
ঘর থেকে বের হওয়ার পর মনে হলো দরজায় তালা দেওয়া হয়নি। বারবার ফিরে গিয়ে তালা পরীক্ষা করা। কিংবা হাত ধোয়ার পরও মনে হওয়া জীবাণু যায়নি -এই যে চক্রাকার দুশ্চিন্তা এবং তা থেকে মুক্তি পেতে বারবার একই কাজ করা, চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একেই বলা হয় ওসিডি (Obsessive-Compulsive Disorder)। আমাদের সমাজে এটি ‘শুচিবায়ু’ নামে পরিচিত হলেও এর গভীরতা অনেক বেশি। মজার ব্যাপার হলো, যার এই অসুখ, তিনি নিজেকে অসুস্থ ভাবেন না; বরং তিনি ভাবেন বাকি দুনিয়াটাই বড্ড নোংরা আর অগোছালো।
ওসিডি আসলে কী?
ওসিডির দুটি প্রধান অংশ থাকে:
১. অবসেশন (Obsession): মনে অনিচ্ছাসত্ত্বেও বারবার ফিরে আসা কিছু নেতিবাচক চিন্তা বা আতঙ্ক (যেমন: নোংরা হওয়ার ভয় বা কোনো অমঙ্গলের আশঙ্কা)।
২. কম্পালশন (Compulsion): সেই দুশ্চিন্তা থেকে সাময়িক মুক্তি পেতে বারবার একই কাজ করা (যেমন: বারবার হাত ধোয়া বা গোনা)।

যখন ‘আমিই ঠিক’ এক মস্ত ভুল
ওসিডিতে আক্রান্ত মানুষটি মনে করেন, বারবার হাত ধোয়া বা গোছানোটিই স্বাভাবিক। পাশের মানুষটি যখন বিরক্তি নিয়ে তাকায়, তিনি অবাক হন। এই যে নিজের কাজকে ‘রোগ’ হিসেবে না দেখা, একে বলা হয় ‘ইগো-সিনটোনিক’ অবস্থা। তিনি এটাকে তাঁর ব্যক্তিত্বের অংশ মনে করেন। কিন্তু দিনের শেষে দেখা যায়, এই নিখুঁত হওয়ার নেশায় তাঁর জীবনটা হয়ে যাচ্ছে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা এক জট পাকানো সুতো।
ওসিডির প্রধান লক্ষণসমূহ
ওসিডি একেকজনের ক্ষেত্রে একেকভাবে প্রকাশ পেতে পারে। তবে সাধারণ কিছু লক্ষণ হলো:
নিজের লাগাম নিজের হাতে নিয়ন্ত্রণ
যদি মাঝেমধ্যে আপনারও মনে হয়, সবাই কেন অগোছালো আর আপনিই কেন বড্ড পরিপাটি, তবে নিচের ‘ম্যাজিক’গুলো ট্রাই করতে পারেন:
১. চিন্তাকে চ্যালেঞ্জ করা: যখনই কোনো নেতিবাচক চিন্তা আসবে, নিজেকে মনে করিয়ে দিন “এটি আমার চিন্তা নয়, এটি ওসিডির লক্ষণ।” ভয়কে প্রশ্রয় না দিয়ে তার মুখোমুখি হওয়ার চেষ্টা করুন। মন বলছে হাত ধুতে? একটু জেদ করে হাত না ধুয়ে বসে থাকুন। প্রথম ৫ মিনিট খুব অস্বস্তি হবে, ঘাম হবে। কিন্তু ১০ মিনিট পর দেখবেন মন অন্য কিছু ভাবছে। নিজের মনের অবাধ্য হওয়াই এই রোগের সেরা দাওয়াই।
২. ‘নিখুঁত’ হওয়ার ছুটি: মাঝে মাঝে ইচ্ছা করে ঘরটা একটু অগোছালো রাখুন। একজোড়া জুতো উল্টো করে ফেলে রাখুন। নিজের মনকে শেখান পৃথিবীটা একটু অগোছালো থাকলেও আকাশ ভেঙে পড়ে না।
৩. বন্ধু বানান ডায়েরিকে: যখনই কোনো আজগুবি চিন্তা আসবে, সেটা লিখে ফেলুন। পরে ঠান্ডা মাথায় পড়লে নিজেই হেসে বলবেন, “ধুর! আমি কীসব ভাবি!”
৪. রুটিন মাফিক চলা: পর্যাপ্ত ঘুম, সুষম খাবার এবং নিয়মিত ব্যায়াম মানসিক চাপ কমিয়ে মস্তিষ্কের রাসায়নিক ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে।
৫. মনোযোগ ডাইভার্ট করা: তীব্র অস্থিরতা বোধ হলে বাগান করা, গান শোনা বা কোনো শখের কাজে নিজেকে ব্যস্ত রাখুন।

কেমন হওয়া উচিত সহমর্মিতা?
আপনার প্রিয় মানুষটি যদি ওসিডির জালে বন্দি থাকেন, তবে তাকে শাসন নয়, আলিঙ্গন দিন। কীভাবে?
পরিস্থিতি অতিরিক্ত হলে করণীয়
ঘরোয়া টোটকা বা ডায়েরি লেখায় যখন কাজ হয় না, যখন জীবনটা কেবল সাবান আর তালার ভেতরেই আটকে যায় -তখন বুঝতে হবে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। সঠিক থেরাপি আর সামান্য ওষুধ আপনার মস্তিষ্কের সেই অবাধ্য তারগুলোকে আবার সুর দিতে পারে।
১. মনোরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ: ওসিডির চিকিৎসায় সাধারণত সেরোটোনিন লেভেল ঠিক করার জন্য ওষুধের প্রয়োজন হয়। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো ওষুধ বন্ধ বা শুরু করবেন না।
২. কগনিটিভ বিহেভিয়ারাল থেরাপি (CBT): ওসিডির জন্য ‘এক্সপোজার অ্যান্ড রেসপন্স প্রিভেনশন’ (ERP) নামক থেরাপি অত্যন্ত কার্যকর। এটি রোগীকে ভয়ের মুখোমুখি হতে এবং কম্পালশন ছাড়া থাকতে শেখায়।
যিনি নিখুঁতের নেশায় বুঁদ, তাঁর কাছে জীবন মানেই একটি জ্যামিতিক নকশা। কিন্তু মনে রাখা প্রয়োজন, জীবন কোনো ড্রয়িং খাতা নয় যে প্রতিটা রেখা স্কেল দিয়ে মেপে টানতে হবে। প্রকৃতির দিকে তাকালে দেখা যায়, সবচেয়ে সুন্দর ফুলটির পাপড়িগুলোও কিন্তু একদম হুবহু সমান নয়। অগোছালো মেঘের পাহাড়েই গোধূলির রং সবচেয়ে ভালো খোলে।
তাই দিনশেষে সাবানের ফেনা বা তালার হিসেব কিংবা বইয়ের নিখুঁত সারিতে নিজেকে বন্দি না করে, একটু ‘ভুল’ করার সাহস সঞ্চয় করাই আসল মুক্তি। মনের জটগুলো যখন আলগা হতে শুরু করবে, তখন দেখবেন সবকিছু নিখুঁত না হয়েও জীবনটা আসলে বেশ চমৎকার কাটছে। নিখুঁত হওয়ার লড়াইটা ছেড়ে দিয়ে বরং ‘মানুষ’ হওয়ার আনন্দে বাঁচাই হোক ওসিডির প্রকৃত বিকল্প।
বাংলা টেলিগ্রাফ উদ্যোগের গল্প