
পাঠ্যপুস্তকে ব্যবহৃত ভাষা, উদাহরণ এবং বর্ণনার ভেতর দিয়ে সমাজের বিদ্যমান মূল্যবোধ ও ধারণাগুলো পুনরুৎপাদিত হয়
শিক্ষাকে সাধারণত এমন একটি নিরপেক্ষ প্রক্রিয়া হিসেবে কল্পনা করা হয়, যার মাধ্যমে এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে জ্ঞান স্থানান্তরিত হয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, শিক্ষাব্যবস্থা ও শিক্ষাসামগ্রী কখনোই সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ নয়; এগুলো সমাজের বিদ্যমান আদর্শ, ক্ষমতার সম্পর্ক এবং সাংস্কৃতিক কাঠামোর সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। বিশেষত পাঠ্যপুস্তক কেবল তথ্য প্রদান করে না; বরং এগুলো সামাজিক অর্থ নির্মাণ করে, পরিচয়ের ধারণা গড়ে তোলে এবং সমাজে প্রচলিত প্রত্যাশাগুলোকে সূক্ষ্মভাবে পুনরুৎপাদন করে।
শিশুরা সমাজ সম্পর্কে যে প্রথম দিকের ধারণাগুলো গড়ে তোলে, তার একটি বড় অংশ আসে পাঠ্যপুস্তকের মাধ্যমে। যখন কোনো শিশু একটি বইয়ের পাতায় দেখে যে একজন ডাক্তার রোগীকে বাঁচাচ্ছেন, একজন কৃষক জমিতে কাজ করছেন, অথবা একজন অভিভাবক পরিবারের যত্ন নিচ্ছেন, তখন ধীরে ধীরে তার মনে একটি সামাজিক চিত্র তৈরি হয়—সমাজে কোন ভূমিকা সাধারণত কারা পালন করে। যদি সেই ডাক্তার প্রায়ই পুরুষ হিসেবে উপস্থাপিত হন এবং পরিচর্যার ভূমিকায় নারীদের দেখা যায়, অথবা কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রধান হিসেবে একজন পুরুষ এবং তার অধীনস্থ হিসেবে নারীদের দেখানো হয়, তবে এসব উপস্থাপন নিঃশব্দেই শিশুর মনে লিঙ্গ ও ক্ষমতার একটি নির্দিষ্ট ধারণা গড়ে তোলে।
এই অর্থে পাঠ্যপুস্তক শুধু ভাষা বা ইতিহাস শেখানোর মাধ্যম নয়; বরং এগুলো সামাজিক কল্পনা নির্মাণের একটি শক্তিশালী উপকরণ। পাঠ্যপুস্তকের বর্ণনা, উদাহরণ এবং চরিত্রের উপস্থাপনা শিক্ষার্থীদের মনে সমাজ, পরিচয় এবং লিঙ্গ সম্পর্কে নির্দিষ্ট ধারণা তৈরি করে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) প্রণীত বইগুলো দেশের লক্ষ লক্ষ শিক্ষার্থীর জন্য প্রধান শিক্ষাসামগ্রী। ফলে এগুলো কেবল শিক্ষাদানমূলক উপকরণ নয়; বরং গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক দলিল হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে। এসব পাঠ্যপুস্তকে ব্যবহৃত ভাষা, উদাহরণ এবং বর্ণনার ভেতর দিয়ে সমাজের বিদ্যমান মূল্যবোধ ও ধারণাগুলো পুনরুৎপাদিত হয়।
এই পাঠ্যপুস্তকগুলোর নিগূঢ় বিশ্লেষণে দেখা যায় যে লিঙ্গ উপস্থাপনার ক্ষেত্রে এখনও উল্লেখযোগ্য অসমতা বিদ্যমান। অনেক ক্ষেত্রে পুরুষ ও নারী চরিত্রের উপস্থাপনা প্রচলিত সামাজিক স্টেরিওটাইপের প্রতিফলন ঘটায়। এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—পুরুষ ও নারীর অসম উপস্থিতির পাশাপাশি আরেকটি মৌলিক সমস্যা রয়েছে: বাংলাদেশে তৃতীয় লিঙ্গ হিসেবে সরকারি স্বীকৃতি পাওয়া সত্ত্বেও হিজড়া সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব পাঠ্যপুস্তকে প্রায় সম্পূর্ণ অনুপস্থিত।
