
বিশ্বের শীর্ষ ধনীদের তালিকায় বর্তমান সময়ের অন্যতম প্রভাবশালী নাম জুলিয়া কচ (Julia Koch)। একজন সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে উঠে এসে আজ তিনি বিশ্বের তৃতীয় শীর্ষ ধনী নারী এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম শক্তিশালী ব্যবসায়িক ব্যক্তিত্ব। ২০২৬ সালের শুরুর দিকে তাঁর সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৮১ বিলিয়ন ডলারে।
আইওয়া থেকে নিউইয়র্কের ফ্যাশন জগত
জুলিয়া কচের জন্ম ১৯৬২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের আইওয়া অঙ্গরাজ্যের এক সাধারণ পরিবারে। তাঁর বাবা-মা একটি ফার্নিচার এবং কাপড়ের দোকান চালাতেন। আইওয়া থেকে আরকানসাস বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষ করে আশির দশকে মাত্র ২২ বছর বয়সে তিনি পাড়ি জমান নিউইয়র্ক শহরে। ফ্যাশনের প্রতি প্রবল ঝোঁক থাকায় তিনি বিখ্যাত ডিজাইনার আডলফো’র সহকারী হিসেবে কাজ শুরু করেন। সেই সময়ে তিনি সাবেক ফার্স্ট লেডি ন্যান্সি রেগানের মতো প্রভাবশালী ব্যক্তিদের স্টাইলিংয়ের কাজও করেছেন। সেই সময়ে তিনি রাজকীয় স্টাইল এবং অভিজাত শ্রেণির রুচি সম্পর্কে যে গভীর জ্ঞান অর্জন করেছিলেন, তা তাঁকে পরবর্তীতে নিউইয়র্কের সামাজিক এবং ব্যবসায়িক উচ্চতায় জায়গা করে নিতে সাহায্য করে।
১৯৯১ সালে একটি ‘ব্লাইন্ড ডেট’-এর মাধ্যমে তাঁর পরিচয় হয় বিখ্যাত শিল্পপতি ডেভিড কচের সাথে। যদিও প্রথম দেখায় তাঁদের অভিজ্ঞতা খুব একটা ভালো ছিল না, কিন্তু পরবর্তীতে তাঁরা একে অপরের প্রেমে পড়েন। ১৯৯৬ সালে তাঁরা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। বিয়ের পর জুলিয়া তাঁর ফ্যাশন ক্যারিয়ার ছেড়ে পরিবারের দিকে মনোনিবেশ করেন এবং জুলিয়া নিজের ব্যক্তিত্ব দিয়ে কচ পরিবারের বিশাল ছায়ায় নিজের স্বতন্ত্র পরিচিতি তৈরি করেন।
ব্যবসায়িক দূরদর্শিতা ও সাম্রাজ্য বিস্তার
২০১৯ সালে স্বামীর মৃত্যুর পর জুলিয়া কচ কেবল একজন উত্তরাধিকারী হিসেবে বসে থাকেননি। তিনি কচ ইনকর্পোরেটেডের ৪২ শতাংশ মালিকানার অংশীদার হিসেবে কোম্পানির কৌশলগত সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে শুরু করেন। বর্তমানে তাঁর মোট নিট সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৮১ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা তাঁকে বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী নারীতে পরিণত করেছে।
তিনি গতানুগতিক তেল বা কৃষি খাতের বাইরেও ব্যবসার বৈচিত্র্য আনতে মনোযোগী হয়েছেন। বিশেষ করে ২০২৪ এবং ২০২৫ সালে তিনি স্পোর্টস ইনভেস্টমেন্টের মাধ্যমে নিজের পোর্টফোলিওকে নতুন রূপ দিয়েছেন। এনবিএ দল ব্রুকলিন নেটস এবং এনএফএল-এর বিখ্যাত দল নিউইয়র্ক জায়ান্টসের মালিকানায় তাঁর অন্তর্ভুক্তি প্রমাণ করে যে তিনি বর্তমান সময়ের গতির সাথে তাল মিলিয়ে সম্পদ ব্যবস্থাপনা করতে জানেন।
জুলিয়া কচ ফ্যামিলি ফাউন্ডেশন ও সমাজসেবার নতুন ধারা
জুলিয়া কচের সাফল্যের একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে তাঁর মানবিক কর্মকাণ্ড। ২০২৩ সালে তিনি ‘জুলিয়া কচ ফ্যামিলি ফাউন্ডেশন’ প্রতিষ্ঠা করেন যা মূলত স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা এবং শিল্পকলা নিয়ে কাজ করে। তাঁর এই ফাউন্ডেশন কেবল অর্থ দান করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় বরং দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলে এমন প্রজেক্টে বিনিয়োগ করছে। এর মধ্যে অন্যতম বড় অর্জন হলো ফ্লোরিডার ওয়েস্ট পাম বিচে ৭৫ মিলিয়ন ডলারের অনুদানে নির্মিত হতে যাওয়া ‘জুলিয়া কচ ফ্যামিলি অ্যাম্বুল্যাটরি কেয়ার সেন্টার’ যা ২০২৬ সালে চালু হলে প্রতি বছর প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার রোগীকে অত্যাধুনিক চিকিৎসা সেবা প্রদান করবে।
এনওয়াইইউ ল্যাঙ্গোন হেলথ-এর মতো বড় বড় চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের সাথে যুক্ত হয়ে তিনি ক্যানসার গবেষণা এবং বিশেষ করে অ্যালার্জি ও অ্যাজমা ক্লিনিক স্থাপনে ব্যাপক ভূমিকা রাখছেন। পাশাপাশি তিনি শিল্পকলার একজন বড় পৃষ্ঠপোষক হিসেবে মেট্রোপলিটন মিউজিয়াম অব আর্ট এবং স্কুল অফ আমেরিকান ব্যালে-র বোর্ডে দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত এন্ডোড স্কলারশিপের মাধ্যমে মেধাবী মেডিকেল শিক্ষার্থীরা বিনা বেতনে পড়াশোনা করার সুযোগ পাচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে চিকিৎসা ক্ষেত্রে দক্ষ জনবল তৈরিতে অবদান রাখছে। এভাবেই জুলিয়া কচ তাঁর পারিবারিক সম্পদকে একটি অর্থবহ সামাজিক শক্তিতে রূপান্তর করেছেন।
ব্যবসায়িক দিক থেকে জুলিয়া কচ বর্তমানে ‘কচ ইনকর্পোরেটেড’-এর বোর্ড সদস্য হিসেবে কোম্পানির ভবিষ্যৎ গতিপথ নির্ধারণে কাজ করছেন। তিনি বর্তমানে তাঁর রিয়েল এস্টেট পোর্টফোলিও থেকে কিছু বিলাসবহুল সম্পত্তি বিক্রি করে সেই মূলধনকে স্পোর্টস এবং টেকনোলজি-ভিত্তিক ব্যবসায় সরিয়ে নিচ্ছেন।
এর মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করছেন যে, উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সম্পদকে কীভাবে সময়ের চাহিদা অনুযায়ী আধুনিক এবং জনকল্যাণমূলক বিনিয়োগে রূপান্তর করা যায়। তাঁর এই সামগ্রিক কর্মযজ্ঞের মূল লক্ষ্য হলো ব্যবসায়িক মুনাফা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার মধ্যে একটি টেকসই ভারসাম্য তৈরি করা।