
ইসলামের ইতিহাসে পবিত্র কাবাঘরকে ঘিরে অসংখ্য বিস্ময়কর ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায়। কখনও যুদ্ধ, কখনও প্রাকৃতিক দুর্যোগ, আবার কখনও মানুষের গভীর ধর্মীয় আবেগ এই পবিত্র স্থানকে ঘিরে নতুন নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করেছে। কিন্তু ১৯৪১ সালের একটি ঘটনা আজও মানুষের মনে এক ধরনের বিস্ময় জাগায়—প্রবল বৃষ্টির বন্যায় যখন পুরো মসজিদুল হারাম পানিতে ডুবে গিয়েছিল, তখন এক কিশোর সাঁতার কেটে কাবাঘর তাওয়াফ করেছিলেন।
ঘটনাটি যেন বাস্তবের ভেতর লুকিয়ে থাকা এক নাটকীয় দৃশ্য—আকাশ ফাটানো বৃষ্টি, পাহাড় থেকে নেমে আসা গর্জনধ্বনির পানি, আর তার মাঝখানে বিশ্বাসে দৃঢ় এক কিশোরের সাহসী সিদ্ধান্ত।
বৃষ্টিতে ডুবে যাওয়া মক্কা
১৯৪১ সালে মক্কা নগরীতে অস্বাভাবিক ভারী বৃষ্টি শুরু হয়। পাহাড়ে ঘেরা এই শহরে বৃষ্টি হলে পাহাড় থেকে হুড়মুড় করে পানি নেমে আসে। সেই বছর বৃষ্টির তীব্রতা ছিল এতটাই বেশি যে শহরের বিভিন্ন এলাকায় দ্রুত বন্যা দেখা দেয়। সবচেয়ে নাটকীয় দৃশ্য তৈরি হয় মসজিদুল হারামের চত্বরে।
ধীরে ধীরে বৃষ্টির পানি জমতে জমতে মসজিদের তাওয়াফের পথ পুরোপুরি ডুবে যায়। কোথাও কোথাও পানি মানুষের বুক ছুঁয়ে যায়, আবার কিছু জায়গায় তা প্রায় কাঁধ পর্যন্ত উঠে যায়। মানুষ হাঁটতে পারছিল না—কেউ দেয়াল ধরে দাঁড়িয়ে আছে, কেউ আবার পানিতে ভেসে থাকার চেষ্টা করছে।
আজকের মতো উন্নত পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা তখন ছিল না। ফলে অল্প সময়ের মধ্যেই পুরো মসজিদ চত্বর যেন এক বিশাল জলাধারে পরিণত হয়।
চারদিকে তখন অদ্ভুত এক দৃশ্য—কাবাঘর স্থির দাঁড়িয়ে আছে, আর তাকে ঘিরে ঢেউ খেলছে বন্যার পানি।

সেই কিশোর
এই অস্বাভাবিক দৃশ্যের মধ্যেই উপস্থিত ছিলেন বাহরাইনের এক কিশোর—শেখ আলী আল আওয়াদি। বয়স মাত্র বারো বছর। পরিবারের সঙ্গে তিনি পবিত্র তীর্থযাত্রায় মক্কায় এসেছিলেন। চারদিকে যখন মানুষ বিস্মিত ও আতঙ্কিত, তখন কিশোর আলীর মনে জন্ম নেয় এক অদ্ভুত চিন্তা।
তাওয়াফ তো করতেই হবে। কিন্তু হাঁটার পথ নেই। তাহলে? সাঁতার কেটে!
