
জনপ্রতি সর্বোচ্চ ২ হাজার ৮০৫ টাকা ও সর্বনিম্ন ১১০ টাকা ফিতরার হার নির্ধারণ করা হয়েছে
দীর্ঘ এক মাস সিয়াম সাধনার পর মুমিন মুসলমানরা যখন ঈদের চাঁদের প্রতীক্ষায় থাকেন, তখন তাঁদের ওপর একটি বিশেষ আর্থিক ইবাদত অর্পিত হয়, যাকে আমরা ‘ফিতরা’ বলে জানি। ইসলামি শরিয়তে এটি কেবল একটি দান নয়, বরং আত্মশুদ্ধি ও সামাজিক দায়বদ্ধতার এক চমৎকার সমন্বয়।
ফিতরা আসলে কী?
‘ফিতর’ শব্দের অর্থ রোজা ভাঙা বা রোজা শেষ করা। রমজান শেষে ঈদুল ফিতর উদ্যাপনের প্রাক্কালে সামর্থ্যবান মুসলমানদের ওপর যে নির্দিষ্ট পরিমাণ দান করা ওয়াজিব বা আবশ্যক করা হয়েছে, তাকেই বলা হয় সাদকাতুল ফিতর। এটি মূলত রমজানের সিয়াম পালনের একটি আনুষঙ্গিক ইবাদত, যা ঈদের নামাজের আগেই আদায় করতে হয়।
কেন এই ফিতরা?
ফিতরা কেন দিতে হয়, এর পেছনে দুটি সুগভীর উদ্দেশ্য রয়েছে যা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হাদিস থেকে স্পষ্টভাবে জানা যায়।
১. রোজার ত্রুটি-বিচ্যুতি সংশোধন (তহুরুন লিস-সায়িম): মানুষ হিসেবে রোজা পালন করতে গিয়ে আমাদের অজান্তেই অনেক সময় অনর্থক কথা, রাগ বা ছোটখাটো ভুল হয়ে যায়। ফিতরা হলো সেইসব ত্রুটির কাফফারা বা ক্ষতিপূরণ। এটি রোজাকে পবিত্র করে আল্লাহর দরবারে কবুল হওয়ার উপযোগী করে তোলে।
ইবনে আব্বাস (রা.) বর্ণনা করেছেন: “রাসুলুল্লাহ (সা.) সদকাতুল ফিতরকে অপরিহার্য করেছেন রোজাদারকে অনর্থক ও অশ্লীল কাজ থেকে পবিত্র করার জন্য।” (আবু দাউদ: ১৬০৯)
২. অভাবী মানুষের অন্নের সংস্থান (তু’মাতান লিল-মাসাকিন): ঈদের দিন যাতে কোনো মুসলিম ভাই বা বোন না খেয়ে না থাকেন এবং অন্যের কাছে হাত পাততে না হয়, সেই সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই ফিতরা প্রবর্তন করা হয়েছে। এর মাধ্যমে ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান ঘুচিয়ে ঈদের আনন্দকে সর্বজনীন করা হয়।
হাদিসে আরও বর্ণিত হয়েছে: “এবং (ফিতরা দেওয়া হয়েছে) অভাবী মানুষের খাবারের ব্যবস্থার জন্য।” (আবু দাউদ: ১৬০৯)
ফিতরা কার ওপর ওয়াজিব?
ফিতরা কেবল অতি ধনীদের জন্য নয়; বরং ঈদের দিন সুবহে সাদিকের সময় যার কাছে নিজের ও পরিবারের নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ বাদে নিসাব পরিমাণ (সাড়ে ৫২ তোলা রুপার সমমূল্য) উদ্বৃত্ত সম্পদ থাকে, তাঁর ওপরই ফিতরা আদায় করা ওয়াজিব। এমনকি পরিবারের শিশু বা নবজাতকের পক্ষ থেকেও অভিভাবককে এই ফিতরা আদায় করতে হয়।
অনেকের মতে, যার সামর্থ্য আছে এবং যে অন্তত নিজের ও পরিবারের জন্য ঈদের দিনের খাবার জোগাড় করতে পারে, তাঁরও ফিতরা দেওয়া উচিত (যদি সে নিসাবের মালিক নাও হয়), যাতে সে নিজেও অভাবীদের তালিকায় না থেকে দাতার তালিকায় নাম লেখাতে পারে। তবে ‘ওয়াজিব’ বা বাধ্যতামূলক হওয়ার শর্ত ওই নিসাবই।
হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) বলেন: “রাসুলুল্লাহ (সা.) গোলাম, স্বাধীন, পুরুষ, নারী, ছোট ও বড়—প্রত্যেক মুসলমানের ওপর ফিতরা ফরজ করেছেন।” (সহিহ বুখারি: ১৫০৩)

আটা, যব, কিশমিশ, খেজুর ও পনির ইত্যাদি পণ্যের যেকোনো একটি দ্বারা ফিতরা আদায় করা যায়
২০২৬ সালে ফিতরার হার ও আদায় পদ্ধতি
