আজ ফাল্গুনের প্রথম দিন। কুয়াশার চাদর সরিয়ে মিষ্টি রোদের আভায় প্রকৃতিতে আজ রঙের উৎসব। গাছে গাছে শিমুল-পলাশের রক্তিম আভা আর বাতাসের হিল্লোলে ভেসে আসা কোকিলের কুহুতান জানান দিচ্ছে- ঋতুরাজ এসেছে। কিন্তু আজকের এই সকালটি অন্য সব সকালের চেয়ে আলাদা। আজ শুধু প্রকৃতির নবজন্ম নয়, আজ হৃদয়ের গহীনে লাল গোলাপের স্পন্দনও সমানতালে বাজছে। বাসন্তী রঙের শাড়ির আঁচলে আজ লেপ্টে আছে ভালোবাসার চিরন্তন লাল আভা।
ইতিহাস কী বলে?
বাঙালির এই বসন্ত বরণ উৎসবের ইতিহাস প্রায় সাড়ে চারশ বছরের পুরনো। ১৫৮৫ খ্রিষ্টাব্দে মোগল সম্রাট আকবর যখন বাংলা সনের প্রবর্তন করেন, তখন তিনি বছরজুড়ে ১৪টি উৎসবের প্রচলন করেছিলেন। তার মধ্যে অন্যতম এবং প্রধান উৎসব ছিল এই ‘বসন্ত উৎসব’। তখন থেকেই এই বাংলায় ঋতুরাজকে বরণ করার এক রাজকীয় রেওয়াজ শুরু হয়। মূলত কর আদায় ও নওরোজ (নতুন দিন) উদযাপনের অংশ হিসেবেই এই উৎসব বাংলার জনজীবনে মিশে যায়।
পরবর্তীতে বিংশ শতাব্দীর শুরুতে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শান্তিনিকেতনে এই উৎসবকে নতুন এক নান্দনিক রূপ দান করেন। আর নব্বইয়ের দশকের শুরুতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা থেকে এই উৎসব এক সর্বজনীন রূপ পায়।
যেভাবে বদলে গেল পঞ্জিকা
এক সময় বাঙালির ক্যালেন্ডারে এই দুটি দিন আসত আলাদা বসনে, আলাদা সাজে। আগে ১৩ ফেব্রুয়ারি পালিত হতো পহেলা ফাল্গুুন, আর তার ঠিক পরদিন ১৪ ফেব্রুয়ারি আসত বিশ্ব ভালোবাসা দিবস। কিন্তু আজ তারা এক দেহ, এক প্রাণ। যেন দীর্ঘ বিরহের পর বসন্ত আর প্রেম আজ একই বিন্দুতে এসে হাত ধরেছে।
এই পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে সময়ের এক সূক্ষ্ম হিসাব আর দেশপ্রেমের এক গভীর যোগসূত্র। দীর্ঘকাল ধরে আমাদের বাংলা পঞ্জিকায় মাসের দিন গণনা নিয়ে কিছুটা জটিলতা ছিল। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল আমাদের ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য দিনগুলোকে নিয়ে। ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি ছিল ৮ই ফাল্গুন। কিন্তু পুরনো ক্যালেন্ডার অনুযায়ী অনেক বছর ২১শে ফেব্রুয়ারি পালিত হতো ৯ই ফাল্গুন কিংবা অন্য তারিখে। আমাদের ঐতিহাসিক দিনগুলো যেন প্রতি বছর একই বাংলা ও ইংরেজি তারিখে পড়ে, সেই লক্ষ্যেই ২০১৯ সালে (১৪২৬ বঙ্গাব্দ) বাংলা একাডেমি এক বিশেষ সংস্কার আনে।
বাংলা একাডেমির সেই সংস্কার অনুযায়ী, বছরের প্রথম ছয় মাস (বৈশাখ থেকে আশ্বিন) এখন ৩১ দিনে গণনা করা হয়। আর পরের ছয় মাস (কার্তিক থেকে চৈত্র) হয় ৩০ দিনে। তবে লিপ-ইয়ার বা অধিবর্ষে ফাল্গুন মাস ২৯ দিনের বদলে ৩০ দিনে পা রাখে। এই বৈজ্ঞানিক হিসাবের রদবদলের কারণেই ২০২০ সাল থেকে পহেলা ফাল্গুন স্থায়ীভাবে ১৩ ফেব্রুয়ারি থেকে সরে এসে ১৪ ফেব্রুয়ারিতে আসন গেড়েছে। ফলে বিশ্ব ভালোবাসা দিবসের লাল রঙের সাথে বসন্তের বাসন্তী রঙ মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে।
আজকের উৎসব তাই দ্বিগুণ। এখন আর কাউকে আলাদা করে গোলাপ কিনতে হয় না, কারণ বসন্তের পলাশ আর শিমুল নিজেই তো ভালোবাসার বিজ্ঞাপন। আজকের তরুণীর খোপায় হলুদ গাঁদার সাথে সগৌরবে স্থান করে নিয়েছে লাল গোলাপ। পাঞ্জাবির বাসন্তী ভাঁজে আজ লুকিয়ে আছে অনুরাগের গল্প।
প্রকৃতি আর প্রেম আজ যেন এক চুক্তিতে সই করেছে। আগে যে ভালোবাসা ছিল একদিনের প্রতীক্ষা, আজ তা বসন্তের প্রথম নিশ্বাসের সাথেই মিশে গেছে। আজকের দিনে রাজপথের যে হলদে সমুদ্র, তাতে মিশে থাকা লাল আভা যেন সাক্ষ্য দিচ্ছে, প্রকৃতির এই নবজাগরণ আর মানুষের হৃদয়ের প্রেম মূলত একই সুতোয় গাঁথা।
বাংলা টেলিগ্রাফ ভিজুয়াল