
ফাইল ছবি
বাংলাদেশি শ্রমিকদের প্রবাস যাত্রার শুরু প্রায়ই একটি শব্দের সঙ্গে জড়িত—ঋণ। জমি বন্ধক, সুদে টাকা, এনজিও ঋণ, আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে ধার—সব মিলিয়ে বিদেশ যাত্রা অনেকের কাছে স্বপ্ন নয়, বরং এক ধরনের বাধ্যতামূলক বাজি। এই বাজিতে জিতলে পরিবার বদলে যায়, হারলে শুরু হয় দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ও সামাজিক দাসত্বের মতো জীবন।
কেন ঋণ নিয়ে বিদেশ যেতে হয়?: রাষ্ট্রীয়ভাবে বলা হয়, বিদেশে যাত্রার খরচ ৪-৬ লাখ টাকা। বাস্তবে এটি অনেক ক্ষেত্রে মধ্যপ্রাচ্যে ৬-১০ লাখ, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ৭-১২ লাখ এবং ইউরোপ বা ল্যাটিন রুটে ১৫-৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত পৌঁছায়। এই বিপুল অর্থের যোগান আসে মূলত ঋণ থেকেই। ব্যাংকিং সাপোর্ট সীমিত, সরকারি স্বল্পসুদী ঋণ অপ্রতুল এবং রিক্রুটিং বাজার পুরোপুরি বেসরকারি ও অনিয়ন্ত্রিত—ফলে বিদেশযাত্রার আগে একজন শ্রমিক হয়ে যান ঋণগ্রস্ত অভিবাসী।
প্রবাস জীবনের ওপর ঋণের প্রভাব: ঋণ প্রবাস জীবনের চরিত্র বদলে দেয়। এটি শ্রমিককে সময়ের বিরুদ্ধে দৌড়াতে বাধ্য করে, শোষণ সহ্য করতে হয় এবং ঝুঁকি নিতে হয়। অনেক প্রবাসী বলেন, “কাজ খারাপ হলেও ছাড়তে পারিনি, কারণ দেশে ঋণ অপেক্ষা করছিল।” ঋণগ্রস্ত শ্রমিকদের জন্য কম বেতন, অতিরিক্ত কাজ এবং চুক্তিভঙ্গেও প্রতিবাদের অভাব সহজ শোষণের সুযোগ সৃষ্টি করে।
কাজ না পাওয়া বা বেতন না পাওয়া: সবাই কাজ পান না। ভিসা থাকলেও কাজ নেই বা বেতন নেই। কোম্পানি বন্ধ হলে শ্রমিক রাস্তায় পড়েন। ঋণ শোধ তো দূরের কথা, প্রতিদিনের খাবার জোটানোই চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। প্রবাস জীবন তখন অর্থনৈতিক ও মানসিক ফাঁদে পরিণত হয়।
রেমিট্যান্সের অদৃশ্য সত্য: জাতীয় পরিসংখ্যানে রেমিট্যান্স একটি গৌরবের গল্প। কিন্তু এর পেছনে লুকিয়ে থাকে বছরের পর বছর ঋণ শোধ, পরিবারের ওপর চাপ এবং সন্তানের শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে ক্ষতি। প্রথম ২-৩ বছরে প্রবাসী রেমিট্যান্স পাঠান না, বরং ঋণের টাকা পাঠাতেই ব্যস্ত থাকেন।
রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা: বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সমস্যা ব্যক্তিগত নয়, কাঠামোগত। রিক্রুটিং খরচের লাগাম নেই, প্রবাসী কল্যাণ ঋণ সীমিত ও জটিল, তথ্যের অভাব ও ভুল প্রলোভন—ফলে বিদেশযাত্রা হয়ে ওঠে উচ্চঝুঁকির বিনিয়োগ।
সামাজিক চাপের প্রভাব: অনেকে বিদেশ যান “পাশের বাড়ির ছেলে গেছে” বা “না গেলে লজ্জা”—এ ধরনের সামাজিক চাপ মানুষকে ঝুঁকিপূর্ণ জুয়ার দিকে ঠেলে দেয়।
সমাধানের পথ: ঋণভিত্তিক প্রবাস কমাতে হলে সরকার-টু-সরকার (G2G) চুক্তি সম্প্রসারণ, স্কিলভিত্তিক অভিবাসন, স্বচ্ছ ব্যয় নির্ধারণ এবং প্রাক-বিদেশ প্রশিক্ষণ ও তথ্যসেবা বাধ্যতামূলক করতে হবে। ফেরত প্রবাসীদের অভিজ্ঞতাও নীতিতে অন্তর্ভুক্ত করা দরকার।
শেষ কথা: ঋণ করে বিদেশ যাওয়া ব্যর্থতা নয়। কিন্তু এটিকে একমাত্র পথ বানিয়ে ফেলা ভয়ঙ্কর। তখন মানুষ নয়, ঋণটাই বিদেশ যায়। রাষ্ট্র যদি প্রবাসীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে আন্তরিক হয়, তবে নিশ্চিত করতে হবে—প্রবাস জীবন হবে সুযোগ, জুয়া নয়।