
তুরস্ক একটি স্বল্পমেয়াদি যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দিচ্ছে, যাতে আলোচনার জন্য একটি সুযোগ তৈরি হয়
ইরানকে ঘিরে চলমান যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসার উপায় খুঁজছে তুরস্ক। এ লক্ষ্যে দেশটি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়িয়ে সম্ভাব্য সমঝোতা আলোচনার উদ্যোগ নিচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।
রোববার তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান ইরান, মিশর এবং ইউরোপীয় দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে একাধিক ফোনালাপ করেন। তুর্কি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানায়, এসব আলোচনায় সংঘাত বন্ধের সম্ভাব্য পদক্ষেপ নিয়ে কথা হয়েছে।
একই দিনে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গেও কথা বলেন, যেখানে মার্কিন দূত স্টিভেন উইটকফ এবং জ্যারেড কুশনারের সঙ্গেও যোগাযোগ হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এরপর তিনি সৌদি আরব, কাতার, ইরাক এবং পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গেও আলোচনা করেন, যেখানে যুদ্ধ বন্ধে বিভিন্ন উদ্যোগ মূল্যায়ন করা হয়।
আঙ্কারার নীতিনির্ধারণী মহলের মতে, তুরস্ক একটি স্বল্পমেয়াদি যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দিচ্ছে, যাতে আলোচনার জন্য একটি সুযোগ তৈরি হয়।
এরই মধ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সোমবার জানান, মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত শেষ করার লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ফলপ্রসূ আলোচনা চলছে। তিনি পেন্টাগনকে ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর হামলা পাঁচ দিনের জন্য স্থগিত রাখার নির্দেশ দিয়েছেন এবং বলেছেন, এই আলোচনা সপ্তাহজুড়ে চলবে।
তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, একটি অস্থায়ী যুদ্ধবিরতির জানালা তৈরি করে আলোচনার সুযোগ দেওয়ার বিষয়টি তুরস্ক বিবেচনা করছে—যাতে আলোচনা ব্যর্থ হলে পুনরায় লড়াই শুরু করার সুযোগ থাকে।
তিনি বলেন, ইসরায়েল যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করতে এবং ইরানের ওপর আরও ক্ষতি চাপিয়ে দিতে পারে।
তুরস্কের একটি সূত্র জানায়, আঙ্কারা ইউরোপ, উপসাগরীয় দেশ ও আঞ্চলিক শক্তিগুলোকে নিয়ে একটি ঐক্যবদ্ধ অবস্থান গড়ে তোলার চেষ্টা করছে, যাতে ইসরায়েলের প্রভাব মোকাবিলা করা যায় এবং সংঘাতের অবসান ঘটে।
এদিকে, ইরানের পক্ষ থেকে উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি অবকাঠামো ও পানি লবণমুক্তকরণ কেন্দ্রগুলোতে হামলার হুমকি ওই অঞ্চলের দেশগুলোকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে।
সংঘাতের সমাধানে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো এমন একটি পথ খুঁজে বের করা, যা উভয় পক্ষের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে। সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবসহ কিছু দেশ চায়, ভবিষ্যতে ইরান যেন হরমুজ প্রণালীতে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে না পারে।
ফিদান বলেন, ‘যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর উপসাগরীয় দেশগুলো তাদের প্রত্যাশা স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে পারে, এবং শর্ত পূরণ হলে অর্থনৈতিক সহযোগিতার দিকে অগ্রসর হওয়া সম্ভব।’
ইরান কি আলোচনায় আগ্রহী?
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান আলোচনায় অংশ নিতে আগ্রহী হতে পারে, কারণ যুদ্ধের কারণে দেশটি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
তুরস্কের একটি সূত্র জানায়, ইরানের দুটি প্রধান দাবি রয়েছে—ভবিষ্যতে হামলা না হওয়ার নিশ্চয়তা এবং যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ।
সম্ভাব্য সমাধান হিসেবে ইরানকে তেল বাণিজ্য থেকে অর্জিত অর্থ ব্যবহারের সুযোগ দেওয়ার কথা ভাবা হচ্ছে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ১৪০ মিলিয়ন ব্যারেল ইরানি তেলের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়েছে, যার ফলে প্রায় ১৪ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য উন্মুক্ত হয়েছে।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, আর্থিক সুবিধার চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ভবিষ্যতে হামলা না করার নিশ্চয়তা ইরানের জন্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
তবুও স্থায়ী সমাধানের সম্ভাবনা নিয়ে সংশয় রয়েছে। কারণ, ইসরায়েল দীর্ঘমেয়াদে ইরানের ওপর হামলা বন্ধে সম্মত হবে কিনা তা নিয়ে সন্দেহ আছে। এছাড়া ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি বন্ধের মার্কিন দাবি বড় বাধা হিসেবে রয়ে গেছে।
এ প্রেক্ষাপটে রাশিয়াকে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে যুক্ত করার একটি প্রস্তাবও সামনে এসেছে, কারণ দেশটি ইরান, ইসরায়েল এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখে।
এক তুর্কি সূত্রের ভাষ্য, ট্রাম্প যেকোনো সময় বিজয় ঘোষণা করতে পারেন, কিন্তু ইসরায়েল হামলা চালিয়ে যেতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ বলে মনে হচ্ছে।