
নবম জাতীয় বেতন কমিশন নির্ধারিত সময়ের প্রায় তিন সপ্তাহ আগেই আজ বুধবার প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে তাদের প্রতিবেদন পেশ করেছে। ২৩ সদস্যবিশিষ্ট এই কমিশন কমিশনপ্রধান জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বে বিকেলে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করে।
প্রতিবেদন জমা দেওয়ার সময় উপস্থিত ছিলেন অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ, প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী আনিসুজ্জামান চৌধুরী, অর্থ সচিব খায়রুজ্জামান মজুমদারসহ কমিশনের সব পূর্ণকালীন ও খণ্ডকালীন সদস্যরা।
সরকার গত ২৭ জুলাই ২০২৫ তারিখে ২৩ সদস্যবিশিষ্ট নবম জাতীয় বেতন কমিশন গঠন করে এবং ছয় মাসের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের সময়সীমা নির্ধারণ করে। ২০১৩ সালে অষ্টম বেতন কমিশন গঠনের পর দীর্ঘ ১২ বছর পর এই কমিশন গঠিত হয়। কমিশনের প্রতিবেদন জমা দেওয়ার শেষ তারিখ ছিল ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬।
জানা গেছে, কমিশন তাদের জন্য বরাদ্দকৃত বাজেটের মাত্র ১৮ শতাংশ ব্যয় করে প্রতিবেদন প্রস্তুত করেছে। প্রতিবেদন গ্রহণ করে প্রধান উপদেষ্টা সন্তোষ প্রকাশ করেন এবং কমিশনের সদস্যদের ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, “এটি একটি মস্ত বড় কাজ। মানুষ বহুদিন ধরে এর জন্য অপেক্ষা করছে। আউটলাইন দেখে বুঝলাম, এটি খুবই সৃজনশীল কাজ হয়েছে।”
এ সময় কমিশনপ্রধান জাকির আহমেদ খান বলেন, গত এক দশকে বৈশ্বিক ও জাতীয় পর্যায়ে অর্থনীতির প্রায় সব সূচকে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। বিশেষ করে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বহুগুণ বেড়েছে। সময়োপযোগী বেতন কাঠামো না থাকায় সরকারি কর্মচারীদের জীবনযাত্রার ব্যয় নির্বাহ ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়েছে। এ প্রেক্ষাপটে সুস্পষ্ট কার্যপরিধি নির্ধারণ করে বিদ্যমান বেতন, ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা পর্যালোচনা এবং প্রয়োজনীয় সুপারিশ প্রণয়ন করা হয়েছে।
তিনি জানান, কমিশন নির্ধারিত কার্যপরিধি অনুসরণ করে সময়োপযোগী ও বাস্তবসম্মত সুপারিশ তৈরির লক্ষ্যে অনলাইন ও অফলাইনে ১৮৪টি সভা করেছে এবং ২ হাজার ৫৫২ জন অংশীজনের মতামত ও প্রস্তাব গ্রহণ করেছে। পাশাপাশি বিভিন্ন সমিতি ও অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করে ব্যাপক মতবিনিময় করা হয়।
কমিশনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব ছিল প্রস্তাবিত বেতন কাঠামো বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় আর্থিক সংস্থান নির্ধারণ ও এর বাস্তবায়নযোগ্যতা পর্যালোচনা করা। প্রতিবেদন দাখিলকালে অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, এই প্রস্তাব বাস্তবায়নই এখন সরকারের পরবর্তী বড় কাজ। এ লক্ষ্যে একটি কমিটি গঠন করা হবে, যারা বাস্তবায়ন পদ্ধতি নিয়ে কাজ করবে।

প্রতিবেদনে সরকারি কর্মচারীদের জন্য ২০টি বেতন স্কেলের সুপারিশ করা হয়েছে। সর্বনিম্ন বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। কমিশনপ্রধান জানান, এসব প্রস্তাব বাস্তবায়নে প্রয়োজন হবে প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা। বর্তমানে ১৪ লাখ সরকারি কর্মচারী ও ৯ লাখ পেনশনভোগীর জন্য সরকারের ব্যয় হচ্ছে ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা।
প্রতিবেদনে আরও যেসব নতুন প্রস্তাব রাখা হয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে— সরকারি কর্মচারীদের জন্য স্বাস্থ্যবীমা চালু, পেনশন ব্যবস্থার সংস্কার, সরকারি কর্মচারী কল্যাণ বোর্ড পুনর্গঠন, সার্ভিস কমিশন গঠন, বেতন গ্রেড ও স্কেলের যৌক্তিক পুনর্বিন্যাস, ভাতা পর্যালোচনার জন্য কমিটি গঠন এবং স্বাস্থ্য ও শিক্ষাখাতে মানবসম্পদ উন্নয়ন।
এ ছাড়া কোনো কর্মচারীর প্রতিবন্ধী সন্তান থাকলে মাসিক ২ হাজার টাকা ভাতা দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে, সর্বোচ্চ দুই সন্তানের জন্য এই সুবিধা প্রযোজ্য হবে। টিফিন ভাতার বর্তমান বিধান বহাল রাখার পাশাপাশি ১১তম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের মাসিক টিফিন ভাতা ২০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ হাজার টাকা করার প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে।
সরকারি কর্মচারীদের জীবনমান উন্নয়ন ও সময়োপযোগী বেতন কাঠামো প্রণয়নে নবম বেতন কমিশনের এই প্রতিবেদনকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।