
যেখানে সাগরের গর্জন আর পাহাড়ের মিতালী মিলেমিশে একাকার, সেই চট্টগ্রামের সরকারি কলোনির স্নিগ্ধ ছায়ায় কেটেছে এক কিশোরীর স্বপ্নিল শৈশব। সেই দিনগুলোতে তাঁর দুচোখ জুড়ে ছিল মায়ের হাতের জাদুর মতো সব কারুকাজ।
মা যখন রান্না করতেন, বাবা মুগ্ধ হয়ে বলতেন – এ তো কেবল রান্না নয়, এ যেন এক অসামান্য শিল্প। সেই শিল্পমনা মায়ের আঙুল ছুঁয়েই কিশোরী তাহমিনা শিখেছিলেন সুঁই-সুতার নিপুণ টান, কুশিকাটার সূক্ষ্ম বুনন আর বাঁশ-মাটির সোঁদা গন্ধে মাখা সৃষ্টির উল্লাস। উলের কাজ থেকে শুরু করে কাটিং-সেলাই, সবখানেই ছিল মায়ের সেই শৈল্পিক হাতের ছোঁয়া, যা অজান্তেই তাহমিনার ব্যক্তিত্ব ও ভবিষ্যৎ জীবনের ভিত্তি গড়ে দিচ্ছিল।


শিক্ষাজীবনের পুরোটা সময় চট্টগ্রামে কাটানোর পাশাপাশি তাহমিনা নিজেকে সমৃদ্ধ করেছেন ব্লক-বাটিক ও ন্যাচারাল ডাইয়ের পাঠ নিয়ে। শৈশব থেকে দেখা সেই শিল্পের প্রতি অনুরাগ থেকেই ১৯৯৮ সালে তাহমিনার মা শুরু করেছিলেন ‘পিন্ধন’ নামে একটি উদ্যোগ। বড় ভাইয়ের দেওয়া এই চমৎকার নামটি ৪-৫ বছর বেশ সফলভাবেই চলেছিল। তবে সেই সময় তাহমিনা নিজেকে গড়ছিলেন অন্য এক লক্ষে।
পড়াশোনার পাঠ চুকিয়ে তিনি সরাসরি প্রবেশ করেন করপোরেট জগতে। চট্টগ্রামের নামকরা ক্লিফটন এবং কেডিএস-এর মতো বড় গ্রুপে সেলস ও মার্চেন্ডাইজিং বিভাগে উচ্চপদে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। বিয়ের পর ঢাকায় এসেও টেক্সটাইল ও বাইং রিলেটেড নামী প্রতিষ্ঠানে তাঁর পেশাদার জীবনের জয়যাত্রা অব্যাহত ছিল। কিন্তু করপোরেট জগতের এই সফলতার মাঝেও তাহমিনার অবচেতনে রয়ে গিয়েছিল মায়ের সেই ‘পিন্ধন’-এর স্বপ্ন।

দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময়ের পেশাগত অভিজ্ঞতাকে পুঁজি করে ২০১৮ সালে তাহমিনা চৌধুরী মাত্র ১ লাখ টাকা প্রাথমিক মূলধন নিয়ে নতুন করে প্রাণ দেন মায়ের সেই পুরনো ব্র্যান্ডকে। অনলাইনের বিশাল ক্যানভাসে ‘Pindhan-পিন্ধন’ যাত্রা শুরু করে জামদানি আর পাঞ্জাবি নিয়ে। শুরুতে চাকরির পাশাপাশি চালাচ্ছিলেন পিন্ধনের কাজ। এরমাঝে পুরো পৃথিবী থমকে যায় করোনার থাবায়। কিন্তু তাহমিনার দীর্ঘদিনের মার্চেন্ডাইজিং অভিজ্ঞতা আর অদম্য জেদ তাঁকে দমে যেতে দেয়নি। লকডাউনের বদ্ধ সময়ে এক বান্ধবীর সন্তানদের জন্য পোশাক তৈরির অনুরোধ তাঁর সামনে খুলে দেয় এক নতুন দিগন্ত।
২০২০-২১ সালের সেই কঠিন সময়ে বেবি ড্রেস তৈরি করে তিনি মাসে এক লাখ টাকার উপরে বিক্রয় লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করেন, যা ছিল তাঁর বিজনেসের টার্নিং পয়েন্ট। বর্তমানে তাঁর প্রতিষ্ঠানে মাসিক উৎপাদন ও বিক্রয় গড়ে ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকার ঘরে।
আজকের ‘পিন্ধন’ কেবল একটি সফল বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান নয়, এটি এক শৈল্পিক আন্দোলন। তাহমিনা চৌধুরী তাঁর প্রতিটি পোশাকে প্রাধান্য দেন ন্যাচারাল ডাই, প্রাকৃতিক ব্লক প্রিন্ট এবং কাদা মাটির ব্লকের মতো পরিবেশবান্ধব কাজকে। বিষমুক্ত পৃথিবী গড়তে তাঁর এই ‘ইকো-ফ্রেন্ডলি’ উদ্যোগ এখন প্রবাসী বাংলাদেশীদের হাত ধরে পৌঁছে যাচ্ছে হংকং, কানাডা আর আমেরিকার মতো দূর দেশে।

সুবিধাবঞ্চিত কর্মীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে তাহমিনা আজ সমাজের এক সার্থক অনুপ্রেরণা। নামকরা ডিজাইনারদের সান্নিধ্য আর গ্রাহকদের গভীর বিশ্বাসই তাঁর গত সাত বছরের পথচলার শক্তি। আগামীর স্বপ্নে তিনি দেখেন এমন এক পৃথিবী, যেখানে প্রতিটি সুতোর বুননে টিকে থাকবে দেশীয় ঐতিহ্য আর সুরক্ষিত থাকবে আমাদের প্রকৃতি।
স্বপ্ন যখন উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া শিল্পের সাথে মিলে যায়, তখন প্রতিটি প্রতিকূলতাই হয়ে ওঠে এক একটি নতুন দিগন্ত। তাহমিনা চৌধুরী আজ কেবল একজন উদ্যোক্তা নন, তিনি হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যের এক সার্থক কাণ্ডারি।
বাংলা টেলিগ্রাফ উদ্যোগের গল্প