ভাষা ও উপস্থাপনা নিয়ে দীর্ঘদিনের গবেষণা দেখিয়েছে যে কোনো সামাজিক কথন বা ডিসকোর্স কখনোই সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ নয়। ভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়; এটি সামাজিক ক্ষমতা ও আদর্শকে গঠন এবং পুনরুৎপাদনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। ভাষাবিদ নরম্যান ফেয়ারক্লাফ তাঁর সমালোচনামূলক ডিসকোর্স বিশ্লেষণ তত্ত্বে দেখিয়েছেন যে ভাষা ব্যবহারের ভেতরেই সামাজিক ক্ষমতার সম্পর্ক এবং আদর্শগত অবস্থান প্রতিফলিত হয়। শিক্ষাসামগ্রীর ভাষা, চরিত্রগুলোর জন্য নির্ধারিত ভূমিকা এবং সামাজিক সম্পর্কের বর্ণনা—এসবই শিক্ষার্থীদের সমাজকে বোঝার দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রভাবিত করে।
যখন কোনো নির্দিষ্ট পরিচয় বা গোষ্ঠী বারবার ক্ষমতার অবস্থানে উপস্থাপিত হয় এবং অন্য কোনো গোষ্ঠী তুলনামূলকভাবে অনুপস্থিত বা প্রান্তিক অবস্থানে থাকে, তখন ধীরে ধীরে সেই উপস্থাপনাগুলো সমাজে স্বাভাবিক বলে মনে হতে শুরু করে। পাঠ্যপুস্তকে পুরুষ ও নারীকে নির্দিষ্ট ভূমিকায় পুনরাবৃত্তভাবে উপস্থাপন করা হলে শিক্ষার্থীদের মানসিক কাঠামোর মধ্যেও সেই ধারণাগুলো স্থায়ী হয়ে যায়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই ধরণগুলো পুরুষত্ব, নারীত্ব এবং কর্তৃত্ব সম্পর্কে সামাজিক প্রত্যাশাকে শক্তিশালী করে।
এনসিটিবি পাঠ্যপুস্তকের একটি পদ্ধতিগত বিশ্লেষণে দেখা যায় যে বর্ণনা, সংলাপ এবং উদাহরণে পুরুষ চরিত্রের উপস্থিতি নারীদের তুলনায় বেশি। অধিকাংশ ক্ষেত্রে পুরুষদের ডাক্তার, প্রকৌশলী, বিজ্ঞানী, রাজনীতিবিদ বা সমাজনেতার মতো পেশায় দেখা যায়। বিপরীতে নারী চরিত্রগুলোকে তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যায় গৃহস্থালির পরিবেশে অথবা সহায়ক ভূমিকায়।
যদিও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পাঠ্যপুস্তকে নারীর উপস্থিতি কিছুটা বেড়েছে, তবুও এই পরিবর্তন এখনও পর্যাপ্ত নয়। অনেক ক্ষেত্রে নারী চরিত্র থাকলেও তাদের ভূমিকা সীমিত এবং তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা বা স্বতন্ত্রতা পুরুষ চরিত্রের তুলনায় কমভাবে উপস্থাপিত হয়।
এই ধরনের উপস্থাপন প্রায়ই সরাসরি চোখে পড়ে না; বরং ভাষার সূক্ষ্ম ব্যবহারের মধ্য দিয়ে প্রকাশ পায়। উদাহরণস্বরূপ, পেশাগত উদাহরণে প্রায়ই পুরুষ সর্বনাম ব্যবহৃত হয়, আর নারী চরিত্রকে দেখা যায় পরিচর্যা, পরিবার বা গৃহস্থালির দায়িত্বের সঙ্গে যুক্ত প্রেক্ষাপটে। এমনকি আপাতদৃষ্টিতে নিরপেক্ষ ব্যাকরণ অনুশীলন বা পাঠ্যাংশও সমাজে কে কোন কাজ করে—সে সম্পর্কে লিঙ্গভিত্তিক ধারণাকে অজান্তেই শক্তিশালী করতে পারে।
