
একটি কাঁচের মতো স্বচ্ছ লকেটের ভেতর অবিকল জীবন্ত এক টুকরো গোলাপ কিংবা সতেজ কোনো পাতা এমন গয়না হয়তো রূপকথার গল্পেই মানায়। কিন্তু সেই রূপকথাকেই বাস্তবে রূপ দিয়েছেন রাজশাহীর এক অদম্য তরুণী জারিন তাসনিম আনান।
নিজের যাতায়াত খরচ বাঁচানো টাকা আর ঈদ সালামির জমানো খুচরো পুঁজি দিয়ে যে মেয়েটি একদিন একলা পথে নেমেছিলেন, আজ তিনি কোটি মানুষের সামনে এক সফল নারী উদ্যোক্তার প্রতিচ্ছবি। পড়াশোনা মাঝপথে থেমে গেলেও যার সৃজনশীলতা থামেনি এক মুহূর্তের জন্যও।
শহীদ নজমুল হক বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও বরেন্দ্র কলেজের গণ্ডি পেরিয়ে নিউ ডিগ্রি কলেজে অনার্সে ভর্তি হয়েছিলেন আনান। কিন্তু প্রথাগত চাকরির ধরাবাঁধা জীবনে তার মন টানতো না কখনো। ব্যবসায়ী বাবা মো. জাহিদ হোসেন আর চাকরিজীবী মা খান সাকিনা রহমানের বড় মেয়ে হিসেবে আনান চেয়েছিলেন নিজের একটা আলাদা পৃথিবী গড়তে। সেই ইচ্ছা থেকেই ইউটিউব আর ইনস্টাগ্রামের ভিডিও দেখে প্রেমে পড়েন ‘রেজিন ক্রাফটিং’-এর।
পরিবারের কাউকে না জানিয়ে, অনেকটা সবার অলক্ষ্যেই নিজের জমানো নামমাত্র টাকা দিয়ে কেনেন গ্লু আর রঙিন কাগজ। ফেসবুকে ‘ক্রাফটওয়ার্কস’ (CraftWorks) নামে পেজ খুলে শুরু হয় এক গোপন লড়াই। প্রথম অর্ডারটি এসেছিল এক বন্ধুর হাত ধরে, একটি সাধারণ গিফট বক্সের। সেই শুরু, এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি জারিনকে।

বর্তমানে জারিন ও তার সাত সদস্যের টিম রাজশাহীর মালদা কলোনী এলাকায় নিজেদের ফ্যাক্টরিতে তৈরি করছেন জাদুকরী সব রেজিন জুয়েলারি। স্বচ্ছ রেজিনের ভেতর আসল ফুল ও পাতা ব্যবহার করে তৈরি এই চুড়ি, লকেট বা আংটিগুলো বাংলাদেশে এক নতুন ঘরানার শিল্প হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছে। আনানের এই সংগ্রামের সবচেয়ে বড় স্বীকৃতি মেলে ২০২৪ সালে, যখন তিনি ‘শার্ক ট্যাংক বাংলাদেশ’-এর মঞ্চে নিজের মেধা দিয়ে জয় করে নেন বিশাল ইনভেস্টমেন্ট।
জারিন তৈরি করছেন রেজিন জুয়েলারি (চুড়ি,লকেট,কানের দুল, আংটি,ব্রেসলেট ইত্যাদি), নোটবুক, চাবির রিং, গিফট কার্ড ও রেজিনের বিভিন্ন কাস্টমাইজ কাজ নিয়ে। রেজিনের পণ্যের স্পেশালিটি হচ্ছে এর মধ্যে আসল ফুল, পাতা ব্যবহার করে তৈরি করা হয়। অর্থাৎ একটা চুড়ি/লকেট এর মাধ্যমে মানুষ তার নিজের পছন্দের আসল ফুল দিয়ে গহনা বানাতে পারবেন।
জারিন এখন শুধু অনলাইনে নয়, দারাজ এবং ঢাকা ও রাজশাহীর নামী আউটলেটগুলোতেও শোভা পাচ্ছে তার প্রতিষ্ঠানের পণ্য। এমনকি মাসে এখন ৫–৬ লক্ষ টাকার পণ্য বিক্রির মাইলফলকও স্পর্শ করছেন তিনি। আগামীতে রপ্তানির জন্য বিদেশী ট্রাস্টেড চ্যানেলের অপেক্ষায় আছেন এই উদ্যোক্তা।

লক্ষ্মীপুরের কাজিহাটার স্থায়ী বাসিন্দা হলেও রাজশাহীর আলো–বাতাসে বেড়ে ওঠা এই তরুণী এখন স্বপ্ন দেখছেন বিশ্ববাজারের। রেজিন জুয়েলারিকে বাংলাদেশে একটি পূর্ণাঙ্গ শিল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠা করাই তার প্রধান লক্ষ্য।
জারিন বাংলা টেলিগ্রাফকে বলেন, রেজিন নিয়ে কাজ করার মেইন কারন হচ্ছে এটা ইউনিক। এগুলো সম্পূর্ণ হ্যান্ডমেইড এবং খুব কম মানুষ রেজিন নিয়ে কাজ করে। বাংলাদেশে রেজিন জুয়েলারি কোনো শিল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠিত নয়। তাই এর মার্কেট খুবই ছোট। তবে আমরা প্রতিনিয়ত চেষ্টা করে যাচ্ছি এই রেজিন সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করে এটাকে শিল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার।

জারিন তাসনিম বিশ্বাস করেন, তরুণদের উচিত গড্ডালিকা প্রবাহে না ভেসে নতুন কিছু নিয়ে কাজ করা। শূন্য থেকে শুরু করে আজ একজন সফল উদ্যোক্তা হিসেবে আনানের প্রাপ্তি শুধু ফ্যাক্টরি বা টিম নয় বরং মানুষের সেই অগাধ ভালোবাসা যা তাকে প্রতিদিন আরও বেশি প্রোডাক্টিভ হতে অনুপ্রেরণা যোগায়। প্রকৃতির সৌন্দর্যকে গয়নায় বন্দি করে রাখা এই কারিগর এখন দিন গুনছেন সেই সময়ের, যখন ‘ক্রাফটওয়ার্কস’ নামটির জয়জয়কার থাকবে সারা বিশ্বে।
বাংলা টেলিগ্রাফ উদ্যোগের গল্প