
বর্তমানে ভেনেজুয়েলার সেনাবাহিনী এক জটিল সংকটে পড়েছে
মার্কিন বাহিনীর অভিযানে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো অপসারিত হওয়ার পর দেশটির ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে সামনে এসেছে সেনাবাহিনী। প্রায় ২৭ বছর ধরে ভেনেজুয়েলার সামরিক বাহিনী—আনুষ্ঠানিকভাবে ন্যাশনাল বলিভারিয়ান আর্মড ফোর্সেস (এফএএনবি)—হুগো শ্যাভেজ ও নিকোলাস মাদুরোর নির্ভরযোগ্য মিত্র ছিল। পশ্চিমা উদার গণতন্ত্রের বিকল্পের কথা বলে ধীরে ধীরে কর্তৃত্ববাদী শাসনের দিকে এগোনোর পথে এই সেনাবাহিনীই ছিল সরকারের প্রধান ভরসা।
এর বিনিময়ে শ্যাভেজ ও মাদুরো সরকার সেনাবাহিনীকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কেন্দ্রে নিয়ে আসে। মন্ত্রীত্ব, গভর্নর পদ, দূতাবাস, মেয়রশিপ এবং রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের পরিচালনাসহ নানা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয় সামরিক কর্মকর্তাদের।
কিন্তু সপ্তাহ খানেক আগে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ বাহিনীর হাতে মাদুরো অপহৃত হওয়ার পর এফএএনবি-এর ‘রাষ্ট্ররক্ষক’ ভাবমূর্তি বড় ধাক্কা খেয়েছে। রাজধানী কারাকাসের সবচেয়ে বড় সামরিক ঘাঁটি ফুয়ের্তে তিউনা থেকেই তাকে ধরে নেওয়া হয়—যা সেনাবাহিনীর প্রযুক্তিগত দুর্বলতা ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ঘাটতি স্পষ্ট করে দেয়।
সামরিক বাহিনীর সামনে কঠিন সিদ্ধান্ত
বর্তমানে ভেনেজুয়েলার সেনাবাহিনী এক জটিল সংকটে পড়েছে। তারা চাইলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন ও কারাকাসে অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজের মধ্যস্থতায় হওয়া সমঝোতার গ্যারান্টর হতে পারে। অন্যথায়, নতুন মার্কিন হামলার ঝুঁকি ও নিজেদের ক্ষমতা-প্রভাব আরও ক্ষয় হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
উত্থান থেকে পতন
গত কয়েক বছরে এফএএনবি-এর প্রভাব শুধু রাজনীতিতেই নয়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষায়ও ব্যাপকভাবে বেড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে তারা স্থানীয় ও রাষ্ট্রীয় পুলিশকে কার্যত প্রতিস্থাপন করেছে।
এই প্রক্রিয়া আরও জোরালো হয় ২০২৪ সালের ২৮ জুলাইয়ের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পর, যখন ব্যাপক ভোট জালিয়াতির অভিযোগে মাদুরো সরকারের বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়। তখন ভেনেজুয়েলায় কার্যত একটি পুলিশি রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়, যেখানে বিরোধীদের ওপর নজরদারি নজিরবিহীন মাত্রায় বাড়ে।
ক্ষমতায় টিকে থাকতে সরকার পুরোপুরি এফএএনবি-এর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। শাসক দল ইউনাইটেড সোশ্যালিস্ট পার্টি অব ভেনেজুয়েলা, আধাসামরিক গোষ্ঠী ‘কোলেক্তিভো’, রাজনৈতিক ও সামরিক পুলিশ—সবকিছুকে এক ছাতার নিচে এনে সরকার এটিকে নাম দেয় “সিভিক-মিলিটারি-পুলিশ ইউনিয়ন”।
