
বিকেলের ম্লান আলোয় জানালার গ্রিল ধরে একাকী বসে আছেন বাড়ির জ্যেষ্ঠ সদস্য। স্মৃতিরা হয়তো তাকে নিয়ে গেছে সত্তর দশকের কোনো চেনা গলিতে, কিংবা মুক্তিযুদ্ধের সেই হারানো দিনগুলোর ডায়েরিতে। ঠিক সেই মুহূর্তে পাশের সোফায় বসে আছে তার নাতি, প্রজন্মের আধুনিক প্রতিনিধি ‘জেন-জি’। তার চোখ জোড়া স্মার্টফোনের নীল আলোয় উজ্জ্বল, আঙুলগুলো দ্রুত চলছে টিকটক বা রিলসের জাদুকরী স্ক্রলে। একই ঘরে দুজন মানুষ, একই বাতাসের ঘ্রাণ; অথচ মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে এক বিশাল অদৃশ্য দেয়াল। এই দেয়াল ইটের নয় বরং ডিজিটাল স্ক্রিন আর নীরবতার প্রলেপে তৈরি এক অদ্ভুত ব্যবধান।
একটা সময় ছিল যখন সন্ধ্যার আজানের পর বাড়ির বড়রা গোল হয়ে বসতেন। রূপকথা নয় বরং জীবন থেকে নেওয়া হাজারো গল্পের ডালপালা মেলত সেই আসরগুলোতে। সাইলেন্ট জেনারেশনের (জন্ম ১৯২৫-১৯৪৫) সেই প্রবীণ মানুষগুলোর অভিজ্ঞতার ঝুলিই ছিল পরবর্তী প্রজন্মের জন্য পরম জ্ঞান।

কিন্তু আজকের ডিজিটাল যুগে তথ্যের সমুদ্র যখন হাতের মুঠোয়, তখন জেন-জি (১৯৯৭-২০১২) প্রজন্মের কাছে সেই জীবন্ত গল্পের বইগুলো বড় বেশি উপেক্ষিত। গুগল যেখানে নিমিষেই উত্তর দেয়, সেখানে বড়দের দীর্ঘ আলাপকে তাদের কাছে মনে হয় একঘেয়ে ‘লেকচার’।
এই আধুনিক প্রযুক্তির ভিড়ে বাড়ির প্রবীণরা যেন ধীরে ধীরে নিজ ঘরেই পরবাসী হয়ে পড়ছেন। তারা দেখতে পান, তাদের প্রিয় নাতি-নাতনিরা ভার্চুয়াল জগতের হাজারো অচেনা মানুষের সাথে হাসছে, কথা বলছে, এমনকি আবেগ ভাগাভাগি করছে; অথচ পাশের চেয়ারে বসে থাকা মানুষটির চোখের পানি বা নিঃসঙ্গতা তাদের নজরে আসছে না।
স্মার্টফোন এখানে কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয় বরং হয়ে দাঁড়িয়েছে এক অলঙ্ঘনীয় দেয়াল। এই ডিজিটাল গ্যাপ বয়স্কদের মনে জন্ম দিচ্ছে এক গভীর অবসাদ, তারা নিজেদের ভাবছেন অপ্রাসঙ্গিক।
সেতুবন্ধন হবে কীভাবে?
তবে এই দেয়াল ভেঙে আবার প্রাণের জোয়ার ফেরানো কি অসম্ভব? মোটেও না। প্রয়োজন কেবল একটু মায়া আর সময়ের ইনভেস্টমেন্ট। প্রযুক্তির সেই স্মার্টফোনটিই হতে পারে মিলনের সেতু। এই ডিজিটাল দেয়াল ভেঙে আবার প্রাণের স্পন্দন ফেরাতে প্রয়োজন দ্বিমুখী প্রচেষ্টা:


স্মার্টফোন যেন আমাদের জীবনের চালক না হয়ে কেবল একটি মাধ্যম হিসেবেই থাকে। প্রযুক্তির অগ্রযাত্রায় আমরা যেন ভুলে না যাই যে, মানুষের হৃদয়ের স্পন্দন কোনো সফটওয়্যার বা অ্যালগরিদম দিয়ে প্রতিস্থাপন করা সম্ভব নয়। সাইলেন্ট জেনারেশনের অভিজ্ঞতার আলো আর জেন-জির আধুনিকতার তেজ যখন একত্রিত হবে, তখনই ঘরগুলো আবার হয়ে উঠবে সত্যিকারের আবাসস্থল। স্মার্টফোন যখন দেয়াল না হয়ে সেতুবন্ধন হবে, তখনই সার্থক হবে আমাদের ডিজিটাল জীবন।
বাংলা টেলিগ্রাফ উদ্যোগের গল্প