চলতি বছরের সাদাকাতুল ফিতরের (ফিতরা) হার নির্ধারণ করেছে ইসলামিক ফাউন্ডেশন। এবার জনপ্রতি সর্বোচ্চ ২ হাজার ৮০৫ টাকা ও সর্বনিম্ন ১১০ টাকা ফিতরার হার নির্ধারণ করা হয়েছে।
ইসলামি শরিয়াহ মতে আটা, যব, কিশমিশ, খেজুর ও পনির ইত্যাদি পণ্যের যেকোনো একটি দ্বারা ফিতরা আদায় করা যায়। গম বা আটা দ্বারা ফিতরা আদায় করলে অর্ধ সা বা ১ কেজি ৬৫০ গ্রাম বা এর বাজার মূল্য ১১০ (একশ দশ) টাকা প্রদান করতে হবে।
যব দ্বারা আদায় করলে এক সা বা ৩ কেজি ৩০০ গ্রাম বা এর বাজার মূল্য ৫৯৫ (পাঁচ শ পঁচানব্বই) টাকা, খেজুর দ্বারা আদায় করলে এক সা বা ৩ কেজি ৩০০ গ্রাম বা এর বাজার মূল্য ২৪৭৫ (দুই হাজার চার শ পঁচাত্তর) টাকা, কিশমিশ দ্বারা আদায় করলে এক সা বা ৩ কেজি ৩০০ গ্রাম বা এর বাজার মূল্য ২৬৪০ (দুই হাজার ছয় শ চল্লিশ) টাকা ও পনির দ্বারা আদায় করলে এক সা বা ৩ কেজি ৩০০ গ্রাম বা এর বাজার মূল্য ২৮০৫ (দুই হাজার আট শ পাঁচ) টাকা ফিতরা প্রদান করতে হবে।
১. কার পক্ষ থেকে আদায় করবেন? পরিবারের প্রধানকে তাঁর নিজের এবং তাঁর ওপর নির্ভরশীল প্রত্যেকের (স্ত্রী, সন্তান, এমনকি ঈদের দিন সুবহে সাদিকের আগে জন্ম নেওয়া নবজাতক) পক্ষ থেকে ফিতরা আদায় করতে হবে। তবে সাবালক সন্তান যদি উপার্জক্ষম হয়, তবে সে নিজের ফিতরা নিজে দিতে পারে।
২. কাদের ফিতরা দেওয়া যাবে? যাদের জাকাত দেওয়া জায়েজ, তাদেরই ফিতরা দেওয়া যাবে। বিশেষ করে দরিদ্র, মিসকিন, ঋণী ব্যক্তি এবং দ্বীনি শিক্ষায় নিয়োজিত অভাবী শিক্ষার্থীদের ফিতরা দেওয়া উত্তম। তবে মনে রাখতে হবে, ফিতরার টাকা দিয়ে মসজিদ বা মাদ্রাসার নির্মাণ কাজ বা উন্নয়নমূলক কাজ করা জায়েজ নয়; এটি সরাসরি মানুষের ব্যক্তিগত প্রয়োজনে ব্যয় করতে হবে।
৩. টাকা নাকি পণ্য? ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, পণ্যের পরিবর্তে সমমূল্যের নগদ টাকা দিয়ে ফিতরা আদায় করা সর্বোত্তম। কারণ বর্তমান যুগে দরিদ্র মানুষের কাছে চাল-আটার চেয়ে নগদ টাকার প্রয়োজন অনেক বেশি থাকে, যা দিয়ে সে ঈদের নতুন কাপড় বা অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে পারে।

পণ্যের পরিবর্তে সমমূল্যের নগদ টাকা দিয়ে ফিতরা আদায় করা সর্বোত্তম
৪. সময়সীমা: ফিতরা ওয়াজিব হয় ঈদের দিন সুবহে সাদিকের সময়। তবে অভাবী মানুষেরা যাতে সেই টাকা দিয়ে কেনাকাটা করে ঈদের আনন্দ করতে পারে, সেজন্য রমজানের শেষ দশকের যেকোনো সময় বা ঈদের দু-একদিন আগেই ফিতরা দিয়ে দেওয়া সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ। তবে কোনো কারণে দেরি হলে ঈদের নামাজের আগেই তা আদায় করতে হবে।
ফিতরা কেবল একটি ধর্মীয় নিয়ম নয়, এটি ইসলামের সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের এক জীবন্ত দলিল। এই দানের মাধ্যমে আমরা যেমন নিজেদের রোজাগুলোকে ত্রুটিমুক্ত করি, তেমনি সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষের মুখে এক চিলতে হাসি ফুটিয়ে তোলার সুযোগ পাই। আপনার ফিতরা যেন কোনো লোকদেখানো বিষয় না হয়ে প্রকৃত অভাবীর ঘরে পৌঁছায় ঈদের প্রাক্কালে এটাই হোক আমাদের অঙ্গীকার।
বাংলা টেলিগ্রাফ উদ্যোগের গল্প