
ড. শরীফুল ইসলাম দুলু
বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি মৌলিক কিন্তু প্রায় উপেক্ষিত প্রশ্ন বারবার ফিরে আসে—নির্বাচনের মাধ্যমে যারা রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পান, তারা কি আসলে দায়িত্ব গ্রহণ করেন, নাকি ক্ষমতা দখল করেন? এই প্রশ্নের উত্তরেই লুকিয়ে আছে সুশাসন, গণতন্ত্র এবং রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ পথরেখা। কারণ ক্ষমতা ও দায়িত্ব—এই দুইয়ের দর্শন, মানসিকতা এবং প্রয়োগ এক নয়। একটি রাষ্ট্রকে এগিয়ে নেয়, অন্যটি ধীরে ধীরে তাকে ফ্যাসিবাদের দিকে ঠেলে দেয়।
গণতন্ত্রের মূল দর্শন হলো জনগণের সম্মতি ও অংশগ্রহণের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনা। জনগণ ভোটাধিকার প্রয়োগ করে প্রতিনিধি নির্বাচন করে এই প্রত্যাশায় যে, নির্বাচিতরা রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নেবেন। এখানে ‘দায়িত্ব’ শব্দটির অর্থ গভীর। দায়িত্ব মানে জবাবদিহি, সংযম, নৈতিকতা এবং জনগণের কল্যাণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় দেখা যায়, নির্বাচন শেষ হওয়ার পর অনেক ক্ষেত্রে দায়িত্বের জায়গায় ‘ক্ষমতা’ শব্দটি প্রাধান্য পায়। ক্ষমতা তখন আর সেবার মাধ্যম থাকে না; হয়ে ওঠে নিয়ন্ত্রণ, দমন এবং শোষণের হাতিয়ার।
ক্ষমতা শব্দটি নিজেই নিরপেক্ষ নয়, তবে ক্ষমতার প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি বিপজ্জনক হতে পারে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে ক্ষমতা একটি বহুল ব্যবহৃত, বহুল আকাঙ্ক্ষিত এবং লোভনীয় শব্দ। ক্ষমতা যেন এখানে ব্যক্তিগত অর্জন, দলীয় সম্পদ কিংবা প্রতিশোধ নেওয়ার বৈধ সুযোগ। এই মনস্তত্ত্ব থেকেই শাসক ধীরে ধীরে শোষকে রূপান্তরিত হয়। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো তখন জনগণের সেবক না হয়ে ক্ষমতাসীনদের রক্ষাকবচে পরিণত হয়। আইন প্রয়োগ হয় নির্বাচিতভাবে, প্রশাসন কাজ করে আনুগত্যের ভিত্তিতে, আর ভিন্নমত দমনকে ‘শাসনের স্বার্থে প্রয়োজনীয়’ বলে যুক্তি দেওয়া হয়।
ইতিহাস আমাদের স্পষ্ট শিক্ষা দেয়—যখন ক্ষমতা দায়িত্বের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে, তখন গণতন্ত্র দুর্বল হয়। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। নির্বাচিত সরকার যদি নিজেকে জনগণের মালিক মনে করে, জনগণের প্রতিনিধি নয়, তাহলে সুশাসন কেবল স্লোগানে সীমাবদ্ধ থাকে। তখন নির্বাচন একটি প্রক্রিয়া মাত্র, গণতন্ত্র একটি শব্দ, আর রাষ্ট্র একটি দলীয় কাঠামোতে পরিণত হয়।
রাষ্ট্র পরিচালনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো শাসকের মনস্তাত্ত্বিক কাঠামো। দায়িত্বশীল মনস্তত্ত্ব মানে হলো—ক্ষমতা সাময়িক, জনগণ স্থায়ী; পদ একটি আমানত, ব্যক্তিগত সম্পদ নয়; সমালোচনা শত্রুতা নয়, বরং গণতান্ত্রিক শক্তি। এই মানসিকতা না থাকলে যত ভালো সংবিধানই থাকুক, যত শক্ত আইনই থাকুক, সুশাসন প্রতিষ্ঠা হয় না। কারণ আইন প্রয়োগ করে মানুষ, আর মানুষ পরিচালিত হয় তার মানসিকতা দিয়ে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকটের একটি