর রাজনীতি ব্যক্তিগত জীবনকে করেছে নিঃসঙ্গ।
ইতিহাস সম্ভবত তাঁর বিষয়ে আর কোনো সরল রায় দেবে না। শব্দগুলো তাঁর নামের পাশে বসেছে। অনেকেই ভেবেছে, এই নীরবতা মানেই রাজনৈতিক অবসান।
কিন্তু নীরবতাও একটি ভাষা।
যখন একজন রাজনীতিক কথা বলা বন্ধ করেন,
কিন্তু তাঁর নাম উচ্চারণ বন্ধ হয় না-
তখন সেই নীরবতা হয়ে ওঠে রাজনৈতিক।
খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতিই তাঁর সবচেয়ে শক্তিশালী উপস্থিতি। এই নীরবতা কোনো পরাজয়ের স্বীকৃতি নয়। বরং এটি এক ধরনের দার্শনিক প্রতিবাদ—যেখানে অনুপস্থিতিই বক্তব্য। তিনি আর কথা বলেন না, কিন্তু তাঁর অনুপস্থিতি প্রতিটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের পাশে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন তোলে: ক্ষমতা কি মানুষকে চিরকাল নিশ্চুপ করে রাখতে পারে? তাঁর জীবন প্রমাণ করে—বাংলাদেশে রাজনীতি শুধু ক্ষমতার লড়াই নয়, এটি স্মৃতি ও বিস্মরণের যুদ্ধ। আর খালেদা জিয়া সেই স্মৃতি, যাকে মুছে ফেলতে রাষ্ট্র বারবার ব্যর্থ হয়েছে।
খালেদা জিয়া আজ আর মিছিলের সামনে নেই, মাইক্রোফোনের পেছনেও নেই। কিন্তু রাজনীতিতে এমন কিছু মানুষ থাকে, যাঁরা কথা না বলেও পুরো সময়টাকে সংজ্ঞায়িত করেন। তিনি তেমনই একজন।
বাংলাদেশের রাজনীতি হয়তো সামনে এগোবে, নতুন মুখ আসবে, নতুন ভাষা তৈরি হবে—কিন্তু খালেদা জিয়ার নীরবতা থেকে মুক্তি পেতে রাষ্ট্রকে এখনো অনেক প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে।
কারণ কিছু মানুষ ইতিহাসে শব্দ হয়ে নয়—নীরবতা হয়ে থেকে যান।
ব্যক্তিগত জীবন: রাজনীতির বাইরের এক মানুষ
তাঁর ব্যক্তিগত জীবন ছিল সংযত, প্রায় নির্জন। তিনি রাজনীতিকে কখনো আবেগের ভাষায় প্রকাশ করেননি। শোক, ক্ষতি, অসুস্থতা-সবই তিনি বহন করেছেন নীরবে।
এই নীরবতা আর কিছু হোক না হোক, তাঁকে টিকিয়ে রেখেছে।
কারণ রাজনীতিতে কখনো কখনো শব্দ নয়, সহনশীলতাই সবচেয়ে বড় অস্ত্র।
উত্তরাধিকার: অসম্পূর্ণ, কিন্তু অস্বীকারযোগ্য নয়
খালেদা জিয়ার রাজনীতি সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়।
তাঁর শাসনামলে দ্বিধা থাকতে পারে, টুকটাক ব্যর্থতাও থাকতে পারে।
কিন্তু ইতিহাসের প্রশ্নটা অন্য জায়গায়—
তিনি না থাকলে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিরোধী কণ্ঠের কাঠামো কি এমন থাকতো?
তিনি স্মরণীয় থাকবেন একই সঙ্গে গণতন্ত্রের প্রতীক ও সম্ভাবনা হিসেবে; এমন এক নারী হিসেবে, যিনি বাধা ভেঙেছেন, যাঁর সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক বক্তব্য হয়তো শেষ পর্যন্ত তাঁর এই চির নীরবতাই। জনগণের ভাষাই তাঁর ভাষা হয়ে প্রস্ফুটিত হবে- চিরভাস্মর রবে, যেন তিনিই বাংলাদেশ। বাংলাদেশের রাজনীতি শব্দে নয়, নীরবতায় সবচেয়ে বেশি কথা বলে।
আর সেই নীরবতার দীর্ঘতম ছায়া-বেগম খালেদা জিয়া।
বাংলাদেশে, যেখানে রাজনৈতিক স্মৃতি তীব্রভাবে বিতর্কিত, খালেদা জিয়া অবস্থান করছেন এক অস্পষ্ট সীমারেখায়—ক্ষমতা ও অনুপস্থিতির মাঝখানে, ইতিহাস ও বিস্মরণের মাঝখানে।
আর সম্ভবত এই অস্পষ্টতাই তাঁর শেষ উত্তরাধিকার। তিনিই বাংলাদেশের শেষ বাণী- যার অনুপস্থিতিও হবে জাজ্বল্যমান প্রদীপের ন্যায়- শিখা চিরন্তনের।
তিনি এমন একজন নারী, যাঁর জীবন ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি থেকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা পর্যন্ত বিস্তৃত; যাঁর কণ্ঠ একসময় জনসভা কাঁপিয়েছে, আবার যাঁর নীরবতা রাষ্ট্রের বিবেককে প্রশ্ন করেছে। খালেদা জিয়া কেবল একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী নন—তিনি একটি রাজনৈতিক সময়ের প্রতীক, একটি ধারার স্মৃতি, এবং একটি প্রশ্নচিহ্ন।