
এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) সামনে প্রশ্নটি সোজা আবার কঠিনও
বাংলাদেশের রাজনীতিতে আন্দোলন নতুন কিছু নয়। ভাষা আন্দোলন থেকে স্বাধিকার, গণঅভ্যুত্থান থেকে নির্বাচন—রাজপথই বারবার ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়েছে। কিন্তু একটা বিষয় পরিষ্কার; আন্দোলন ক্ষমতার পথ খুলে দেয়, প্রশাসন সেই ক্ষমতার পরীক্ষায় ফেলে। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) সামনে প্রশ্নটি সোজা আবার কঠিনও—রাজপথের শক্তিকে কীভাবে নীতিনিষ্ঠ, জবাবদিহিমূলক এবং কার্যকর প্রশাসনে রূপান্তর করা যায়?
গণআকাঙ্ক্ষা কোথায় দাঁড়িয়ে
বাংলাদেশের নাগরিক আজ যে রাষ্ট্র চায়, তার কয়েকটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য আছে:
১. আইনের শাসন
২. দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন
৩. কর্মসংস্থান
৪. মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ
৫. রাজনৈতিক সহনশীলতা
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী যুব বেকারত্ব একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগ। ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ ক্রমবর্ধমান। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের দুর্নীতি সূচকেও দেশের অবস্থান সন্তোষজনক নয়। অর্থাৎ মানুষের প্রত্যাশা এখন শুধু রাজনৈতিক পরিবর্তন নয়, তারা চায় প্রশাসনিক সংস্কার।
আন্দোলনের রাজনীতি বনাম প্রশাসনের বাস্তবতা
আন্দোলনের ভাষা আবেগপ্রবণ। প্রশাসনের ভাষা হিসাবনির্ভর। রাজপথে স্লোগান চলে, কিন্তু মন্ত্রণালয়ে চলে নীতি, বাজেট, বিধি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো।
বিএনপি অতীতে রাষ্ট্র পরিচালনা করেছে। ১৯৯১ সালে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তনে দলটির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে ১৯৯১–১৯৯৬ এবং ২০০১–২০০৬ সময়কালে গড় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশের কাছাকাছি ছিল।
তবে একই সময়ে প্রশাসনিক দুর্বলতা, রাজনৈতিক সংঘাত এবং দুর্নীতির অভিযোগও ছিল। অতীতের সেই অভিজ্ঞতা আজ শিক্ষায় পরিণত হওয়া উচিত।
প্রধান চ্যালেঞ্জগুলো কী?
১. দলীয়করণমুক্ত প্রশাসন
দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্রযন্ত্রে রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ রয়েছে। একটি নিরপেক্ষ সিভিল সার্ভিস ছাড়া সুশাসন সম্ভব নয়। মেধাভিত্তিক নিয়োগ ও পদোন্নতি নিশ্চিত করা প্রথম কাজ।
২. বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত
রাজনৈতিক মামলার সংস্কৃতি বন্ধ না হলে গণআস্থা ফিরবে না। দ্রুত ও নিরপেক্ষ বিচার ব্যবস্থা গড়তে কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন।
৩. অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ স্থিতিশীল রাখা এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা জরুরি। শুধু রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নয়, নীতির ধারাবাহিকতাও গুরুত্বপূর্ণ।
৪. দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ
দুর্নীতি দমন কমিশনকে প্রকৃত স্বাধীনতা দেওয়া ছাড়া সুশাসনের প্রতিশ্রুতি বিশ্বাসযোগ্য হবে না। ডিজিটাল টেন্ডারিং, সরকারি ব্যয়ের রিয়েল-টাইম অডিট এবং ওপেন ডাটা প্ল্যাটফর্ম চালু করা যেতে পারে।