এই উপস্থাপনাগুলোর গুরুত্ব অনেক গভীর। শিক্ষাবিষয়ক সমাজবিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে দেখিয়েছেন যে বিদ্যালয় সামাজিকীকরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। শিক্ষার্থীরা পাঠ্যপুস্তকের বর্ণনার সঙ্গে বারবার পরিচিত হওয়ার মাধ্যমে ধীরে ধীরে সমাজ সম্পর্কে নির্দিষ্ট ধারণা গড়ে তোলে। যখন পাঠ্যপুস্তকে পুরুষদের সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী এবং নারীদের সহায়ক হিসেবে দেখানো হয়, তখন তা সমাজে বিদ্যমান লিঙ্গভিত্তিক শ্রেণিবিন্যাসকে পুনরুৎপাদনে ভূমিকা রাখে।
এখানেই আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে আসে—হিজড়া সম্প্রদায়ের প্রায় সম্পূর্ণ অনুপস্থিতি। বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতায় এই সম্প্রদায় দীর্ঘদিন ধরে নানা ধরনের সামাজিক বঞ্চনা ও প্রান্তিকতার মুখোমুখি। অথচ পাঠ্যপুস্তকে তাদের উপস্থিতি প্রায় নেই বললেই চলে। এই অনুপস্থিতি কেবল একটি প্রতিনিধিত্বের ঘাটতি নয়; বরং এটি একটি গভীর সামাজিক সমস্যার ইঙ্গিত দেয়।
পাঠ্যপুস্তকের পৃথক পাঠ বিশ্লেষণ করলে এই ধরণগুলো আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। অনেক পাঠে দেখা যায়—বাবাকে বাড়ির বাইরে কাজ করতে এবং মাকে ঘরের কাজ বা সন্তানের যত্ন নিতে দেখানো হয়েছে। একইভাবে ব্যাকরণ অনুশীলনের উদাহরণগুলোতে কর্তৃত্বপূর্ণ বা বিশেষজ্ঞ অবস্থানে পুরুষ চরিত্র বেশি দেখা যায়।
এই ধরনের বর্ণনাগুলো আলাদাভাবে তেমন গুরুত্বহীন মনে হলেও, বিভিন্ন শ্রেণিতে বারবার পুনরাবৃত্ত হওয়ার ফলে এগুলো একটি শক্তিশালী সাংস্কৃতিক বার্তা তৈরি করে। এর মাধ্যমে এমন একটি ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয় যে জনপরিসরের নেতৃত্ব ও পেশাগত দক্ষতা মূলত পুরুষের বৈশিষ্ট্য, আর পরিচর্যা ও গৃহস্থালি কাজ নারীর দায়িত্ব।
লেখকের পরিচালিত ভাষাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণও এই পর্যবেক্ষণকে সমর্থন করে। এনসিটিবি পাঠ্যপুস্তকের বিভিন্ন বর্ণনা, উদাহরণ এবং প্রাসঙ্গিক ব্যবহারের মধ্যে লিঙ্গ উপস্থাপনার ক্ষেত্রে একটি স্পষ্ট অসমতা লক্ষ্য করা গেছে। পেশাগত ক্ষেত্রে পুরুষ চরিত্রের উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে বেশি, আর নারী চরিত্রকে প্রায়ই পারিবারিক বা সহায়ক প্রেক্ষাপটে দেখা যায়। একই সঙ্গে লিঙ্গ-বৈচিত্র্যময় পরিচয়ের—বিশেষ করে হিজড়া সম্প্রদায়ের—উপস্থিতি প্রায় অনুপস্থিত।
এই ফলাফলগুলো ইঙ্গিত দেয় যে শিক্ষাসামগ্রীর ভাষা ও উপস্থাপনা এখনও মূলত একটি দ্বৈত লিঙ্গ কাঠামোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে, যদিও বৃহত্তর সমাজ ধীরে ধীরে লিঙ্গ বৈচিত্র্যকে স্বীকৃতি দিতে শুরু করেছে।
