
কারাগারের করিডর রাতের দিকে অন্যরকম নীরব হয়। আলো থাকে, কিন্তু আলোতে কোনো উষ্ণতা থাকে না। লোহার দরজার ফাঁকে ফাঁকে একটা নির্লিপ্ত শীতলতা—যেন সবকিছুই নিয়মের মধ্যে চলছে, অথচ নিয়মের মধ্যেই কোথাও একটা ফাঁক।
২০১৯ সালের সেই রাতেও ঠিক এমনই হওয়ার কথা ছিল। জেফ্রি এপস্টেইন তখন সাধারণ কোনো কয়েদি নন— তিনি এমন একজন বন্দি, যার বেঁচে থাকা বা না থাকা বহু মানুষের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে পারে।
আর ঠিক তখনই— তিনি মারা গেলেন। সরকারি ভাষ্য: আত্মহত্যা। জনতার প্রশ্ন: ‘আসলেই কি তাই?’
এপস্টেইন মারা গেছেন—এটা সত্য। কিন্তু তার মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে যে প্রশ্নগুলো বেঁচে গেল, সেগুলোই এপস্টেইনকে একজন অপরাধী থেকে একটা রহস্য বানিয়ে দিল। কারণ এপস্টেইন কেসের আসল গল্প যৌন অপরাধের মতো সরল না। এটা ক্ষমতার গল্প। আর ক্ষমতা যখন অপরাধ করে, তখন অপরাধের চেয়েও বড় হয়ে ওঠে সত্যকে নিয়ন্ত্রণ করার কৌশল।
এপস্টেইন রহস্যের সবচেয়ে অস্বস্তিকর দিক হলো— আপনি যা জানেন, তার অনেকটাই সত্যি হতে পারে, কিন্তু সেটাই হয়তো পুরো সত্য নয়। বরং সত্যকে এমনভাবে সাজানো হয়েছে, যেন আপনি জানেন বলে মনে হয়, অথচ আপনি আসলে ঠিক জায়গায় পৌঁছাতে পারছেন না।
২০০৮: যেখানে সত্য বিচারের আগেই থেমে গিয়েছিল
এপস্টেইন কাহিনির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ২০১৯ নয়—২০০৮। কারণ ওই বছরই এপস্টেইনের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও তিনি এমন এক ‘প্লি ডিল’ পেয়ে যান, যা সাধারণ মানুষের কাছে অবিশ্বাস্য। কম বয়সী মেয়েদের যৌন শোষণ, টাকা দিয়ে মুখ বন্ধ করা, একাধিক ভিকটিম—এসব অভিযোগের পরও এপস্টেইন কঠোর ফেডারেল চার্জ এড়াতে পারেন এবং তার অপরাধ তুলনামূলক হালকা শাস্তির দিকে চলে যায়।
এখানে ব্যাপারটা কেবল ‘ভালো আইনজীবী’ থাকার নয়। আমেরিকার মতো দেশে আইনজীবী অনেকেরই থাকে। কিন্তু এপস্টেইনের ক্ষেত্রে যে জিনিসটা কাজ করেছে, সেটা হলো এলিট ইমিউনিটি—অর্থাৎ ক্ষমতাবানদের জন্য আইনটা অনেক সময় নরম হয়ে যায়, আর নরম হওয়ার জন্য আইনকে খুব বেশি ভাঙতেও হয় না। কেবল কিছু দরজা খোলা থাকলেই হয়।
আর সবচেয়ে তিক্ত সত্য— ভিকটিমরা বহু সময়ই জানত না, তাদের ন্যায্যতার জায়গাটা কোথায় হারিয়ে গেল। কারণ সত্যের একটা অংশ তখনই ম্যানেজ করা হয়ে গেছে।
এপস্টেইনকে নিয়ে জনতার চোখে যে রহস্য— তা আসলে এখান থেকেই শুরু। মানুষ ভাবে: এত বড় অপরাধ করে কেউ কীভাবে বেঁচে যায়?
উত্তরটা সোজা: তিনি একা ছিলেন না। তিনি ছিলেন একটা সিস্টেমের ভেতরে—যে সিস্টেম কিছু মানুষকে রক্ষা করে, কারণ তাদের পতন মানে অন্য অনেকের পতন।

মিডিয়ার নীরবতা: সত্যকে চাপা নয়, ধীরে ধীরে ঘুম পাড়ানো
এপস্টেইন কেসে মিডিয়ার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে বারবার। কারণ এপস্টেইনের গল্প হঠাৎ একদিন জন্ম নেয়নি। নিউইয়র্ক আর ফ্লোরিডার এলিট সার্কেলে বহু বছর ধরে এই লোককে নিয়ে কানাঘুষা ছিল। গুজব ছিল। অস্বস্তিকর কথাও ছিল। কিন্তু সব গুজব খবর হয় না। আর সব খবরও প্রকাশিত হয় না।
মিডিয়া চুপই থাকে—এমনটা না। মিডিয়া অনেক সময় কথা বলে। কিন্তু এমনভাবে বলে, যেন আসল কথাটা বলা না হয়। এই কৌশলকে বলে truth management। সত্যকে হত্যা নয়—সত্যকে নিয়ন্ত্রণ।
এটা বাস্তবে কীভাবে কাজ করে? খুব সহজ। স্টোরি বের হতে হতে থেমে যায়। স্টোরি ভেরিফাই করতে করতে সময় চলে যায়। স্টোরি নরম ভাষায় লেখা হয়, যাতে আঘাত কম লাগে।কিছু নাম বাদ পড়ে। কিছু অংশ ‘সেফ’ করে দেওয়া হয়। আর সময় যখন যায়, আগ্রহ যখন কমে, তখন সত্যকে আর কেউ তাড়া করে না।