৫. রাজনৈতিক সহনশীলতা ও সংসদীয় সংস্কৃতি
কার্যকর সংসদ ছাড়া গণতন্ত্র কাগজে থাকে। বিরোধী মতের প্রতি সহনশীলতা, বিতর্কের সুযোগ এবং আইন প্রণয়নে অংশগ্রহণমূলক প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে হবে।
প্রতিশ্রুতি কোথায় দাঁড়ায়
বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান বহুদলীয় গণতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদের কথা বলেছিলেন। বর্তমানে দলটির চেয়ারম্যান ও দেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রায়ই প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের কথা উল্লেখ করেন।
কিন্তু প্রতিশ্রুতি তখনই অর্থবহ, যখন তা নীতিগত রূপরেখায় রূপ নেয়। একটি স্পষ্ট ‘গভর্নেন্স রোডম্যাপ’ প্রয়োজন—
* ১০০ দিনের কর্মপরিকল্পনা
* প্রশাসনিক সংস্কারের সময়সীমা
* দুর্নীতিবিরোধী নীতি
* অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের কৌশল
বিকেন্দ্রীকরণ: বাস্তব সমাধান
কেন্দ্রীভূত ক্ষমতা দীর্ঘমেয়াদে দুর্নীতির ঝুঁকি বাড়ায়। স্থানীয় সরকারকে আর্থিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতা দিলে সেবা মানুষের কাছে পৌঁছায় দ্রুত। উপজেলা ও পৌর পর্যায়ে স্বচ্ছ বাজেট ও সামাজিক অডিট চালু করা গেলে জবাবদিহি বাড়বে।
ডিজিটাল প্রশাসন
ই-গভর্নেন্স শুধু প্রযুক্তি নয়; এটি স্বচ্ছতার হাতিয়ার। অনলাইন সেবা, ডিজিটাল ফাইল ট্র্যাকিং, ই-ট্যাক্স সিস্টেম—এসব বাস্তবায়ন করলে মধ্যস্বত্বভোগী কমবে। এতে দুর্নীতির সুযোগও কমবে।
আস্থা পুনর্গঠনই মূল কাজ
একটা বিষয় স্পষ্ট—মানুষ এখন ক্লান্ত সংঘাতে। তারা স্থিতিশীলতা চায়, নিরাপত্তা চায়, ন্যায়বিচার চায়।
আন্দোলনের শক্তি যদি প্রতিশোধের রাজনীতিতে ব্যবহৃত হয়, তবে রাষ্ট্র দুর্বল হবে। কিন্তু যদি সেই শক্তি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারে ব্যবহৃত হয়, তবে একটি টেকসই রাষ্ট্র কাঠামো গড়ে উঠবে।
বিএনপির সামনে দুটি পথ—
এক, আন্দোলনের ধারাকে বজায় রেখে সংঘাতমুখী রাজনীতি। দুই, সেই আন্দোলনের শক্তিকে প্রশাসনিক দক্ষতায় রূপান্তর করে গণআকাঙ্ক্ষার রাষ্ট্র গঠন। ইতিহাস সাধারণত দ্বিতীয় পথকেই মূল্যায়ন করে।
বাংলাদেশ আজ যে সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, সেখানে শুধু রাজনৈতিক পালাবদল যথেষ্ট নয়। দরকার প্রাতিষ্ঠানিক পুনর্গঠন। আন্দোলন মানুষকে একত্রিত করে। প্রশাসন সেই ঐক্যকে কাঠামো দেয়।
বিএনপির জন্য এ মুহূর্তটি সুযোগ আবার পরীক্ষা-ও। যদি তারা গণআকাঙ্ক্ষাকে নীতি ও প্রতিষ্ঠানে রূপ দিতে পারে, তবে একটি জবাবদিহিমূলক ও কার্যকর রাষ্ট্র গঠনের পথে অগ্রসর হওয়া সম্ভব।
আর যদি আন্দোলনের ভাষাই প্রশাসনের ভাষা হয়ে ওঠে, তবে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন অধরাই থেকে যাবে। রাষ্ট্র গড়ার সময় আবেগ নয়, প্রয়োজন দায়িত্ব। এখন দেখার পালা—প্রতিশ্রুতি কতটা রূপ নেয় বাস্তবে।
ড. শরিফুল ইসলাম দুলু: বিপণন ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ, নীতি পরামর্শক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক। মার্কেটার্স ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ (এমআইবি)-এর সেক্রেটারি জেনারেল এবং মার্কটেল কনসাল্টিং গ্রুপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা
[এই বিভাগের মতামত লেখকের নিজস্ব]