এই ধরনের উপস্থাপনার প্রভাব শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ আকাঙ্ক্ষার ওপরও পড়তে পারে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে যে শিক্ষাসামগ্রীর প্রতিনিধিত্ব শিক্ষার্থীদের আত্মপরিচয় এবং পেশাগত স্বপ্নকে প্রভাবিত করে। যদি মেয়েরা খুব কম সংখ্যায় নারী নেতৃত্ব বা বৈজ্ঞানিক ভূমিকায় নারীদের দেখতে পায়, তবে তাদের পক্ষে নিজেদের সেই অবস্থানে কল্পনা করা কঠিন হয়ে পড়ে। একইভাবে ছেলেরা যদি বারবার পুরুষ কর্তৃত্বকে জোর দিয়ে এমন বর্ণনার মুখোমুখি হয়, তবে তারা নেতৃত্বকে পুরুষের স্বাভাবিক অধিকার হিসেবে ভাবতে শুরু করতে পারে।
বাংলাদেশের পাঠ্যপুস্তকে প্রতিনিধিত্বের সমস্যা শুধু পুরুষ ও নারীর অসম উপস্থিতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। সবচেয়ে লক্ষণীয় বিষয় হলো—হিজড়া সম্প্রদায়ের প্রায় সম্পূর্ণ অনুপস্থিতি। যদিও ২০১৩ সালে বাংলাদেশ সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে হিজড়াদের তৃতীয় লিঙ্গ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে, তবুও শিক্ষাসামগ্রীতে এখনও মূলত পুরুষ ও নারী—এই দ্বৈত কাঠামোর মধ্যেই আলোচনা সীমাবদ্ধ রয়েছে।
ডিসকোর্স তত্ত্বের দৃষ্টিকোণ থেকে অনুপস্থিতিও একটি শক্তিশালী বার্তা বহন করে। নারীবাদী গবেষক সারা মিলস যুক্তি দিয়েছেন যে ডিসকোর্স কেবল কীভাবে পরিচয় উপস্থাপন করা হবে তা নির্ধারণ করে না; বরং কোন পরিচয়কে সামাজিক স্বীকৃতির যোগ্য বলে বিবেচনা করা হবে তাও নির্ধারণ করে।
এই দৃষ্টিকোণ থেকে পাঠ্যপুস্তকে হিজড়া সম্প্রদায়ের অনুপস্থিতি তাদের প্রতীকী প্রান্তিকতাকেই আরও শক্তিশালী করে। শিক্ষাসামগ্রীর বর্ণনায় তাদের উপস্থিতি না থাকায় তারা সেই প্রতীকী কাঠামোর বাইরে থেকে যায়, যার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা সমাজকে বুঝতে শেখে।
এই সমস্যা সমাধানের জন্য প্রয়োজন সচেতন বিশ্লেষণ এবং প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ। পাঠ্যপুস্তক প্রণয়নের সময় পদ্ধতিগত লিঙ্গ নিরীক্ষা চালু করা একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে। এর মাধ্যমে পুরুষ ও নারীর উপস্থাপনের পরিমাণ, চরিত্রগুলোর ভূমিকার বৈচিত্র্য এবং লিঙ্গ-বৈচিত্র্যময় পরিচয়ের উপস্থিতি বিশ্লেষণ করা সম্ভব হবে।
পাঠ্যক্রম প্রণেতারা লিঙ্গ-সংবেদনশীল ভাষা ব্যবহারের নীতিমালাও গ্রহণ করতে পারেন। উদাহরণ, সংলাপ এবং চিত্রে ভারসাম্যপূর্ণ উপস্থাপন নিশ্চিত করা গেলে শিক্ষাসামগ্রীর প্রতীকী পরিবেশ অনেকটাই পরিবর্তিত হতে পারে।
এছাড়া পাঠ্যপুস্তকে বাংলাদেশের লিঙ্গ-বৈচিত্র্যময় সম্প্রদায়ের অস্তিত্ব ও অভিজ্ঞতাকেও স্বীকৃতি দেওয়া জরুরি। এর জন্য বড় ধরনের পাঠ্যক্রম পরিবর্তনের প্রয়োজন নেই; বরং সামাজিক বিজ্ঞান আলোচনা বা প্রাসঙ্গিক উদাহরণের মধ্যেই সীমিত অন্তর্ভুক্তি শিক্ষার্থীদের লিঙ্গ বৈচিত্র্য সম্পর্কে আরও গভীর ধারণা দিতে পারে।
শিক্ষক প্রশিক্ষণও এই প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। শিক্ষকরা যদি লিঙ্গ উপস্থাপনার বিষয়টি সম্পর্কে সচেতন হন, তবে তারা শিক্ষার্থীদের পাঠ্যসামগ্রীকে সমালোচনামূলকভাবে বিশ্লেষণ করতে উৎসাহিত করতে পারবেন।
সবশেষে বলা যায়, শিক্ষার উদ্দেশ্য কেবল তথ্য প্রদান নয়। এর লক্ষ্য এমন একটি চিন্তাশীল নাগরিক গড়ে তোলা, যারা একটি ন্যায়ভিত্তিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ নির্মাণে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে পারে। পাঠ্যপুস্তক এই প্রক্রিয়ায় একটি মৌলিক ভূমিকা পালন করে।
আজকের শিক্ষার্থীরা তাদের পাঠ্যপুস্তকের গল্পগুলোর মধ্য দিয়েই সমাজ সম্পর্কে প্রথম ধারণা পায়। তাই পাঠ্যপুস্তকে ভারসাম্যপূর্ণ এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক উপস্থাপন নিশ্চিত করা ভবিষ্যৎ সমাজ নির্মাণের ক্ষেত্রেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশ নারী শিক্ষা, রাজনৈতিক নেতৃত্বে নারীর অংশগ্রহণ এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নারীর সম্পৃক্ততার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। কিন্তু সামাজিক স্টেরিওটাইপ ও কাঠামোগত বৈষম্য এখনও বিদ্যমান।
এই বাস্তবতায় শিক্ষাসামগ্রীর ভাষা ও উপস্থাপনকেও সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হতে হবে। পাঠ্যপুস্তক যদি পুরোনো ধারণাকে পুনরুৎপাদন করতে থাকে, তবে তা সমাজে ইতোমধ্যে অর্জিত অগ্রগতিকে দুর্বল করতে পারে। অন্যদিকে, অন্তর্ভুক্তিমূলক উপস্থাপন শিক্ষার্থীদের এমন একটি সমাজ কল্পনা করতে সাহায্য করতে পারে যেখানে সুযোগ ও সম্ভাবনা লিঙ্গ দ্বারা সীমাবদ্ধ নয়।
একটি পাঠ্যপুস্তকের পৃষ্ঠা হয়তো সাধারণ মনে হতে পারে, কিন্তু সেগুলো নীরবে একটি জাতির আত্মপরিচয় গঠনে ভূমিকা রাখে। তাই শিক্ষাসামগ্রীর ভাষা ও বর্ণনাকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করে তোলা কেবল একটি শিক্ষাবিষয়ক কাজ নয়; এটি ভবিষ্যৎ সমাজের নৈতিক ও বৌদ্ধিক/বুদ্ধিবৃত্তিয় ভিত্তি নির্মাণের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
সূত্র:
• Butler, J. (1990). Gender Trouble: Feminism and the Subversion of Identity. Routledge.
• Fairclough, N. (1995). Critical Discourse Analysis: The Critical Study of Language. Longman.
• Mills, S. (1997). Discourse. Routledge.
• Sakib, N. M. (2017). Gender Analysis of NCTB Textbooks Corresponding to the Usage of Language. Institute of Modern Languages, University of Dhaka.
বাংলা টেলিগ্রাফ উদ্যোগের গল্প