মিডিয়া কেন এটা করে? কারণ এপস্টেইনের মতো লোকদের বিরুদ্ধে লিখতে গেলে ভয় থাকে—মানহানির মামলা, দীর্ঘ আইনি যুদ্ধ, প্রভাবশালী মহলের চাপ, বিজ্ঞাপনদাতার অসন্তোষ আর গেটকিপিং।
এপস্টেইন কেস তাই মিডিয়ার জন্য একটা আয়না—যেখানে দেখা যায়, সত্য কেবল তথ্যের বিষয় না; সত্য অনেক সময় ক্ষমতা কাঠামোর সঙ্গে দরকষাকষির বিষয়।
এপস্টেইনের ‘ইমেজ ম্যানেজমেন্ট’: অপরাধের ওপর মখমলের চাদর
এপস্টেইনকে মানুষ শুধু অপরাধী হিসেবে দেখেনি। বহু বছর ধরে তাকে দেখা হয়েছে— একজন দাতা হিসেবে, বিজ্ঞানপ্রেমী হিসেবে, বড় বড় বুদ্ধিজীবীদের বন্ধু হিসেবে।
এটা কাকতালীয় নয়। এটা পরিকল্পিত। কারণ সমাজে আপনি যদি ‘দাগি’ হন, তাহলে পুলিশ আপনার দিকে তাকায়। কিন্তু আপনি যদি ‘প্রেস্টিজ’ হন, তাহলে মানুষ আপনার দিকে তাকাতে ভয় পায়। এপস্টেইন এই মনস্তত্ত্ব খুব ভালো বুঝেছিল। সে এমন একটা ইমেজ বানিয়েছিল, যেখানে তার চারপাশে ‘সম্মানিত’ মানুষের আনাগোনা থাকবে, দানের গল্প থাকবে, জাঁকজমকের অনুষ্ঠান থাকবে।
এভাবে অপরাধকে ঢেকে ফেলা হয় না—এভাবে অপরাধকে অবিশ্বাস্য বানিয়ে ফেলা হয়।যখন কোনো ভিকটিম বলে, ‘এই লোকটা আমার সঙ্গে এটা করেছে’—তখন সমাজের একাংশ ভাবে-অসম্ভব! এত বড় মানুষ!
এটা এপস্টেইনের সবচেয়ে ভয়ংকর শক্তি ছিল। টাকা নয়—বিশ্বাসযোগ্যতার ভান। এই ভানটাই ছিল তার আসল নিরাপত্তা।
২০১৯- এর মৃত্যু: প্রমাণ নেই, কিন্তু সন্দেহটা কেন থামে না?
এপস্টেইনের মৃত্যু একটা ঘটনা নয়—এটা একটা বিস্ফোরণ। সরকার বলল আত্মহত্যা। কিন্তু মানুষ মানতে পারল না। কারণ এপস্টেইন ছিলেন এমন একজন বন্দি—যার মামলা চললে আরও অনেক নাম সামনে আসতে পারত। তার বেঁচে থাকা মানে সাক্ষ্য, তথ্য, আদালত—আর তার মৃত্যু মানে সবকিছু হঠাৎ থেমে যাওয়া।
আর তারপর একে একে বের হতে থাকে নানা অস্বস্তিকর তথ্য—ক্যামেরা নষ্ট, গার্ডদের অবহেলা, নিয়ম ভাঙা। এগুলো সবই হয়তো মানবিক ভুল হতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই ভুলগুলো কার লাভ করল?
এটাই রহস্যের জ্বালানি। কারণ এখানে নিশ্চিত প্রমাণ না থাকলেও, একটা বাস্তবতা খুব পরিষ্কার: এপস্টেইন বেঁচে থাকলে অনেকেই অস্বস্তিতে থাকত। এপস্টেইন মারা যাওয়ায় অনেকেই স্বস্তি পেল। এটাই মানুষকে সন্দেহপ্রবণ করে তোলে।
এপস্টেইন কেস তাই আদালতের কেস না—এটা মানুষের বিশ্বাসের কেস। মানুষ জানে, ক্ষমতার ইতিহাসে অস্বাভাবিক ঘটনা মানে অনেক সময় ‘পরিকল্পিত ঘটনা’।

‘এপস্টেইন মডেল’ এখনো বেঁচে আছে
এপস্টেইনকে ঘিরে যে কৌতূহল, সেটা আসলে গসিপ নয়—এটা ভয়। মানুষ ভয় পায়, কারণ এই কেস দেখায়—কিছু মানুষ এমন আছে, যারা অপরাধ করেও শাস্তি এড়াতে পারে। কারণ তাদের হাতে শুধু টাকা নেই; তাদের হাতে আছে সত্যকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা।
এপস্টেইন মারা গেছেন। কিন্তু যে নেটওয়ার্ক তাকে সুযোগ দিয়েছিল, যে কাঠামো তাকে ঢাল দিয়েছিল, যে নীরবতা তাকে সময় দিয়েছিল—সেগুলো তো মরেনি। এই কারণেই ‘এপস্টেইন রহস্য’ আসলে এক ব্যক্তির রহস্য নয়। এটা একটা যুগের রহস্য—যেখানে সত্য প্রকাশিত হয় ঠিকই, কিন্তু এমনভাবে- যেন সত্যের প্রকাশ কারো ধ্বংসের কারণ না হয়।
তাই প্রশ্নটা আবার ফিরে আসে—এপস্টেইন সম্পর্কে যা জানেন, সবই কি ভুল?
না, সবই ভুল না। কিন্তু অনেকটাই অসম্পূর্ণ। আর অসম্পূর্ণ সত্যই হলো ক্ষমতা কাঠামোর টিকে থাকার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার।
বাংলা টেলিগ্রাফ উদ্যোগের গল্প