বড় কারণ হলো ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতি। নির্বাচনকে দেখা হয় ক্ষমতায় যাওয়ার সিঁড়ি হিসেবে, দায়িত্ব গ্রহণের ম্যান্ডেট হিসেবে নয়। ফলে নির্বাচনের পর রাজনৈতিক আচরণে পরিবর্তন আসে। সংলাপের জায়গায় আসে নির্দেশ, অংশগ্রহণের জায়গায় আসে নিয়ন্ত্রণ, আর সহনশীলতার জায়গায় আসে প্রতিহিংসা। এর ফলেই রাষ্ট্র ধীরে ধীরে ফ্যাসিবাদী প্রবণতার দিকে ঝুঁকে পড়ে—যেখানে রাষ্ট্রের সব শক্তি কেন্দ্রীভূত হয় ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর হাতে।
সুশাসন নিশ্চিত করতে হলে এই মানসিকতার মৌলিক পরিবর্তন প্রয়োজন। নির্বাচিত প্রতিনিধিদের বুঝতে হবে, জনগণ তাদের ক্ষমতা দেয়নি; দিয়েছে দায়িত্ব। এই দায়িত্বের পরিধি শুধু উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন নয়। এর মধ্যে রয়েছে মানবাধিকার রক্ষা, আইনের শাসন নিশ্চিত করা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বজায় রাখা এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদের ন্যায়সংগত ব্যবহার। উন্নয়ন যদি হয় কিন্তু ন্যায়বিচার না থাকে, তাহলে সেই উন্নয়ন টেকসই হয় না।
রাষ্ট্র পরিচালনায় দায়িত্বশীল চিন্তাধারার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো জবাবদিহি। ক্ষমতার রাজনীতিতে জবাবদিহি দুর্বল হয়, কারণ ক্ষমতা নিজেকে প্রশ্নের ঊর্ধ্বে মনে করে। দায়িত্বের রাজনীতিতে জবাবদিহি স্বাভাবিক, কারণ দায়িত্ব মানেই উত্তরদায়িত্ব। সংসদ, গণমাধ্যম, সুশীল সমাজ এবং বিরোধী রাজনৈতিক শক্তি—সবাই এখানে রাষ্ট্রের শত্রু নয়, বরং গণতন্ত্রের সহযাত্রী।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতির জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো এই ক্ষমতা বনাম দায়িত্বের দ্বন্দ্ব থেকে বেরিয়ে আসা। রাজনৈতিক দলগুলোকে তাদের অভ্যন্তরীণ কাঠামোতেই দায়িত্বশীলতা চর্চা করতে হবে। নেতা নির্বাচনে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া, সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বচ্ছতা এবং ভিন্নমতের প্রতি সম্মান—এই চর্চা রাষ্ট্র পরিচালনার মানসিকতা তৈরি করে।
সবশেষে বলা যায়, নির্বাচন কেবল ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া নয়; এটি দায়িত্ব অর্পণের সামাজিক চুক্তি। জনগণ ভোট দেয় এই বিশ্বাসে যে, তাদের প্রতিনিধি রাষ্ট্রকে নিজের সম্পত্তি ভাববে না, বরং একটি আমানত হিসেবে পরিচালনা করবে। যদি আমরা ক্ষমতার রাজনীতি থেকে দায়িত্বের রাজনীতিতে যেতে পারি, তাহলেই সুশাসন বাস্তব অর্থে প্রতিষ্ঠিত হবে। অন্যথায়, ক্ষমতার মোহ বারবার শাসককে শোষকে এবং রাষ্ট্রকে দুর্বল কাঠামোতে পরিণত করবে—যার মূল্য দিতে হবে পুরো জাতিকে।
ড. শরিফুল ইসলাম দুলু: বিপণন ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ, নীতি পরামর্শক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক। মার্কেটার্স ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ (এমআইবি)-এর সেক্রেটারি জেনারেল এবং মার্কটেল কনসাল্টিং গ্রুপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা