
রাজনীতির এই বৈপরীত্যই তাকে নিয়ে নানা রূপক ও সমালোচনার জন্ম দিয়েছে
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বাস্তবতায় রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন (চুপ্পু) এক জটিল ও বিতর্কিত চরিত্রে পরিণত হয়েছেন। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশ তাকে ব্যঙ্গার্থে ‘শেখ হাসিনার আবিষ্কৃত মাল্টি-হেডেড পলিটিক্যাল মিসাইল’ বলছেন। কারণ, তার রাজনৈতিক যাত্রা এবং সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড এমন এক বাস্তবতার জন্ম দিয়েছে যেখানে তিনি একদিকে ক্ষমতাসীন শক্তির আস্থাভাজন, আবার অন্যদিকে ক্ষমতার পরিবর্তনের পর নতুন শক্তিগুলোর সাংবিধানিক প্রক্রিয়ারও কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করছেন।
সাহাবুদ্দিন চুপ্পুর রাজনৈতিক ও পেশাগত জীবন দীর্ঘদিন ধরেই আওয়ামী লীগ ঘনিষ্ঠ বলেই বিবেচিত হয়েছে। ছাত্রজীবনে তিনি ছাত্রলীগ রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পরে বিচার বিভাগে যোগ দিয়ে জেলা ও দায়রা জজ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। অবসরের পর দুর্নীতি দমন কমিশনের কমিশনার হিসেবেও কাজ করেন। এই পটভূমির মধ্যেই ২০২৩ সালে শেখ হাসিনা তাকে রাষ্ট্রপতি পদে মনোনীত করেন এবং সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে তিনি সহজেই রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন।
তখন অনেকেই মনে করেছিলেন, তিনি হবেন ক্ষমতাসীন সরকারের এক নির্ভরযোগ্য সাংবিধানিক প্রতিনিধি। কিন্তু দেশের রাজনীতিতে নাটকীয় পরিবর্তন ঘটে ২০২৪ সালের জুলাই–আগস্টের ছাত্র–জনতার আন্দোলনের পর। দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা সরকারের পতনের মধ্য দিয়ে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হয়।
এই পরিবর্তনের মুহূর্তে রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষার দায়িত্ব এসে পড়ে রাষ্ট্রপতির ওপর। শেখ হাসিনা যাকে রাষ্ট্রপতি করেছিলেন, সেই তিনিই আবার জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের শপথ পাঠ করান। আরও তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, শেখ হাসিনা সরকারের সময় যিনি নানা মামলায় রাজনৈতিকভাবে নিপীড়নের শিকার বলে আলোচিত ছিলেন—ড. মুহাম্মদ ইউনুস—তাকেও সরকার প্রধান হিসেবে শপথ পড়ান রাষ্ট্রপতি শাহাবুদ্দিন চুপ্পু।
রাজনীতির এই বৈপরীত্যই তাকে নিয়ে নানা রূপক ও সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। অনেকেই বলছেন, তিনি এমন এক রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতীক যেখানে একই ব্যক্তি ভিন্ন সময়ে ভিন্ন শক্তির সাংবিধানিক বৈধতার অংশ হয়ে ওঠেন।
এই বিতর্ক নতুন মাত্রা পায় ১২ মার্চ জাতীয় সংসদের অধিবেশনে রাষ্ট্রপতির ভাষণকে কেন্দ্র করে। সংবিধান অনুযায়ী বছরের প্রথম অধিবেশনে রাষ্ট্রপতি সরকারের নীতি, কর্মপরিকল্পনা ও উন্নয়ন কার্যক্রমের সারসংক্ষেপ সংসদের সামনে তুলে ধরেন। সেই ধারাবাহিকতায় রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন চুপ্পুও সংসদে সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মসূচি, অর্থনৈতিক অগ্রগতি এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন।
কিন্তু এই ভাষণকে ঘিরে সংসদে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। বিরোধী দলের পক্ষ থেকে অভিযোগ তোলা হয় যে রাষ্ট্রপতি কার্যত সেই রাজনৈতিক শক্তির ধারাবাহিকতার অংশ, যাকে তারা ‘ফ্যাসিস্ট শক্তি’ হিসেবে অভিহিত করছে। এই প্রতিবাদ জানাতেই তারা সংসদ কক্ষে অবস্থান না করে ওয়াক আউট করেন।
অন্যদিকে যারা ওয়াকআউট করেছেন তাদের মধ্যে অনেকেই জুলাই বিপ্লব পরবর্তী সরকারের উপদেষ্টা হিসাবে তার কাছেই শপথ নিয়েছেন এবং গত ১৮ মাস তার বিরুদ্ধচারন করেন নাই।
সব মিলিয়ে রাষ্ট্রপতি মোঃ সাহাবুদ্দিন এখন এমন এক রাজনৈতিক বাস্তবতার কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে আছেন যেখানে তাকে নিয়ে বিতর্ক, ব্যাখ্যা এবং সমালোচনা একসঙ্গে চলেছে। একদিকে তিনি শেখ হাসিনার মনোনীত রাষ্ট্রপতি, অন্যদিকে পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নতুন বাস্তবতার সাংবিধানিক ব্যবস্থাপনাও তার হাত দিয়েই সম্পন্ন হয়েছে।
এই দ্বৈত বাস্তবতাই তাকে নিয়ে ‘মাল্টি-হেডেড পলিটিক্যাল মিসাইল’ উপমাটিকে আরও আলোচিত করে তুলেছে। ইতিহাস হয়তো একদিন নির্ধারণ করবে—তিনি কেবল একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ফল ছিলেন, নাকি পরিবর্তনের সময়ে রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষার এক জটিল কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র।
ড. শরিফুল ইসলাম দুলু: বিপণন ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ, নীতি পরামর্শক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক। মার্কেটার্স ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ (এমআইবি)-এর সেক্রেটারি জেনারেল এবং মার্কটেল কনসাল্টিং গ্রুপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা
[এই বিভাগের মতামত লেখকের নিজস্ব]