
ফাইল ছবি
বাংলাদেশের সরকারি দেশি ও বিদেশি ঋণের পরিমাণ প্রথমবারের মতো প্রায় ২৪ লাখ কোটি টাকার মাইলফলক স্পর্শ করেছে, যা দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের ওপর তীব্র চাপ তৈরি করছে। বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের মোট ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৩ লাখ ৯৪ হাজার ৭১০ কোটি টাকায়।
এর মধ্যে বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ প্রায় ১৩ লাখ ৬৭ হাজার ৮৬৪ কোটি টাকা এবং অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে নেওয়া ঋণের পরিমাণ ১০ লাখ ২৬ হাজার ৮৪৬ কোটি টাকা। গত পাঁচ বছরে এই ঋণের প্রবৃদ্ধি অত্যন্ত দ্রুতগতিতে হয়েছে, যেখানে কেবল বৈদেশিক ঋণই বেড়েছে প্রায় ৪৬ শতাংশ।
ঋণের এই বৃদ্ধি দেশের বড় অবকাঠামো প্রকল্পগুলোর ব্যয়ের সঙ্গে যুক্ত। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, এমআরটি লাইন-৬, পদ্মা সেতু রেল সংযোগ, কর্ণফুলী টানেল ও হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালসহ একাধিক প্রকল্প বাস্তবায়নের কারণে বৈদেশিক ঋণ বেড়েছে।
ঋণের পরিমাণ বাড়ার পাশাপাশি পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ঋণের সুদ পরিশোধের ব্যয়। গত অর্থবছরে সরকারকে সুদ বাবদ ১ লাখ ৩২ হাজার ৪৬০ কোটি টাকা ব্যয় করতে হয়েছে, যা এক বছরের ব্যবধানে ১৭ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে বৈদেশিক ঋণের সুদ পরিশোধের পরিমাণ বেড়েছে ২১ শতাংশ এবং অভ্যন্তরীণ ঋণের ক্ষেত্রে তা ১৬ শতাংশ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বড় বড় মেগা প্রকল্পে প্রত্যাশিত আয় না হওয়া এবং রাজস্ব আহরণে স্থবিরতার কারণেই ঋণের ওপর এই অতিরিক্ত নির্ভরতা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে পদ্মা রেল সেতুর মতো প্রকল্প থেকে যে পরিমাণ আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল, বাস্তব চিত্র তার ধারেকাছেও না থাকায় ঋণের দায় এখন অর্থনীতির জন্য গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ইতিমধ্যে বাংলাদেশের এই অর্থনৈতিক পরিস্থিতিকে ‘মধ্যম ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। আইএমএফ-এর মতে, রপ্তানি আয় ও রাজস্ব আদায়ের তুলনায় ঋণ পরিশোধের হার ক্রমাগত বেড়ে চলায় বাংলাদেশের নতুন ঋণ নেওয়ার সক্ষমতা সংকুচিত হয়ে আসছে। বর্তমানে বাংলাদেশের ঋণ-রপ্তানি অনুপাত আইএমএফ-এর নির্ধারিত সুরক্ষাসীমা ছাড়িয়ে গেছে, যা ভবিষ্যতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে। বর্তমানে পাইপলাইনে থাকা প্রায় ৪৪ বিলিয়ন ডলারের বেশি ঋণ প্রকল্প বাস্তবায়নের সাথে সাথে অবমুক্ত হবে, যার ফলে আগামী ২-৩ বছরের মধ্যে বার্ষিক ঋণ পরিশোধের পরিমাণ ৫ থেকে ৬ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, গত ১৫ বছরে নেওয়া ঋণের একটি বড় অংশই ব্যয় হয়েছে এমন সব অবকাঠামোতে, যা থেকে দ্রুত আর্থিক সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। রাজস্ব আহরণ ত্বরান্বিত না করলে এবং রপ্তানি আয়ের খাতগুলো সম্প্রসারণ করতে না পারলে এই বিশাল ঋণের কিস্তি পরিশোধ করা দীর্ঘমেয়াদে অসম্ভব হয়ে পড়তে পারে।
বিশেষ করে অন্তর্বর্তী সরকার পাইপলাইনে থাকা অনেক প্রকল্প পুনর্বিবেচনা করলেও পূর্ববর্তী ঋণের দায় ও বড় প্রকল্পের কিস্তি মেটাতে গিয়ে বাজেটের একটি বড় অংশই এখন সুদ খাতে ব্যয় করতে হচ্ছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে ঋণের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা এবং অনুৎপাদনশীল খাতে ব্যয় কমানোর কোনো বিকল্প নেই বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।