
বেগম খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা
রাজনৈতিক ইতিহাসে বেগম খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনার সম্পর্ক কেবল দুই নেত্রীর দ্বন্দ্ব নয়—এটি একটি রাষ্ট্রের ক্ষমতা ব্যবহারের চরিত্র, প্রতিপক্ষকে দমনের কৌশল এবং মানবিকতার সীমারেখা নির্ধারণের গল্প। খালেদা জিয়ার দীর্ঘ অসুস্থতা, তার চিকিৎসা নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং সেই প্রেক্ষিতে “মৃত্যুর দায়” নিয়ে যে প্রশ্ন উঠছে, তা কোনো আকস্মিক আবেগ নয়—বরং বহু বছরের জমে ওঠা ক্ষোভ ও অবিশ্বাসের ফল।
এই প্রশ্নটি সরাসরি কাউকে খুনি আখ্যা দেওয়ার চেষ্টা নয়; বরং এটি একটি রাষ্ট্র কীভাবে তার রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীর সঙ্গে আচরণ করেছে, সেই আচরণের পরিণতি কী হতে পারে—তার একটি নির্মম অনুসন্ধান।
জেলবন্দিত্ব: বিচারিক প্রক্রিয়া নাকি রাজনৈতিক শাস্তি?
২০১৮ সালে দুর্নীতির মামলায় খালেদা জিয়ার সাজা ঘোষণা করা হয়। আইনগতভাবে এটি আদালতের রায় হলেও রাজনৈতিক বাস্তবতায় এটি নিছক একটি মামলার চেয়ে অনেক বড় হয়ে ওঠে। কারণ, এই সাজা আসে এমন এক সময়ে, যখন বিএনপি রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা, নির্বাচনের মাঠ সংকুচিত, এবং বিরোধী কণ্ঠগুলো একে একে নিস্তব্ধ।
কারাগারে নেওয়ার সময় খালেদা জিয়া ছিলেন একজন প্রবীণ নারী, যিনি একাধিক জটিল রোগে আক্রান্ত। সাধারণত বিশ্বের অনেক দেশে এই ধরনের অবস্থায় আদালত ও রাষ্ট্র বিকল্প ব্যবস্থা—গৃহবন্দিত্ব বা বিশেষ চিকিৎসা সুবিধা—বিবেচনা করে। বাংলাদেশে সে আলোচনা খুব সীমিত পর্যায়েই থেমে যায়।
বিএনপির অভিযোগ ছিল—এই জেলবন্দিত্ব ছিল শারীরিক ও মানসিকভাবে ভেঙে দেওয়ার একটি পরিকল্পিত ধাপ। সরকার যদিও একে “আইনের শাসন” বলে দাবি করেছে, কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—আইনের প্রয়োগ কি মানবিক বিবেচনাকে পুরোপুরি বাতিল করে দিতে পারে?
কারাগারে চিকিৎসা: অবহেলা নাকি সীমাবদ্ধতা?
কারাগারে থাকার সময় থেকেই খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার অবনতি নিয়ে বারবার উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। তার পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়—কারা কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসা দিতে ব্যর্থ হয়েছে।
কারাগার কখনোই হাসপাতাল নয়। অথচ একজন গুরুতর অসুস্থ মানুষের জন্য সেখানে দীর্ঘ সময় কাটানো মানে রোগকে আরও জটিল করে তোলা। চিকিৎসকদের ভাষায়, লিভার সিরোসিসের মতো রোগে সময় ও পরিবেশ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। দেরি মানেই স্থায়ী ক্ষতি।
এখানে রাষ্ট্রের দায়ের প্রশ্ন ওঠে—কারণ একজন বন্দি হলেও রাষ্ট্রই তার জীবন ও চিকিৎসার দায়িত্ব বহন করে। রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে সেই দায়িত্বে শিথিলতা থাকলে সেটি আর নিছক প্রশাসনিক ব্যর্থতা থাকে না; তা হয়ে ওঠে রাষ্ট্রীয় নিষ্ঠুরতা।
বিদেশে চিকিৎসা: আইনের অজুহাত বনাম মানবিক সিদ্ধান্ত
খালেদা জিয়ার চিকিৎসা নিয়ে সবচেয়ে বড় বিতর্ক তৈরি হয় বিদেশে নেওয়ার অনুমতি প্রশ্নে। বিএনপি বহুবার দাবি করে—দেশে তার রোগের পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা সম্ভব নয়। উন্নত লিভার চিকিৎসা ও বিশেষায়িত কেয়ার ইউনিট প্রয়োজন, যা বিদেশে সহজলভ্য।
সরকারের অবস্থান ছিল—আইন অনুযায়ী দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিকে বিদেশে পাঠানো সম্ভব নয়। কিন্তু সমালোচকরা প্রশ্ন তোলেন—আইন কি কখনো ব্যতিক্রমহীন? রাষ্ট্র কি চাইলে মানবিক বিবেচনায় বিশেষ সিদ্ধান্ত নিতে পারে না?
