
১৯৯৫ সালের ডিসেম্বরে মুক্তি পাওয়া ‘বিশ্বপ্রেমিক’ ছবির ৩০ বছর পূর্ণ হয়েছে
‘জানো, এই তিল থাকলে মেয়েরা নষ্ট হয়ে যায়। এই তিল থাকা ভালো না, ভালো না।’
‘বড় ভাই’ (হুমায়ূন ফরীদি) কথাগুলো বলছেন মিথ্যা বলে বাড়িতে নিয়ে আসা একটি মেয়েকে। তার আসল উদ্দেশ্য মেয়েটিকে হত্যা করে তার নিজস্ব শখ পূরণ করা। সেই শখ হলো, মেয়েদের হত্যা করে তাদের গলায় থাকা তিল দিয়ে মালা বানানো!
এই চরিত্রটি নিজেকে পরিচয় দেয় ‘রোমিও’ নামে। সে অন্যদের কাছে ‘বড় ভাই’ নামে পরিচিত, কারণ সে কলেজে পড়ে আছে বছরের পর বছর। কিন্তু পরীক্ষা দেয় না, পাশও করেনা। তার পড়াও শেষ হয় না। কিন্তু কেন এই ‘বড় ভাই’ এমন হয়ে গেলো?
সেই ব্যাপারটা অবশ্য খোলাসা হয় আরো পরে। তবে এর আগেই বড় ভাইয়ের জীবনে আসে নতুন মোড়। তার কলেজে পড়তে আসে শিখা (মৌসুমী)। শিখার প্রেমে পড়ে বড় ভাই৷ আমরা দেখি কল্পনায় তিনি গাইছেন- ‘এই তো প্রথম একটি মেয়ে আমার প্রেমে পড়েছে/ পাগল করেছে, আমায় জাদু করেছে/ তোমরা কাউকে বোলো না, কাউকে বোলো না…’।

হুমায়ূন ফরীদি
কিন্তু এই বড় ভাই তার প্রেমিকার বাড়িতে প্রস্তাব নিয়ে গিয়ে প্রত্যাখ্যাত হয়। তারপর আমরা দেখি, তারও আছে এই নৃশংসতার আড়ালে একটি সংবেদনশীল মন। প্রত্যাখ্যানের ব্যথা সেও অনুভব করে, অপমানের বোধ তারও আছে। ইজি চেয়ারে শুয়ে থাকে সে। তার দু চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়তে থাকে। এরপর ক্রমশ প্রকাশিত হতে থাকে তার মনোবিকারের কারণ।
মূলত শৈশবে তার মা-কে পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়তে দেখে ও পরকীয়ায় লিপ্ত অবস্থায় দেখে তার শিশুমনে প্রচণ্ড অভিঘাত সৃষ্টি হয়। তার মা তার পক্ষাঘাতগ্রস্থ বাবাকে সিঁড়ি থেকে ফেলে দিয়ে হত্যা করে। এই স্মৃতি কখনো তার মাথা থেকে মুছে যায়নি৷ তার মায়ের গলাতেও আছে এমনই এক কালো তিল। আর তারপর ‘বড় ভাই’ এর মনোবিকার পৌঁছে যায় চূড়ান্তে। সে করতে থাকে একের পর এক শিকার।
তবে সিনেমাটিতে এরপর বড় ভাইয়ের এই মনোবিকার কীভাবে বাইরে আসে, কীভাবে শিখার প্রেমে পড়া ফারুক (রুবেল) ও ডা. মামুন (সোহেল রানা) এই ব্যাপারগুলো ধরে ফেলেন, তারপর আর কী কী ঘটে তা জানতে হলে সিনেমাটি দেখতে হবে।

শহীদুল ইসলাম খোকন
শহীদুল ইসলাম খোকন পরিচালিত এই সিনেমাটি বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসে বিশেষ স্থান অধিকার করে আছে। কারণ, বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম সাইকো-থ্রিলার সিনেমা ছিলো এটিই। এর আগে থ্রিলার নির্মিত হয়েছিল একাধিক। যেমন- বাবুল চৌধুরীর ‘প্রতিশোধ’, রুহুল আমিনের ‘গাংচিল’, মালেক আফসারীর ‘ক্ষতিপূরণ’, ‘ঘৃণা’, কাজী হায়াতের ‘দাঙ্গা।’ তবে এর কোনোটাই সাইকো-থ্রিলার নয়। এ জায়গাতে বিশ্বপ্রেমিক ছবিটি দর্শককে আলাদা এক জগতে নিয়ে গিয়েছিল।
সিনেমাতে পরিচালক খোকন চমৎকার মেলোডিয়াস কিছু গান ব্যবহার করেছেন। আলম খানের সুরে গানগুলো খুব সুন্দর৷ প্রেমও আছে সিনেমায়, তবে তা প্রধান হয়ে ওঠেনি৷ রুবেল মার্শাল আর্টভিত্তিক অ্যাকশনে খুব সমাদৃত। তবে এই সিনেমাটি মোটাদাগে অ্যাকশননির্ভর নয়।

বিশ্বপ্রেমিক ছবির পোস্টার
সিনেমাটির ‘হিরো’ ও ‘অ্যান্টিহিরো’ দুটোই মূলত ফরীদি। সিনেমার ক্লাইম্যাক্সে কোনো মেলোড্রামায় না গিয়ে শীতল কণ্ঠে বলা ‘কিল হিম’ কিংবা শেষে নিজের পরিণতি নিজেই নির্ধারণ করা- সিনেমাটিকে সাইকো থ্রিলার হিসেবে আলাদা মাত্রা দিয়েছে। হুমায়ূন ফরীদির মূলধারার বাণিজ্যিক সিনেমায় সবচেয়ে ভালো অভিনয় দক্ষতার প্রমাণ মেলে এই সিনেমাতেই।
১৯৯৫ সালের ডিসেম্বরে মুক্তি পাওয়া ‘বিশ্বপ্রেমিক’ ছবির ৩০ বছর পূর্ণ হয়েছে। তবে সিনেমাটি এখনো দর্শকদের মুগ্ধ করতে সক্ষম। রোমাঞ্চে মোড়ানো শিহরণ জাগানো চিরসবুজ এক সিনেমা ‘বিশ্বপ্রেমিক’।