
আলি লারিজানি
ইসরায়েলি হামলায় নিহত ইরানের প্রভাবশালী নিরাপত্তা ব্যক্তিত্ব ও দার্শনিক আলি লারিজানির মৃত্যু দেশটির রাজনীতি ও কৌশলগত অবস্থানে কী প্রভাব ফেলতে পারে—তা নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছে।
৬৭ বছর বয়সী লারিজানি ছিলেন ইরানের রাষ্ট্রযন্ত্রের অন্যতম বহুমুখী ব্যক্তিত্ব। সামরিক, আইনসভা ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ছিল তার। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান স্টিমসন সেন্টারের ফেলো ও সাংবাদিক বারবারা স্লাভিন বলেন, ‘তিনি বহু ক্ষেত্রেই প্রভাব বিস্তার করতেন।’
লারিজানির পটভূমিতে ছিল ইসলামিক রেভ্যুলুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)। পাশাপাশি তিনি একসময় রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন ইসলামিক রিপাবলিক ওব ইরান ব্রডকাস্টিংয়ের (আইআরআইবি) প্রধান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া তিনি পার্লামেন্টের স্পিকার ও সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের প্রধানের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন।
১৯৮০-এর দশকের ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় আইআরজিসির সদস্য হিসেবে অংশ নিয়ে তিনি ব্রিগেডিয়ার জেনারেল পদে উন্নীত হন। একই সঙ্গে তিনি দর্শনের ওপর অন্তত ছয়টি বই লিখেছেন এবং ইমানুয়েল কান্তের বিজ্ঞান ও গণিত বিষয়ক দর্শনে বিশেষজ্ঞ ছিলেন।
লারিজানি ইরানের এক প্রভাবশালী ধর্মীয় পরিবার থেকে উঠে আসেন। তার ভাই সাদেক লারিজানি একসময় বিচার বিভাগের প্রধান ছিলেন এবং সর্বোচ্চ নেতা হওয়ার সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবেও আলোচনায় ছিলেন।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরানের শাসনব্যবস্থা আদর্শিক হলেও পারিবারিক প্রভাবও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের নীতি বিশ্লেষক সিনা তোউসি বলেন, ‘লারিজানি এমন একজন ব্যক্তি ছিলেন, যিনি রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও নিরাপত্তা দক্ষতার সমন্বয়ে বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে সমঝোতা গড়ে তুলতে পারতেন।’ তার মতে, লারিজানির মৃত্যু একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষতি, কারণ তিনি কৌশলকে সমন্বিত নীতিতে রূপ দিতে সক্ষম ছিলেন।
সাবেক মার্কিন কর্মকর্তা এলেন আইরি বলেন, লারিজানি কখনো মধ্যপন্থী, আবার কখনো কঠোর অবস্থান গ্রহণ করতেন। ‘প্রয়োজন অনুযায়ী তিনি বাস্তববাদ ও সুযোগসন্ধানিতার মিশ্রণ ছিলেন,’ বলেন তিনি।
২০০০-এর দশকে ইরানের পারমাণবিক আলোচনায় লারিজানি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন এবং কূটনৈতিক উদ্যোগের পক্ষপাতী ছিলেন। বারবারা স্লাভিনের মতে, ‘তিনি এমন একজন ছিলেন, যার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র কথা বলতে পারত এবং অতীতেও বলেছে।’
তবে প্রয়োজনে তিনি কঠোর ভাষাও ব্যবহার করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে সতর্ক করে তিনি একবার বলেছিলেন, যুদ্ধ চালিয়ে গেলে তারাই ‘অদৃশ্য হয়ে যেতে পারেন’। এছাড়া তিনি হরমুজ প্রণালীকে যুদ্ধবাজদের জন্য ‘পরাজয় ও কষ্টের পথ’ হিসেবে আখ্যা দেন।
বিশ্লেষকদের মতে, লারিজানির মৃত্যু গুরুত্বপূর্ণ হলেও এটি ইরানের রাজনৈতিক ব্যবস্থার জন্য অস্তিত্বগত হুমকি নয়। সিনা তোউসির ভাষায়, ‘ইসলামি প্রজাতন্ত্র একটি বহুস্তরীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, যা এ ধরনের ক্ষতি সামাল দেওয়ার জন্যই তৈরি।’
তিনি আরও বলেন, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা একক ব্যক্তির হাতে নয়; বরং সর্বোচ্চ নেতার নেতৃত্বে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে তা বণ্টিত।
এদিকে লারিজানির স্থলাভিষিক্ত হিসেবে সাইয়েদ জালিলির নাম আলোচনায় রয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এতে ইরানের নীতিতে আরও কঠোরতা আসতে পারে।
লারিজানির মৃত্যুর ফলে ইরানের দুটি প্রধান প্রতিষ্ঠানের প্রভাব আরও বাড়তে পারে—আইআরজিসি এবং সর্বোচ্চ নেতার কার্যালয় (বায়ত-এ রাহবারি)।
এদিকে সাবেক প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানির সঙ্গে মিলে লারিজানি সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে মোজতবা খামেনির নিয়োগ ঠেকানোর চেষ্টা করেছিলেন বলে জানা যায়, তবে তা সফল হয়নি।
বারবারা স্লাভিনের মতে, ইসরায়েলের এসব লক্ষ্যভিত্তিক হত্যাকাণ্ড হয়তো কূটনৈতিক সমাধানের পথকে আরও সংকুচিত করছে।
তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘ইসরায়েল কি এমন সব ব্যক্তিকেই হত্যা করতে থাকবে, যারা পশ্চিমাদের সঙ্গে আলোচনায় বসতে পারতেন?’
মিডল ইস্ট আই