
ইরান কার্যত প্রমাণ করেছে যে এই প্রণালী দিয়ে চলাচলের শর্ত তারাই নির্ধারণ করছে
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন হরমুজ প্রণালী খুলে রাখতে নৌবাহিনীর একটি আন্তর্জাতিক জোট গঠনের চেষ্টা করছেন, তখন অনেক দেশ সরাসরি ইরানের সঙ্গে নিরাপদ যাতায়াতের জন্য আলোচনা করছে। বিশ্লেষকদের মতে, এতে একটি নতুন বাস্তবতা স্পষ্ট হচ্ছে—সামরিক পরিস্থিতি যাই হোক না কেন, বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি নৌপথ ব্যবহারের নিয়ন্ত্রণ এখন কার্যত তেহরানের হাতে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলি হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর ইরানের সামরিক নেতৃত্ব তাদের সবচেয়ে বড় শক্তি—ভৌগোলিক অবস্থান—ব্যবহারে মনোযোগ দেয়। ইরান হরমুজ প্রণালীর উত্তর উপকূল নিয়ন্ত্রণ করে, যেখানে দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল ও গ্যাস পরিবহন হয়।
প্রণালীটির সবচেয়ে সরু অংশ মাত্র ৩৩ কিলোমিটার, ফলে এখানে যেকোনো জাহাজ সহজেই ইরানের মূল ভূখণ্ড থেকে আক্রমণের ঝুঁকিতে পড়ে। অল্প কয়েকটি হামলা কিংবা হামলার আশঙ্কাই বীমা কোম্পানিগুলোর ঝুঁকি নেওয়ার প্রবণতা কমিয়ে দেয়, যার ফলে বীমা প্রিমিয়াম বেড়ে যায় এবং সামুদ্রিক চলাচল প্রায় স্থবির হয়ে পড়ে। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে প্রায় ২০টি জাহাজে হামলার ঘটনা ঘটেছে।
যুক্তরাজ্যের কিংস কলেজ লন্ডনের নিরাপত্তা অধ্যয়ন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক এন্ড্রিয়াস ক্রেইগস বলেন, ‘ইরান কার্যত প্রমাণ করেছে যে এই প্রণালী দিয়ে চলাচলের শর্ত তারাই নির্ধারণ করছে। তারা এখন এই গুরুত্বপূর্ণ পথের নিয়ন্ত্রক।’ তিনি আরও বলেন, এই বাস্তবতা দীর্ঘ সময় ধরে বজায় থাকতে পারে।
এদিকে যুদ্ধের প্রভাবে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে উঠে গেছে, যা যুদ্ধপূর্ব সময়ের তুলনায় ২০ শতাংশ বেশি। গ্যাসের দামও ৪০ শতাংশের বেশি বেড়েছে।
প্রথমদিকে ট্রাম্প প্রস্তাব দেন, মার্কিন নৌবাহিনী জাহাজগুলোকে নিরাপত্তা দিয়ে প্রণালী পার করাবে। পরে তিনি বিভিন্ন দেশকে যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর আহ্বান জানান এবং ন্যাটো সদস্যদের সতর্ক করেন। তবে জাপান, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য ও জার্মানিসহ অনেক দেশ এ প্রস্তাবে সাড়া দেয়নি বা অনীহা দেখিয়েছে।
অন্যদিকে কিছু দেশ ভিন্ন পথ বেছে নিয়েছে। ভারতের পতাকাবাহী দুটি গ্যাসবাহী জাহাজ তেহরানের সঙ্গে আলোচনার পর প্রণালী অতিক্রম করেছে। এ নিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের মধ্যে ফোনালাপও হয়। পাকিস্তান, তুরস্ক ও চীনের জাহাজও একইভাবে চলাচল করেছে।
মেরিটাইম গোয়েন্দা প্রতিষ্ঠান উইন্ডওয়ার্ড জানিয়েছে, প্রণালীতে স্বাভাবিকের তুলনায় চলাচল ৯৭ শতাংশ কমে গেলেও ধীরে ধীরে কিছু জাহাজ ইরানের জলসীমা ব্যবহার করে পার হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ১৯৮০-এর দশকের ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময়ের তুলনায় বর্তমান পরিস্থিতি ভিন্ন। এখন ইরানের ড্রোন প্রযুক্তি উন্নত, ছোট নৌকা, মাইন ও গেরিলা কৌশল ব্যবহারের সক্ষমতাও বেশি।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ‘কারা এই প্রণালী ব্যবহার করবে, তা আমাদের সামরিক বাহিনীই সিদ্ধান্ত নেবে।’
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান হরমুজ প্রণালীকে কেবল যুদ্ধের হাতিয়ার নয়, বরং ভবিষ্যতে নিষেধাজ্ঞা শিথিল বা অর্থনৈতিক সুবিধা আদায়ের কৌশল হিসেবেও ব্যবহার করতে পারে।
এদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরাহ বন্দরে ড্রোন হামলা এবং ইয়েমেনের হুথি গোষ্ঠীর সম্ভাব্য হুমকি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। এতে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম আরও বাড়তে পারে।
এদিকে মার্কিন সামরিক বাহিনী ইতোমধ্যে হরমুজ উপকূলে ইরানের অ্যান্টি-শিপ ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে। একই সঙ্গে হাজার হাজার মেরিন সেনা বহনকারী জাহাজ মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন ট্রাম্প।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র যদি খার্গ দ্বীপ দখলের চেষ্টা করে, তবুও তা ইরানকে প্রণালী খুলে দিতে বাধ্য করতে নাও পারে। বরং এতে উত্তেজনা আরও বাড়তে পারে।
আন্দ্রেয়াস ক্রিগ বলেন, ‘হরমুজ প্রণালীর সমস্যা আসলে সামরিক নয়, এটি বাজার ও আস্থার বিষয়। আর আস্থা কেবল কূটনীতির মাধ্যমেই ফিরিয়ে আনা সম্ভব।’