
ইরান যুদ্ধের ৩০তম দিনের উল্লেখযোগ্য ঘটনা
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান যুদ্ধ ৩০তম দিনে গড়িয়েছে, এবং মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে উত্তেজনা আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে। এই প্রেক্ষাপটে যুদ্ধ থামাতে কূটনৈতিক তৎপরতাও জোরদার হয়েছে। পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে পাকিস্তান, তুরস্ক, মিশর ও সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা বৈঠকে বসার কথা রয়েছে, যেখানে এই সংঘাতের অবসান নিয়ে আলোচনা হবে।
এদিকে ইয়েমেনের হুথিরা যুদ্ধে যুক্ত হয়ে শনিবার ইসরায়েলের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে, যা সংঘাতকে আরও বিস্তৃত করেছে। একই সময়ে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ইরানের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর তেহরান মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন ও ইসরায়েলি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে লক্ষ্য করে পাল্টা হামলার হুমকি দিয়েছে।
রবিবার সকালে রাজধানী তেহরানে শক্তিশালী বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। ইরানের মেহর সংবাদ সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, শাফট শহরের কাছে একটি আবাসিক এলাকায় হামলায় দুজন নিহত ও পাঁচজন আহত হয়েছেন। ফার্স সংবাদ সংস্থা জানায়, তেহরানের উত্তরাঞ্চলের সাদাত আবাদ এবং পশ্চিমাঞ্চলের আরও কিছু আবাসিক এলাকাতেও হামলা হয়েছে, যেখানে একাধিক মানুষ আহত হয়েছেন।
এর আগে শনিবার বুশেহর প্রদেশে এক হামলায় একটি পরিবারের চার সদস্য নিহত হন এবং খুজেস্তান প্রদেশে একটি পানি সরবরাহ স্থাপনায় আঘাত হানা হয়। ইরান অভিযোগ করেছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরাকি কুর্দিস্তান অঞ্চলের প্রেসিডেন্টের বাসভবনেও হামলা চালিয়েছে, যা তারা কাপুরুষোচিত হত্যাচেষ্টার ধারাবাহিকতা হিসেবে উল্লেখ করেছে।
ইরানি রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যমের দাবি অনুযায়ী, ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) দীর্ঘ ও মাঝারি পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন ব্যবহার করে ইসরায়েল ও সংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলোতে হামলা চালিয়েছে। তারা একটি মার্কিন ড্রোন ভূপাতিত করা এবং একটিিএফ-সিক্সটিন যুদ্ধবিমান আঘাত করার দাবিও করেছে।
অন্যদিকে, ইরানি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, তারা ইসরায়েলের হাইফা বন্দরের কাছে একটি সামরিক স্থাপনায় অবস্থিত রাডার ও ইলেকট্রনিক যুদ্ধ কেন্দ্র এবং বেন গুরিয়ন বিমানবন্দরের একটি জ্বালানি সংরক্ষণাগার লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে।
উপসাগরীয় অঞ্চলেও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। সৌদি আরব জানিয়েছে, তারা রবিবার ভোরে ১০টি ড্রোন ধ্বংস করেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দিয়ে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিহত করার কথা জানিয়েছে। আবুধাবিতে একটি অ্যালুমিনিয়াম কারখানায় হামলায় ছয়জন আহত হয়েছেন। বাহরাইনের একটি শিল্প কারখানাতেও হামলায় দুই কর্মী আহত হন। এসব হামলার দায় স্বীকার করেছে আইআরজিসি, যারা দাবি করেছে এগুলো মার্কিন সামরিক ও মহাকাশ খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট স্থাপনা।
কুয়েতও চারটি ড্রোন ভূপাতিত করার কথা জানিয়েছে। একই সময়ে কাতার ও ইউক্রেন ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিরোধে যৌথ প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে।
লেবাননে ইসরায়েলি হামলায় তিন সাংবাদিক নিহত হওয়ার প্রতিবাদে বৈরুতে বিক্ষোভ হয়েছে। হিজবুল্লাহ জানিয়েছে, তারা উত্তর ইসরায়েলের বিভিন্ন সামরিক ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। গাজায় ইসরায়েলি বিমান হামলায় অন্তত ছয়জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে একটি শিশুও রয়েছে।
ইয়েমেনের হুথিরা যুদ্ধ শুরুর পর প্রথমবারের মতো ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে ইসরায়েলে হামলা চালিয়েছে। ইরাকেও পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্সেস (পিএমএফ)-এর বিভিন্ন ঘাঁটিতে বিমান হামলার খবর পাওয়া গেছে।
ইসরায়েলের ভেতরেও যুদ্ধবিরোধী বিক্ষোভ হয়েছে, যেখানে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। একই সময়ে লেবাননে হিজবুল্লাহর হামলায় এক ইসরায়েলি সেনা নিহত হয়েছে বলে দেশটির সেনাবাহিনী জানিয়েছে। ইসরায়েল দাবি করেছে, তারা ইরান থেকে ছোড়া দুটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রও এই যুদ্ধে তার উপস্থিতি জোরদার করেছে। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, প্রায় ৩,৫০০ অতিরিক্ত সেনা ইউএসএস ট্রিপোলি জাহাজে করে মধ্যপ্রাচ্যে পৌঁছেছে। একই সঙ্গে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর ইরানে সম্ভাব্য স্থল অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে খবর প্রকাশিত হয়েছে, যদিও তা পূর্ণাঙ্গ আগ্রাসন নয় বরং সীমিত অভিযানের পর্যায়ে থাকতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও এই যুদ্ধের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। দেশজুড়ে হাজার হাজার মানুষ ‘নো কিংস’ কর্মসূচির অংশ হিসেবে রাস্তায় নেমেছে এবং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতির বিরোধিতা করেছে। এদিকে ইরানের সাবেক শাহের ছেলে রেজা পাহলভি ট্রাম্পকে ইরানের সঙ্গে কোনো চুক্তি না করার আহ্বান জানিয়েছেন।
এদিকে যুদ্ধের প্রভাব বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও পড়তে শুরু করেছে। জ্বালানির দাম বাড়ছে এবং খাদ্য সংকটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে পাকিস্তান একটি গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতায় পৌঁছেছে, যার মাধ্যমে ইরান ২০টি পাকিস্তানি জাহাজকে হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলের অনুমতি দিয়েছে। তবে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও গ্যাস পরিবাহিত হওয়া এই গুরুত্বপূর্ণ প্রণালীতে ইরানের নিয়ন্ত্রণ এখনো বহাল রয়েছে।
সব মিলিয়ে, যুদ্ধ ৩০তম দিনে পৌঁছে আরও জটিল ও বিস্তৃত রূপ নিয়েছে, যেখানে সামরিক সংঘাতের পাশাপাশি কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং বৈশ্বিক প্রভাব ক্রমশ গভীরতর হচ্ছে।