বিশ্ব রাজনীতিতে এমন নজির আছে, যেখানে চরম রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীর ক্ষেত্রেও চিকিৎসা বিষয়ে ছাড় দেওয়া হয়েছে। এখানে সেই সদিচ্ছার অনুপস্থিতিই শেখ হাসিনার শাসনের বিরুদ্ধে বড় অভিযোগ হয়ে ওঠে।
শর্তাধীন মুক্তি: মানবিকতা নাকি বিলম্বিত দায়?
পরবর্তীতে খালেদা জিয়াকে শর্তসাপেক্ষে মুক্তি দেওয়া হয়। কিন্তু এই মুক্তি ছিল সীমিত—তিনি বিদেশে যেতে পারতেন না, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডও কার্যত নিষিদ্ধ ছিল। অনেকেই একে বলেছেন “কারাগারের বাইরে আরেক কারাগার”।
এই সময় তার শারীরিক অবস্থা আরও জটিল হয়ে ওঠে। বারবার হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়, আইসিইউ পর্যন্ত যেতে হয়। প্রশ্ন উঠতে থাকে—যদি এই মুক্তি আগেই দেওয়া হতো, যদি চিকিৎসার পথ খুলে দেওয়া হতো, পরিস্থিতি কি ভিন্ন হতে পারত?
এই প্রশ্নের কোনো নিশ্চিত উত্তর নেই। কিন্তু রাষ্ট্রের সিদ্ধান্তগুলো যে সময়ক্ষেপণমূলক ছিল, সেটি অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
বিষ প্রয়োগের অভিযোগ: প্রমাণের অভাব, কিন্তু সন্দেহের জন্ম কেন?
খালেদা জিয়ার মৃত্যু বা মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে সবচেয়ে সংবেদনশীল অভিযোগ হলো—বিষ প্রয়োগ বা পরিকল্পিতভাবে শরীর ধ্বংস করার চেষ্টা। এটি এমন একটি অভিযোগ, যা রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত শক্তিশালী, কিন্তু একই সঙ্গে আইনি ও বৈজ্ঞানিকভাবে দুর্বল। কারণ, এখন পর্যন্ত কোনো চিকিৎসা রিপোর্ট, ফরেনসিক পরীক্ষা বা আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থার নথিতে সরাসরি বিষ প্রয়োগের প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
তবু প্রশ্ন থেকে যায়—এই অভিযোগ এলো কোথা থেকে?
চিকিৎসা বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে খালেদা জিয়ার রোগগুলো—বিশেষ করে লিভার সিরোসিস—এমনিতেই প্রাণঘাতী হতে পারে। এই রোগ ধীরে ধীরে শরীরের ভেতরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে অকেজো করে দেয়। নিয়মিত, উন্নত চিকিৎসা না পেলে পরিস্থিতি দ্রুত অবনতি হয়। এখানে “বিষ” বলতে অনেক সময় মানুষ কেমিক্যাল বা তাৎক্ষণিক হত্যার কথা বোঝে, কিন্তু বাস্তবে চিকিৎসা বঞ্চনাও এক ধরনের ধীর বিষক্রিয়া—এই ধারণা থেকেই রাজনৈতিক বক্তব্যে শব্দটি ব্যবহৃত হয়।
এই অভিযোগের মূল উৎস হলো রাষ্ট্রের প্রতি গভীর অবিশ্বাস। যখন একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী বছরের পর বছর ধরে রাষ্ট্রের হেফাজতে বা রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত সিদ্ধান্তের মধ্যে থাকেন, তখন তার শরীরে কী হচ্ছে, কী দেওয়া হচ্ছে, কী দেওয়া হচ্ছে না—এসব প্রশ্ন রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিরোধী দলগুলো বহুবার অভিযোগ করেছে—তার খাবার নিয়ন্ত্রণ করা হতো, চিকিৎসার সিদ্ধান্তে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ছিল, বিদেশি বিশেষজ্ঞদের পূর্ণাঙ্গ অ্যাকসেস দেওয়া হয়নি।
এই অভিযোগগুলোর প্রত্যেকটির পক্ষে শক্ত প্রমাণ না থাকলেও, এগুলো মিলেই একটি সন্দেহের পরিবেশ তৈরি করে। আর সন্দেহ যখন দীর্ঘদিন জমে থাকে, তখন সেটি একসময় অভিযোগের ভাষা নেয়।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—বাংলাদেশে রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর ব্যক্তিদের চিকিৎসা রিপোর্ট কখনোই পুরোপুরি জনসম্মুখে আসে না। খালেদা জিয়ার ক্ষেত্রেও চিকিৎসা সংক্রান্ত তথ্যের বড় অংশই এসেছে সরকারি ব্রিফিং বা দলীয় বক্তব্যের মাধ্যমে। স্বাধীন, পূর্ণাঙ্গ মেডিকেল অডিট বা আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ না থাকায় সন্দেহ দূর হওয়ার সুযোগও তৈরি হয়নি।
