
বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ‘সেলফ-মেড’ নারী রাফায়েলা আপোন্ত-দিয়ামান্ত। ২০২৬ সালেও ৩৭.৭ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ নিয়ে তিনি রয়েছেন আলোচনার তুঙ্গে। তবে তার এই আকাশচুম্বী সাফল্যের পেছনে রয়েছে একটি রোমান্টিক এবং নাটকীয় শুরু। ইতালির নীল সমুদ্রে এক ফেরি ভ্রমণ থেকে শুরু হওয়া সেই পরিচয় আজ বিশ্ব অর্থনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করছে।
যেভাবে শুরু সেই রূপকথা
১৯৬৯ সাল। ইতালির নেপলস থেকে পর্যটন দ্বীপ ক্যাপ্রির দিকে যাচ্ছিল একটি ফেরি। সেই ফেরির ক্যাপ্টেন ছিলেন তরুণ ইতালীয় জানলুইজি আপোন্ত। অন্যদিকে যাত্রী হিসেবে সেই ফেরিতে ছিলেন সুইজারল্যান্ডের এক ধনাঢ্য ব্যাংকারের মেয়ে রাফায়েলা দিয়ামান্ত। জানলুইজির ব্যক্তিত্ব আর সমুদ্রের প্রতি অগাধ ভালোবাসা দেখে মুগ্ধ হন রাফায়েলা। সেই আলাপ থেকেই শুরু হয় তাদের প্রেম। জানলুইজির স্বপ্ন ছিল নিজের একটি জাহাজ থাকবে, আর রাফায়েলা সেই স্বপ্নে বিশ্বাস করেছিলেন। বিয়ের পর তারা দুজনে মিলে ১৯৭০ সালে মাত্র ২ লক্ষ ডলার ঋণ নিয়ে একটি পুরনো জার্মান কার্গো জাহাজ ‘এমভি প্যাট্রিসিয়া’ কেনেন। আর এভাবেই জন্ম হয় ‘মেডিটেরিয়ান শিপিং কোম্পানি’ (MSC)-এর।
বিজনেস সাম্রাজ্য
এমএসসি কেবল একটি শিপিং কোম্পানি নয়, বরং এটি বর্তমানে একটি মাল্টি-বিলিয়ন ডলারের বহুমুখী ব্যবসায়িক গ্রুপ। এমএসসি কন্টেইনার শিপিং (MSC Cargo) তাদের মূল ব্যবসা। বর্তমানে এটি বিশ্বের বৃহত্তম কন্টেইনার শিপিং লাইন। সারা বিশ্বে পণ্য পরিবহনের একটি বিশাল অংশ তাদের নিয়ন্ত্রণে। বর্তমানে তাদের বহরে ৯০০-এর বেশি বিশালাকার জাহাজ রয়েছে। তাদের এমএসসি ক্রুজ (MSC Cruises) পণ্য পরিবহনের বাইরে বিলাসবহুল পর্যটনের বাজারেও তারা অপ্রতিদ্বন্দ্বী। এটি বর্তমানে বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম ক্রুজ ব্র্যান্ড। মজার ব্যাপার হলো, প্রতিটি ক্রুজ শিপের রাজকীয় অভ্যন্তরীণ সাজসজ্জা এবং ডিজাইন রাফায়েলা নিজেই সরাসরি তদারকি করেন। এছাড়াও বিশ্বের বিভিন্ন বড় বন্দরে তাদের নিজস্ব কন্টেইনার টার্মিনাল বা বন্দর ব্যবস্থাপনা ব্যবসা রয়েছে। এর ফলে জাহাজ থেকে পণ্য খালাস ও লোডিংয়ের পুরো প্রক্রিয়াটি তারা নিজেরাই নিয়ন্ত্রণ করে থাকেন। সমুদ্রের পর স্থলেও তাদের আধিপত্য কম নয়। ‘মেডলগ’ (Medlog)-এর মাধ্যমে তারা ট্রাক, ট্রেন এবং নিজস্ব গুদামের সাহায্যে ডোর-টু-ডোর লজিস্টিক সেবা প্রদান করে। গত কয়েক বছরে তারা ইউরোপের বিভিন্ন রেলওয়ে প্রজেক্টেও বড় বিনিয়োগ করেছে।
সাফল্যের নেপথ্যে রাফায়েলা
রাফায়েলা কেবল একজন মালিক নন, তিনি এই সাম্রাজ্যের প্রধান কুশলী। জানলুইজি যখন সমুদ্রের অপারেশনাল এবং কারিগরি দিকগুলো দেখতেন, রাফায়েলা তখন সামলেছেন ব্যাংকিং ও অর্থায়নের জটিল সব হিসাব। পরিবারের ব্যবসাটি শেয়ার বাজারে না ছেড়ে ১০০ শতাংশ মালিকানা নিজেদের কাছে রাখাই ছিল তাদের সবচেয়ে বড় কৌশল। এর ফলে তারা যেকোনো সিদ্ধান্ত দ্রুত ও স্বাধীনভাবে নিতে পারেন।
৮০ বছর বয়সী রাফায়েলা এবং তার স্বামী এখন জেনেভায় বসবাস করেন। প্রচারবিমুখ এই দম্পতি নিজেদের ব্যক্তিগত জীবন আড়ালে রাখতেই পছন্দ করেন। বর্তমানে তাদের দুই সন্তানও ব্যবসার হাল ধরেছেন। ছেলে দিয়েগো কোম্পানির প্রেসিডেন্ট এবং মেয়ে আলেকসা সিএফও (CFO) হিসেবে কাজ করছেন।
রাফায়েলা আপোন্তের জীবন আমাদের শেখায় যে, সঠিক অংশীদার এবং দূরদর্শী পরিকল্পনা থাকলে শূন্য থেকে শুরু করেও বিশ্ব জয় করা সম্ভব। সমুদ্রের সেই ফেরি ক্যাপ্টেন আর ব্যাংকারের মেয়েটি আজ কেবল কোটিপতি নন বরং বিশ্ব বাণিজ্যের এক জীবন্ত কিংবদন্তি।