
ভারতের করপোরেট জগতে এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের নাম সাবিত্রী জিন্দাল। কোনো প্রথাগত ব্যবসায়িক শিক্ষা বা উচ্চতর ডিগ্রি ছাড়াই তিনি আজ ভারতের সবচেয়ে ধনী নারী এবং জিন্দাল গ্রুপ নামক বিশাল এক শিল্প সাম্রাজ্যের অভিভাবক। ২০২৬ সালের বর্তমান তথ্য অনুযায়ী, তাঁর ও তাঁর পরিবারের নিট সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩৫.৫ বিলিয়ন ডলারে।
ঘোমটার আড়াল থেকে বোর্ডরুমের শীর্ষে
সাবিত্রী জিন্দালের উঠে আসার গল্পটা সাধারণ আর দশটা নারীর মতো ছিল না। তিনি দীর্ঘ সময় নিজেকে ঘরকন্না এবং ৯ সন্তানের জননী হিসেবেই পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন। ১৯৫০ সালে আসামের তিনসুকিয়ায় জন্ম নেওয়া এই নারী কখনোই ভাবেননি যে তাঁকে একদিন ভারতের অন্যতম বৃহত্তম শিল্প গোষ্ঠী সামলাতে হবে। কিন্তু ২০০৫ সালে এক মর্মান্তিক হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় তাঁর স্বামী ও জিন্দাল গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা ওম প্রকাশ জিন্দাল মারা যান। স্বামীর মৃত্যুতে শোকাতুর সাবিত্রী জিন্দালের সামনে তখন দুটি পথ খোলা ছিল হয় পিছিয়ে যাওয়া নয়তো স্বামীর রেখে যাওয়া স্বপ্নকে আগলে রাখা। তিনি দ্বিতীয় পথটিই বেছে নেন।

ব্যবসায়িক সাম্রাজ্যের ব্যাপ্তি ও কর্মজীবন
স্বামীর মৃত্যুর পর ৫৫ বছর বয়সে যখন তিনি জিন্দাল গ্রুপের হাল ধরেন, তখন অনেকের মনেই প্রশ্ন ছিল তিনি কি পারবেন? কিন্তু সাবিত্রী জিন্দাল প্রমাণ করেছেন নেতৃত্বের জন্য সংকল্পই যথেষ্ট। তাঁর সুযোগ্য নেতৃত্বে জিন্দাল গ্রুপ আজ স্টিল (ইস্পাত), বিদ্যুৎ, সিমেন্ট এবং অবকাঠামো খাতে এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। জিন্দাল স্টিল অ্যান্ড পাওয়ার (JSPL) এবং জেএসডব্লিউ স্টিল (JSW Steel) আজ ভারতের অর্থনীতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। বর্তমানে তাঁর নয় সন্তানের মধ্যে চারজন-সজ্জন জিন্দাল, নবীন জিন্দাল, রতন জিন্দাল ও পৃথ্বীরাজ জিন্দাল এই বিশাল ব্যবসার বিভিন্ন শাখা অত্যন্ত দক্ষতার সাথে পরিচালনা করছেন, যেখানে সাবিত্রী জিন্দাল কাজ করছেন প্রধান অভিভাবক বা ‘ম্যাট্রিয়ার্ক’ হিসেবে।
রাজনীতি ও জনসেবা
সাবিত্রী জিন্দাল কেবল ব্যবসাই নয়, রাজনীতির মাঠেও নিজের শক্ত অবস্থান তৈরি করেছেন। তিনি হরিয়ানা বিধানসভার সদস্য এবং মন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁর জনসেবামূলক কাজের পরিধিও বিশাল। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে তিনি নিয়মিত বড় অংকের অনুদান দিয়ে থাকেন, যা তাঁর স্বামীর আদর্শেরই এক প্রতিফলন।
সাফল্যের স্বীকৃতি ও বর্তমান অবস্থান
বর্তমানে ৭৫ বছর বয়সেও সাবিত্রী জিন্দাল ভারতের ধনী তালিকায় নিজের অবস্থান সুসংহত রেখেছেন। তিনি ভারতের শীর্ষ ধনী নারী হওয়ার পাশাপাশি এশিয়ার অন্যতম প্রভাবশালী নারী হিসেবে স্বীকৃত। আধুনিক ভারতের শিল্পায়নে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। তিনি প্রমাণ করেছেন যে ধৈর্য, আত্মবিশ্বাস এবং পারিবারিক মূল্যবোধকে পুঁজি করে যে কোনো চ্যালেঞ্জ জয় করা সম্ভব।
সাবিত্রী জিন্দাল কেবল ভারতের শীর্ষ ধনী নারীই নন, তিনি ধৈর্য এবং পারিবারিক ঐক্যের এক অনন্য প্রতীক। একজন সাধারণ গৃহবধূ থেকে পরিস্থিতির প্রয়োজনে ইস্পাত কঠিন সংকল্প নিয়ে তিনি যেভাবে স্বামীর রেখে যাওয়া বিশাল শিল্প সাম্রাজ্যকে সাফল্যের শিখরে নিয়ে গেছেন, তা সারা বিশ্বের নারীদের জন্য অনুপ্রেরণাদায়ক। আজ ৭৫ বছর বয়সেও তিনি প্রমাণ করে চলেছেন যে, সঠিক নেতৃত্ব এবং মূল্যবোধ থাকলে যে কোনো প্রতিকূলতাকে জয় করে ইতিহাসের পাতায় নাম লেখানো সম্ভব।
বাংলা টেলিগ্রাফ আন্তর্জাতিক উদ্যোক্তার গল্প