
ইরানের সামনে কী ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি হচ্ছে, তা বিবেচনা করেই তারা সিদ্ধান্ত নেবে
ইয়েমেনের হুথি আন্দোলন শেষ পর্যন্ত তেহরানের পক্ষে যুদ্ধে জড়াতে পারে—এমনটাই মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। তবে ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে চলমান সংঘাত কোন দিকে মোড় নেয়, তার ওপরই নির্ভর করবে হুথিদের অংশগ্রহণের সময় ও মাত্রা।
পর্যবেক্ষকদের মতে, হুথিরা যদি মনে করে তাদের প্রধান সমর্থক ইরান ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ছে বা অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে, তাহলে তারা সামরিকভাবে উত্তেজনা বাড়াতে পারে।
তাদের মতে, হুথিরা এখনো পরিস্থিতি পর্যালোচনা করছে। ইরানের সামনে কী ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি হচ্ছে, তা বিবেচনা করেই তারা সিদ্ধান্ত নেবে। যদি তারা মনে করে ইরানি শাসনব্যবস্থা অস্তিত্বের হুমকিতে, তাহলে পূর্ণমাত্রায় যুদ্ধে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত আসতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলার পর হুথি নেতা আবদুল মালিক আল-হুথির প্রথম ভাষণে তুলনামূলক সংযত সুর লক্ষ্য করা গেছে। সাধারণত তার বক্তব্যে তীব্র ভাষা ব্যবহার করা হলেও এবার তিনি শুধু তেহরানের প্রতি সমর্থন জানিয়ে থেমে যান; সরাসরি সামরিক সহায়তার ঘোষণা দেননি।
ইরান সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির হত্যার খবর দেওয়ার পরও তার বক্তব্য ছিল সংক্ষিপ্ত। তিনি ইরানি জনগণের প্রতি সমবেদনা জানান, তবে সামরিক পদক্ষেপের কোনো প্রতিশ্রুতি দেননি।
হুথিরা নিজেদের তথাকথিত ‘অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স’ বা প্রতিরোধ জোটের অংশ হিসেবে দেখে—যেখানে ইরান-সমর্থিত লেবাননের হিজবুল্লাহ, ফিলিস্তিনের হামাস এবং ইরাকের বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী রয়েছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে বাশার আল-আসাদ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার আগে সিরিয়াও এই জোটের অংশ ছিল।
দীর্ঘদিন ধরেই প্রতিপক্ষরা হুথিদের ইরানের ঘনিষ্ঠ মিত্র বা প্রক্সি হিসেবে বিবেচনা করে। ড্রোন, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও সামরিক পরামর্শসহ তেহরানের সহায়তা হুথিদের সক্ষমতা বাড়িয়েছে বলে ধারণা করা হয়।
ইরানি শাসনব্যবস্থার পতন হলে অস্ত্র সরবরাহ বন্ধ হয়ে যেতে পারে—এমন আশঙ্কা হুথিদের কৌশলগতভাবে সতর্ক করে তুলছে। কারণ ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র তাদের শক্তির বড় ভিত্তি। তা বন্ধ হলে তারা অভ্যন্তরীণ প্রতিদ্বন্দ্বীদের সামনে দুর্বল হয়ে পড়বে।
২০২৩ সালের শেষ দিকে গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান শুরুর পর হুথিরা দ্রুত লোহিত সাগরে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা শুরু করে। পরে তারা ইয়েমেন উপকূল ছাড়িয়ে অন্যান্য সামুদ্রিক রুটেও অভিযান বাড়ায় এবং ইসরায়েলের দিকে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে।
তবে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যৌথ অভিযানের পরপরই সংবাদমাধ্যমে হুথিদের লোহিত সাগরে হামলা পুনরায় শুরুর খবর প্রকাশিত হলেও, পরে সংগঠনটির কর্মকর্তারা তা অস্বীকার করেন। বিশ্লেষকদের মতে, পরস্পরবিরোধী এসব বক্তব্য সংগঠনের ভেতরে মতভেদের ইঙ্গিত দেয়।
কিছু বিশ্লেষক মনে করছেন, ইরানের পক্ষে সরাসরি যুদ্ধে নামা নিয়ে হুথিদের ভেতরে মতবিরোধ চলছে। তার মতে, কঠোরপন্থীরা তাৎক্ষণিক সামরিক সম্পৃক্ততার পক্ষে চাপ দিচ্ছেন, অন্যদিকে একটি অংশ পরিস্থিতি বিবেচনায় সংযম চায়।
কট্টরপন্থীদের চাপ থাকলেও হুথিরা আপাতত কৌশলগতভাবে পদক্ষেপ নিচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, তারা চায় না যে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পরিসরে তাদেরকে শুধু ইরানের স্বার্থে যুদ্ধ করছে—এমনভাবে দেখা হোক।
চ্যাথাম হাউসের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা কর্মসূচির গবেষক ফারিয়া আল-মুসলিমি বলেন, হুথিরা যদি পদক্ষেপ নেয়ও, সেটিকে সম্ভবত ‘আত্মরক্ষা’ হিসেবে উপস্থাপন করবে, সরাসরি ইরানের পক্ষে সংহতি নয়।
একই সঙ্গে তারা যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা হামলার ঝুঁকিও বিবেচনায় রাখছে। গত বছর ইসরায়েলি হামলায় হুথি-নিয়ন্ত্রিত প্রশাসনের প্রধানমন্ত্রী ও কয়েকজন মন্ত্রী নিহত হন। হোদেইদা বন্দরসহ বিভিন্ন অবকাঠামোতে হামলা হয়েছিল, যা সংগঠনটির সামরিক সক্ষমতায় প্রভাব ফেলেছে।
গত এক বছরে বড় ধরনের হামলার ধাক্কা এখনো কাটিয়ে উঠছে হুথিরা। এমন পরিস্থিতিতে নতুন করে পূর্ণমাত্রার সংঘাতে জড়ানো ঝুঁকিপূর্ণ।
তবে দুই দশকের বেশি সময় ধরে যুদ্ধ-পরিবেশে থাকা এই গোষ্ঠী বিশ্লেষকদের হিসাবও ভুল প্রমাণ করতে পারে। সরাসরি হামলার মুখে পড়লে, অথবা ইরান বা হিজবুল্লাহ সংশ্লিষ্ট নেতৃত্ব উদ্যোগ নিলে, হুথিরা দ্রুত যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে পারে।
সর্বোপরি, হুথিদের সিদ্ধান্ত নির্ভর করছে একাধিক কৌশলগত ও রাজনৈতিক বিবেচনার ওপর—ইরানের টিকে থাকা, অভ্যন্তরীণ ঐক্য, আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া এবং নিজেদের সামরিক সক্ষমতার ভারসাম্যের ওপর। আপাতত তারা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে, তবে আঞ্চলিক সংঘাতের গতিপথ বদলালে তাদের অবস্থানও দ্রুত বদলে যেতে পারে।
তথ্যসূত্র: মিডেল ইস্ট আই