এই অস্বচ্ছতাই বিষ প্রয়োগের মতো অভিযোগকে উসকে দেয়। কারণ, যখন তথ্যের জায়গা ফাঁকা থাকে, সেখানে গুজব, সন্দেহ ও রাজনৈতিক ব্যাখ্যা ঢুকে পড়ে।
এখানে স্পষ্ট করে বলা জরুরি—পরিকল্পিত বিষ প্রয়োগের অভিযোগ আইনগতভাবে দুর্বল। কারণ কোনো ফরেনসিক প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি, কোনো নিরপেক্ষ মেডিকেল বোর্ড বিষের অস্তিত্ব নিশ্চিত করেনি এবং আন্তর্জাতিক কোনো সংস্থাও এ ধরনের অভিযোগ সমর্থন করেনি।
এই কারণে রাষ্ট্রীয়ভাবে একে সত্য প্রমাণ করা যাবে না। কিন্তু রাজনীতি আদালত নয়। রাজনীতিতে অনেক সময় সত্যের চেয়ে অনুভূতির শক্তি বেশি কার্যকর।
আর এখানেই আসে “নীরব হত্যা” বা slow killing তত্ত্ব। এটি সরাসরি হত্যার অভিযোগ নয়; বরং একটি নৈতিক অভিযোগ। এর বক্তব্য হলো—যদি রাষ্ট্র জেনেশুনে একজন গুরুতর অসুস্থ মানুষকে যথাযথ চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত করে, তাহলে সেটিও এক ধরনের হত্যার দায়।
এই তত্ত্বের আলোকে, বিষ প্রয়োগের অভিযোগকে অনেকেই দেখেন প্রতীকী ভাষা হিসেবে—যেখানে বিষ মানে কেবল রাসায়নিক নয়, বিষ মানে অবহেলা, নিষ্ঠুরতা, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা। এক্ষেত্রে শেখ হাসিনার দায় এই জায়গায়—
• তিনি কি সন্দেহ দূর করার জন্য যথেষ্ট স্বচ্ছতা দেখিয়েছেন?
• তিনি কি রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীকেও একজন অসুস্থ নাগরিক হিসেবে দেখার উদাহরণ তৈরি করেছেন?
এই প্রশ্নগুলোর স্পষ্ট উত্তর না থাকায় বিষ প্রয়োগের অভিযোগ বারবার ফিরে আসে—প্রমাণ হিসেবে নয়, বরং রাষ্ট্রীয় অবহেলা ও প্রতিহিংসার প্রতীক হিসেবে।
শেখ হাসিনার দায়: আইনগত, নৈতিক নাকি রাজনৈতিক?
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গাটি এখানেই। শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে খালেদা জিয়ার মৃত্যু নিয়ে আইনগতভাবে প্রমাণিত কোনো অপরাধ নেই—এ কথা স্পষ্ট। কিন্তু রাজনীতিতে দায় সবসময় আদালতের রায়ে নির্ধারিত হয় না। শেখ হাসিনা রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে এমন একটি ব্যবস্থার নেতৃত্ব দিয়েছেন, যেখানে:
• রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী দীর্ঘদিন বন্দি ছিলেন
• চিকিৎসা নিয়ে সিদ্ধান্ত ছিল কঠোর ও অনমনীয়
• মানবিক বিবেচনার চেয়ে হাসিনার নিজস্ব ইচ্ছা প্রাধান্য পেয়েছে
এই সিদ্ধান্তগুলোর সমষ্টিগত ফল যদি কোনো মানুষের জীবনকে আরও সংকটে ফেলে, তাহলে দায়ের প্রশ্ন অবধারিতভাবেই ওঠে।
প্রকৃতপক্ষে, খালেদা জিয়ার অসুস্থতা ও সম্ভাব্য মৃত্যুকে ঘিরে যে বিতর্ক, তা আসলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি আয়না। এখানে ক্ষমতা মানে প্রতিপক্ষকে দমন করা, সহানুভূতি মানে দুর্বলতা।
এই সংস্কৃতি বদলানো না গেলে আজ খালেদা জিয়া, কাল অন্য কেউ—একই অন্যায়ের শিকার হবেন।
বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে শেখ হাসিনার দায়ের স্বরূপ কেমন—এটি একটি দীর্ঘ রাজনৈতিক বিচার, যা আদালতে নয়, ইতিহাসের পাতায় লেখা হবে।
রাষ্ট্র যদি মানবিক হতে ব্যর্থ হয়, ক্ষমতা যদি সহানুভূতিকে গ্রাস করে—তাহলে ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করে না।
আজ প্রশ্ন উঠছে, কারণ প্রশ্ন তোলার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। আর সেই প্রশ্নই একদিন উত্তর দাবি করবে।