
বেগম খালেদা জিয়া
অবিস্মরণীয়, অতুলনীয়, অভূতপূর্ব। এই শব্দগুলোও যেন কম হয়ে যায়। শেষ বিদায়েও ইতিহাস রচনা করে গেলেন দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী, আপসহীন নেত্রী, বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। জনসমুদ্র শব্দটিও যেন তার জানাজার বিশালতার কাছে হার মেনেছে। যেদিকে চোখ যায় সেদিকেই কেবল চোখে পড়েছে মানুষের মাথা। শোনা গেছে লাখো কণ্ঠের কান্নাজড়িত দোয়া। এ এক নজীরবিহীন অভূতপূর্ব দৃশ্য।
দেশের ইতিহাসে এমন জানাজা এর আগে দেখেনি কেউ। রাজধানীর মানিক মিয়া এভিনিউ ছাপিয়ে জনস্রোত আছড়ে পড়েছে চারপাশের কয়েক কিলোমিটার জুড়ে। ক্যামেরার লেন্সও যেন সেই বিশালতা ধরতে ব্যর্থ।
দলমত-নির্বিশেষে শোকার্ত মানুষের এই ঢল প্রমাণ করল, রাজনীতির ‘আপসহীন নেত্রী’ বেগম খালেদা জিয়া দেশের মানুষের হৃদয়ের কতটা গভীরে স্থান করে নিয়েছিলেন। মানুষের মনে কতটা শক্তিশালী তাঁর অবস্থান।
বুধবার (৩১ ডিসেম্বর) বেলা ৩টায় যখন জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় বেগম জিয়ার জানাজা শুরু হয়, তখন মানিক মিয়া এভিনিউয়ের আশেপাশের সড়কগুলো কার্যত স্থবির হয়ে যায়। জানাজাস্থল মানিক মিয়া এভিনিউ ছাপিয়ে সেই ভিড় ছড়িয়ে পড়ে উত্তরে জাহাঙ্গীর গেট, পশ্চিমে মিরপুর রোড এবং পূর্বে ফার্মগেট পেরিয়ে কারওয়ান বাজার, বাংলামোটর ও মগবাজার পর্যন্ত। মাইকের আওয়াজ যতদূর পৌঁছায়, মানুষ ততদূরেই রাস্তায় কাতারবন্দী হয়ে দাঁড়িয়েছেন। অনেকের চোখের কোণে জল, কেউবা হাত তুলে নীরবে দোয়া করছেন, কেউ করছে বিলাপ-আহাজারি।
বেগম খালেদা জিয়া জীবনভর অনেক ইতিহাসের সৃষ্টি করেছেন। গৃহবধূ থেকে রাজনীতিতে এসে ৯০-এর স্বৈরাচার এরশাদবিরোধী আন্দোলনে হয়ে ওঠেন ঐতিহাসিক চরিত্র। ৯১-এ নির্বাচনে জিতে গড়লেন ইতিহাস, হলেন দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী। ক্ষমতায় এসে দেশের নারী শিক্ষার বিস্তারে নিলেন যুগান্তকারী পদক্ষেপ। তার সরকার দশম শ্রেণি পর্যন্ত মেয়েদের অবৈতনিক শিক্ষা ও উপবৃত্তি চালু কের, যা দেশের নারী ক্ষমতায়নে বড় ভূমিকা রাখে। এরপর ১৯৯৬ সালে ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে সংবিধানের অংশ করেন তিনি ক্ষমতা ছাড়ার বিরল রাজনৈতিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।
বেগম খালেদা জিয়ার নির্বাচনী সাফল্যও আরেক ইতিহাস। তিনি তাঁর জীবনে অংশ নেওয়া কোনো নির্বাচনেই পরাজিত হননি। ১৯৯১ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত পাঁচটি জাতীয় নির্বাচনে তিনি মোট ২৩টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে প্রতিটিতেই বিপুল ভোটে জয়ী হন—বাংলাদেশের রাজনীতিতে এই ক্ষেত্রে অনন্য খালেদা জিয়া।
আর পুরো রাজনৈতিক জীবন জুড়ে দেশ ও মানুষের পক্ষে আপসহীন অবস্থান তো তাঁকে কিংবদন্তীতে পরিণত করেছে- যেখান থেকে এসেছে তাঁর অভিধা, আপোষহীন নেত্রী।
এভাবে পুরো জীবন জুড়ে বেগম খালেদা জিয়া অসংখ্য ইতিহাস রচনা করেছেন, হয়েছেন নানা ইতিহাসের অংশ। এমনকি শেষ বিদায়েও তিনি রচনা করে গেলেন আরেক ইতিহাস।
তাঁর জানাজায় লাখো লাখো মানুষের ঢল, তাদের অশ্রুসজল অংশগ্রহণ, স্মরণকালের সবচেয়ে বড় জানাজা, দল-মত নির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা, ভালোবাসা আর আক্ষেপের মধ্য দিয়ে তাঁর এই যে বিদায়, তা স্মরণকালের ইতিহাসে বিরল। এমনকি অদূর ভবিষ্যতেও এমন দৃশ্য দেখা যাবে কিনা সন্দেহ।