
সকালের আলো ফোটার আগেই ব্যাগ গুছিয়ে অফিসের পথে দৌড়ানো এই জীবন হাফসা মোসলেম কখনোই চাননি। চেয়েছিলেন, তার একমাত্র সন্তানকে কাছে রেখে এমন কিছু করতে, যাতে আত্মসম্মান বাড়ে সেই সাথে শখ পূরণের জন্য থাকে নিজস্ব অর্থ। ফাইন্যান্স এবং ব্যাংকিংয়ে মাস্টার্স করা ইডেন কলেজের এই গ্র্যাজুয়েট তাই গতানুগতিক চাকরি এড়িয়ে শুরু করলেন এক ভিন্ন পথচলা।
পূর্ব জুরাইনের মেয়ে হাফসা, যার বাবা ছিলেন অগ্রণী ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা, প্রথমে চেষ্টা করেছিলেন ফ্রিল্যান্সিংয়ে। কিন্তু মন বসছিল না। কাজটা বড্ড ক্লান্তিজনক মনে হচ্ছিল। এক দুপুরে বড় ভাইয়ের সাথে গল্প করতে বসে মনে হলো, গহনা নিয়ে কিছু করা যায় না? যেই ভাবা সেই কাজ। তার নিজস্ব সঞ্চয়ের শেষ অংশটুকু মাত্র ১০ হাজার টাকা তাতেই শুরু হলো ইন্ডিয়ান গহনা ট্রেডিং।


এরপর ধীরে ধীরে তিনি নিজস্ব রুটে ফেরেন এবং উদ্যোগের নাম দেন “আটকুঠুরি নয় দরজা”। শুরু থেকে আজ পর্যন্ত তিনি কেবল গহনা নিয়েই কাজ করেছেন, সময় ও চাহিদার সাথে বদলেছেন শুধু গহনার নকশা।
হাফসার এই উদ্যোগটি এখন শুধু একটি স্থানীয় ব্যবসার নাম নয়, এটি এখন বৈশ্বিক পরিচিতি পাচ্ছে। প্রতি মাসে ৬ থেকে ৭ লাখ টাকার গহনা তৈরি এবং বিক্রি হয় এই প্লাটফর্ম থেকে। এই হস্তশিল্প আজ দেশের গণ্ডি পেরিয়ে পৌঁছে যাচ্ছে আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, জার্মানি এবং যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে। তিনি দেশের বিভিন্ন জেলার কারিগরদের দিয়ে কাজ করান; তার নিজের কোনো কারখানা নেই, কিন্তু রয়েছে ৩ জন স্থায়ী এবং ৪ থেকে ৫ জন চুক্তিবদ্ধ কর্মীর কর্মসংস্থান।
হাফসা বাংলা টেলিগ্রাফকে বলেন, “আমার উদ্যোগের সবচেয়ে বড় অর্জন হলো গ্রাহকের স্বীকৃতি। বিভিন্ন মেলা বা প্রদর্শনীতে গিয়ে যখন ক্রেতারা স্টলের নাম না দেখে গহনা দেখেই জিজ্ঞেস করেন, “এটা কি আটকুঠুরির স্টল?”—সেই মুহূর্তটিই আমার কাছে শ্রেষ্ঠ প্রাপ্তি। বেশিরভাগ ক্লায়েন্টই একবার গহনা নেওয়ার পর কোয়ালিটি আর ইউনিকনেসের কারণে রিপিট করেন, যা আমার কাজের প্রতি আস্থা নিশ্চিত করে। ”
আজকের এই অবস্থান সম্পর্কে তিনি বলেন, “আমি কতটা সফল, সেই মূল্যায়ন করবেন আমার গ্রাহক ও গুরুজনেরা। আমি শুধু জানি, এখনো পথচলা বাকি অনেক দূর। তবে এত তাড়াতাড়ি যে “আমি হাফসা মোসলেম, আমার উদ্যোগ – আটকুঠুরি নয় দরজা” বলে পরিচয় দিতে পারছি, তার কারণ একটাই—আমি কথা ও কাজের মধ্যে মিল রাখতে পেরেছি।”

নতুন উদ্যোক্তাদের প্রতি তার বিশেষ পরামর্শ, হুজুগে পড়ে ব্যবসাতে নামাটা ভুল। একজন সফল হচ্ছে মানেই আপনিও হবেন, এমন নয়। আগে নিজেকে জানতে হবে, কোন পণ্য সম্পর্কে সবচাইতে ভালো ধারণা আছে। প্রচুর পড়াশোনা করে, পণ্যের খুঁটিনাটি বুঝে তারপর ব্যবসায় নামতে হবে। আর অবশ্যই, কথা ও কাজের মধ্যে সততা বজায় রাখতে হবে। এই সততাই পথ চলাকে সহজ করে দেয়।
হাফসা মোসলেমের এই পথচলা প্রমাণ করে, কেবল বড় পুঁজি নয়, বরং প্রবল ইচ্ছাশক্তি, ধৈর্য আর সততা থাকলে যেকোনো স্বপ্নই বাস্তবে রূপ দেওয়া সম্ভব। মাতৃত্বের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি নিজের শখকে পেশায় রূপান্তর করে তিনি যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, তা আগামীর নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য এক উজ্জ্বল পাথেয়। ‘আটকুঠুরি নয় দরজা’ আজ শুধু একটি গহনার ব্র্যান্ড নয়, বরং অসংখ্য নারীর স্বাবলম্বী হওয়ার অনুপ্রেরণার নাম।
বাংলা টেলিগ্রাফ উদ্যোগের গল্প