মাদুরো-পরবর্তী অধ্যায়
মাদুরো-পরবর্তী ভেনেজুয়েলায় যে কোনো রাজনৈতিক রূপান্তরে সেনাবাহিনীর ভূমিকা অপরিহার্য। বিশ্লেষকদের মতে, গণতান্ত্রিক বা বলপ্রয়োগ—যেভাবেই সরকার গঠিত হোক না কেন, সেনাবাহিনীর সমর্থন ছাড়া দেশ শাসন করা প্রায় অসম্ভব।
ডেলসি রদ্রিগেজের অন্তর্বর্তী প্রশাসনের ক্ষেত্রেও একই বাস্তবতা প্রযোজ্য। ট্রাম্প প্রশাসনের সমর্থন পেলেও, দেশের ভেতরের রাজনৈতিক ও সামাজিক উত্তেজনা সামাল দিতে রদ্রিগেজের সবচেয়ে বড় ভরসা সেনাবাহিনী। সামরিক মহলে তার গ্রহণযোগ্যতাই মূল কারণ, যার ফলে যুক্তরাষ্ট্র মারিয়া কোরিনা মাচাদোর পরিবর্তে রদ্রিগেজকেই রাজনৈতিক রূপান্তরের নেতৃত্বে দেখতে চেয়েছে।
তবে মাদুরো অপহরণের ঘটনা এফএএনবি-এর দুর্বলতাও উন্মোচিত করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তির সঙ্গে তুলনায় তাদের ক্ষমতার বৈষম্য এতটাই বেশি যে ভবিষ্যতে নতুন হামলার ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে—যদিও আপাতত ট্রাম্প এমন পরিকল্পনার কথা অস্বীকার করেছেন।
এরপর কী করবে সেনাবাহিনী?
ভেনেজুয়েলার সামরিক নেতৃত্ব যতটা সম্ভব রাজনীতিতে নিজেদের প্রভাব ধরে রাখতে চাইবে। এজন্য তাদের কয়েকটি কঠিন ও আগে ‘অচিন্তনীয়’ পদক্ষেপ নিতে হতে পারে—
মাদক পাচারের অভিযোগ থেকে দূরে সরে আসা: যুক্তরাষ্ট্র যে অভিযোগের ভিত্তিতে সামরিক অভিযান চালিয়েছে, সেসব থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন করা।
নতুন তেল চুক্তি মেনে নেওয়া: ভেনেজুয়েলা ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সম্ভাব্য তেল চুক্তি, যাতে মার্কিন কোম্পানিগুলো বড় ধরনের নিয়ন্ত্রণ পেতে পারে।
দমন-পীড়ন কমানো: সাধারণ নাগরিকদের বিরুদ্ধে দমনমূলক ভূমিকা হ্রাস করা এবং ‘সিভিক-মিলিটারি-পুলিশ ইউনিয়ন’-এ নিজেদের আধিপত্য কমানো।
রদ্রিগেজের পাশে থাকা: কারণ ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের একমাত্র কার্যকর সেতু তিনিই।
এই পরিবর্তনগুলো মানে হবে—সেনাবাহিনী রদ্রিগেজ ও ট্রাম্পের মধ্যে হওয়া সমঝোতার নিশ্চয়তা দেবে এবং মাদুরো-পরবর্তী সময়ে দেশের স্থিতিশীলতা রক্ষায় মুখ্য ভূমিকা নেবে। ইতিহাসে যুক্তরাষ্ট্র বহুবারই এমন সামরিক-নির্ভর ব্যবস্থার ওপর ভর করেছে—মিশর, পাকিস্তান, থাইল্যান্ডসহ নানা দেশে।
শেষ কথা
ভেনেজুয়েলার সেনাবাহিনীর সামনে বিকল্প খুব কম। পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে না নিলে এবং ট্রাম্প ও রদ্রিগেজের সঙ্গে কাজ না করলে নতুন মার্কিন সামরিক হামলার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। আর তা হলে সেনাবাহিনী ও বর্তমান রাজনৈতিক নেতৃত্বের বিশ্বাসযোগ্যতা চূড়ান্তভাবে ভেঙে পড়বে—যার ফল হবে আরও গভীর রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা।
আল-জাজিরা অবলম্বনে