এই চিন্তা প্রথমে অনেকের কাছেই অবিশ্বাস্য মনে হয়েছিল। কিন্তু আলীর চোখে তখন ভয় নয়, ছিল দৃঢ় সংকল্প। হঠাৎই সে পানিতে নেমে পড়ে। চারপাশের মানুষ অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে—একটি কিশোর ঠান্ডা বন্যার জলে ধীরে ধীরে সাঁতার কাটতে শুরু করেছে। তার সামনে কাবাঘর, আর তাকে ঘিরে ঘুরতে হবে সাতবার।
আলীর সঙ্গে তার ভাই ও আরও দুজন বন্ধু ছিল। তারা প্রথমে সাহস করে পানিতে নামে। সবাই মিলে তাওয়াফের প্রথম চক্কর শুরু হয়। পানির স্রোত ছিল অস্থির। কোথাও কোথাও ঢেউ উঠছিল। ঠান্ডা পানিতে শরীর দ্রুত ক্লান্ত হয়ে পড়ছিল।
এক সময় আলীর সঙ্গীরা থেমে যায়। কেউ কাবাঘরের দরজার কাছে উঠে আশ্রয় নেয়, কেউ আবার পানির ধাক্কায় তাওয়াফ শেষ করতে পারে না।
কিন্তু আলী থামেনি।সে ধীরে ধীরে সাঁতার কাটতে থাকে।
চারপাশে তখন মানুষের দৃষ্টি তার ওপর। কেউ বিস্ময়ে তাকিয়ে, কেউ দোয়া করছে। বন্যার পানিতে ঘেরা পবিত্র চত্বরের মাঝখানে এক কিশোর সাঁতার কেটে কাবাঘরকে ঘিরে ঘুরছে—দৃশ্যটি যেন বাস্তবের চেয়েও বেশি নাটকীয়।
চতুর্থ চক্কর শেষ। শরীর ক্লান্ত হয়ে পড়লেও আলীর সংকল্প ভাঙেনি। শেষ পর্যন্ত সপ্তম চক্করও সম্পন্ন হয়। সেই মুহূর্তে কিশোর আলী সাঁতার কেটে তাওয়াফ শেষ করে।
মানুষের মুখে তখন বিস্ময় আর প্রশংসার মিশ্র প্রতিক্রিয়া।

সেই বিখ্যাত ছবি
এই ঘটনার সময় কয়েকজন উপস্থিত ব্যক্তি ছবি তুলেছিলেন। পরে সেই ছবিগুলোর একটি বিশেষভাবে বিখ্যাত হয়ে ওঠে।
ছবিটিতে দেখা যায়—কাবাঘর স্থির দাঁড়িয়ে আছে, আর চারপাশে বন্যার পানি। সেই পানির ভেতর একজন মানুষ সাঁতার কাটছে।
এই ছবিটি পরে ইসলামের ইতিহাসের অন্যতম বিরল দৃশ্য হিসেবে পরিচিত হয়।
বহু বছর পর যখন ছবিটি আবার প্রকাশিত হয়, তখন মানুষ নতুন করে অবাক হয় এই ভেবে—এমন ঘটনা কি সত্যিই ঘটেছিল?
মক্কার পরিবর্তন
সেই সময় মক্কার অবকাঠামো আজকের মতো উন্নত ছিল না। পাহাড়ি শহর হওয়ায় ভারী বৃষ্টিতে প্রায়ই পানি জমে যেত।
পরবর্তীতে সৌদি আরব সরকার মসজিদুল হারামের আশপাশে বড় ধরনের উন্নয়ন কাজ শুরু করে। আধুনিক পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা তৈরি করা হয়, যাতে বৃষ্টির পানি দ্রুত বের হয়ে যেতে পারে।
আজকের দিনে সেই পবিত্র স্থান অনেক বেশি বিস্তৃত, আধুনিক এবং নিরাপদ।
ইতিহাসে রয়ে যাওয়া দিন
শেখ আলী আল আওয়াদির সেই সাঁতরে তাওয়াফ করার ঘটনা শুধু একটি অদ্ভুত কাহিনী নয়। এটি মানুষের বিশ্বাসের শক্তিরও একটি প্রতীক। মাত্র বারো বছরের একটি ছেলে, ভয়ঙ্কর বন্যার মধ্যে দাঁড়িয়ে সিদ্ধান্ত নেয়—ইবাদত থামবে না।
এই দৃশ্য যেন মনে করিয়ে দেয়, কখনও কখনও মানুষের বিশ্বাস তাকে অসম্ভবের কাছাকাছি নিয়ে যায়।
এরপর অনেক বছর কেটে গেছে। মক্কা বদলে গেছে, মসজিদুল হারাম আরও বিশাল হয়েছে, প্রযুক্তি উন্নত হয়েছে। কিন্তু ইতিহাসের পাতায় ১৯৪১ সালের সেই দিনটি এখনও রয়ে গেছে—যেদিন বন্যার ঢেউয়ের মাঝখানে এক কিশোর সাঁতার কেটে কাবাঘর তাওয়াফ করে এক অবিশ্বাস্য ইতিহাস লিখে ফেলেছিল।
সেই গল্প আজও মানুষের মনে রোমাঞ্চ জাগায়—আর মনে করিয়ে দেয়, বিশ্বাস কখনও কখনও সবচেয়ে বড় সাহসের জন্ম দেয়।