১৯৪৫ সাল, ব্রিটিশ শাসিত ইজরায়েলের তেল আবিবে যখন মিরিয়াম ফার্বস্টেইনের জন্ম হয়, তখন চারদিকে কেবল যুদ্ধের হাহাকার। পোল্যান্ড থেকে আসা তাঁর বাবা-মা ছিলেন হলোকাস্টের বিভীষিকা থেকে কোনোমতে প্রাণে বেঁচে যাওয়া দুই লড়াকু মানুষ। অভাবের সাথে বন্ধুত্ব করে বড় হওয়া মিরিয়ামের শৈশব কেটেছে হাইফা শহরে। ছোটবেলা থেকেই মেধার বিচ্ছুরণে তিনি ছিলেন অনন্য। হাইফার ‘রিয়ালি স্কুল’ থেকে পড়াশোনা শেষে ইজরায়েলি সেনাবাহিনীতে বাধ্যতামূলক কাজ শেষ করে তিনি নাম লেখান চিকিৎসা বিজ্ঞানে।
স্বপ্নভঙ্গ ও সংগ্রামের শুরু
৭০-এর দশকের শুরুর দিকে মিরিয়ামের বিয়ে হয় ইজরায়েলি চিকিৎসক আরিয়েল অ্যারিসনের সঙ্গে। দুই চিকিৎসকের ঘর বাঁধার স্বপ্নটা শুরুর দিকে রঙিন থাকলেও সময়ের সাথে সাথে তাঁদের চিন্তাধারা ও জীবনের লক্ষ্যের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হতে থাকে। ৮০-র দশকের মাঝামাঝি সময়ে এসে সেই ঘর ভেঙে যায়। বিচ্ছেদের তিক্ত স্বাদ নিয়ে দুই কন্যাসন্তানকে বুকে জড়িয়ে ধরেন মিরিয়াম। বিচ্ছেদের সেই কঠিন সময়ে একদিকে সন্তানদের ভবিষ্যৎ, অন্যদিকে নিজের ক্যারিয়ার-এই দুইয়ের চাপে তিনি এক মানসিক ও আর্থিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে ছিলেন।
আমেরিকায় পাড়ি ও এক ‘সিঙ্গেল মা’র লড়াই
বিচ্ছেদের ক্ষত ভুলে ১৯৮৬ সালে মিরিয়াম ইজরায়েল ছেড়ে পাড়ি জমান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। নিউইয়র্কের রকফেলার বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি গবেষক হিসেবে যোগ দেন। পরদেশে একজন একক মা (Single Mother) হিসেবে দুই সন্তানকে বড় করা মোটেও সহজ ছিল না। দিনের বেলা ল্যাবরেটরিতে মাদকাসক্তি নিরাময় নিয়ে কঠিন গবেষণা আর রাতে সন্তানদের আগলে রাখা – এই রুটিনেই কাটছিল তাঁর জীবন। তিনি তখন জানতেন না, ল্যাবরেটরির এই নির্জনতা তাঁকে এক বিশাল সাম্রাজ্যের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।
ঐতিহাসিক ‘ব্লাইন্ড ডেট’
আমেরিকায় আসার দুই বছর পর, ১৯৮৮ সালে মিরিয়ামের এক বন্ধু তাঁকে জেদ করে এক ‘ব্লাইন্ড ডেটে’ পাঠান। সেই ডেটেই তাঁর জীবনে মেঘ না চাইতেই বৃষ্টির মতো দেখা হয় শেলডন অ্যাডেলসনের। শেলডন তখন ক্যাসিনো ব্যবসায় নামার স্বপ্ন বুনছেন। শেলডন মিরিয়ামের তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তা দেখে মুগ্ধ হন আর মিরিয়াম খুঁজে পান এমন এক আশ্রয়, যিনি তাঁর সংগ্রামকে সম্মান করতে জানেন। ১৯৯১ সালে তাঁরা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। ভেনিসে কাটানো তাঁদের সেই মধুচন্দ্রিমার স্মৃতি থেকেই পরে জন্ম নেয় আজকের আইকনিক ‘ভেনিসিয়ান’ রিসোর্ট।

সাম্রাজ্যের উত্থান ও ৩২.১ বিলিয়ন ডলারের রহস্য
শেলডন ব্যবসার মস্তিষ্ক হলেও মিরিয়াম ছিলেন তাঁর প্রেরণা এবং প্রধান উপদেষ্টা। ১৯৮৯ সালে লাস ভেগাস স্যান্ডস প্রতিষ্ঠার পর থেকে তাঁরা একে একে জয় করেন ম্যাকাও এবং সিঙ্গাপুরের বাজার। মিরিয়ামের বিজ্ঞানমনস্ক বুদ্ধি শেলডনকে বড় বড় ব্যবসায়িক ঝুঁকি নিতে সাহায্য করত। ২০২১ সালে শেলডনের প্রস্থানে যখন সবাই ভেবেছিল সাম্রাজ্য থমকে যাবে, তখন মিরিয়াম শক্ত হাতে হাল ধরেন। বর্তমানে তিনি ও তাঁর পরিবার লাস ভেগাস স্যান্ডস-এর অর্ধেকের বেশি শেয়ারের মালিক, যা তাঁকে বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ধনী নারীতে পরিণত করেছে।
সাফল্যের শিখরে দাঁড়িয়ে মানবতার জয়গান
আজ ৭৯ বছর বয়সেও মিরিয়াম ক্লান্তিহীন। একদিকে তিনি ক্যাসিনো সাম্রাজ্য পরিচালনা করছেন, অন্যদিকে কয়েক বিলিয়ন ডলার ব্যয় করছেন নিজের গড়া ‘অ্যাডেলসন ক্লিনিক’ ও চিকিৎসা গবেষণায়। রাজনৈতিক অঙ্গনেও তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রিপাবলিকান পার্টির (GOP) অন্যতম শীর্ষ দাতা। ২০১৮ সালে তাঁর এই বিশাল অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি লাভ করেন ‘প্রেসিডেন্সিয়াল মেডেল অফ ফ্রিডম’।
মিরিয়াম অ্যাডেলসন কেবল একজন ধনকুবের নন, তিনি একাধারে গবেষক, চিকিৎসক, সফল জননী এবং এক অদম্য সম্রাজ্ঞী। শরণার্থী থেকে শুরু করে বিশ্বের প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব হওয়া-তাঁর প্রতিটি পদক্ষেপই এক একটি মহাকাব্য।
বাংলা টেলিগ্রাফ ভিজুয়াল