
শিশুদের সংক্রামক রোগগুলোর মধ্যে ‘হাম’ অত্যন্ত আলোচিত একটি নাম
বর্তমান সময়ে শিশুদের সংক্রামক রোগগুলোর মধ্যে ‘হাম’ অত্যন্ত আলোচিত একটি নাম। অনেক সময় অভিভাবকরা একে সাধারণ জ্বর বা অ্যালার্জি ভেবে ভুল করেন, যা শিশুর জন্য মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে। সঠিক সময়ে সচেতনতা এবং টিকাদানই পারে আপনার শিশুকে এই ভাইরাসের ছোবল থেকে রক্ষা করতে।
হাম আসলে কী?
হাম মূলত ‘রুবেলা’ নামক এক অতিসংক্রামক ভাইরাসের কারণে হয়। এটি প্রধানত শিশুর শ্বাসনালি দিয়ে শরীরে প্রবেশ করে এবং সাময়িকভাবে শরীরের স্বাভাবিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বা ইমিউন সিস্টেমকে পুরোপুরি ভেঙে দেয়। এর ফলে শিশু সহজেই অন্যান্য ব্যাকটেরিয়া বা জীবাণু দ্বারা আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে।
সংক্রমণের ধরন ও বিস্তার
হাম একটি অত্যন্ত ছোঁয়াচে রোগ। আক্রান্ত শিশুর হাঁচি বা কাশির মাধ্যমে এই ভাইরাস বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে। আশেপাশে থাকা সুস্থ শিশুরা সেই বাতাস গ্রহণের মাধ্যমে মুহূর্তেই আক্রান্ত হতে পারে। একটি এলাকায় একজন আক্রান্ত শিশু থেকে দ্রুত মহামারি আকারে এটি ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে।
শনাক্ত করার প্রাথমিক লক্ষণসমূহ
হামে আক্রান্ত হলে সাধারণত শিশুর শরীরে নিচের উপসর্গগুলো ধাপে ধাপে দেখা দেয়:
তীব্র জ্বর ও শ্বাসকষ্ট: হঠাৎ উচ্চমাত্রার জ্বর এবং সাথে টানা কাশি।
চোখ-নাকের অস্বস্তি: চোখ টকটকে লাল হয়ে যাওয়া এবং অনবরত নাক দিয়ে পানি পড়া।
লালচে দানা বা র্যাশ: জ্বরের চতুর্থ দিনে মুখমণ্ডল থেকে শুরু করে সারা শরীরে লালচে ছোট ছোট দানা বা র্যাশ দেখা দেওয়া।
হামের দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ও অন্যান্য জটিলতাসমূহ
হামকে অবহেলা করলে এটি শিশুর শরীরে স্থায়ী ক্ষতি করতে পারে। এর ফলে যেসব জটিলতা দেখা দেয়:
১. তীব্র নিউমোনিয়া, কান পাকা, মুখে মারাত্মক ঘা এবং দীর্ঘস্থায়ী ডায়রিয়া।
২. হামের ফলে শরীরে ‘ভিটামিন এ’-র প্রচণ্ড অভাব দেখা দেয়, যা থেকে রাতকানা এমনকি স্থায়ী অন্ধত্ব হতে পারে।
৩. কিছু ক্ষেত্রে এটি মস্তিষ্কের প্রদাহ (এনসেফালাইটিস) এবং শিশুকে মারাত্মক অপুষ্টির দিকে ঠেলে দেয়।

র্যাশ ওঠার দিন থেকে অন্তত ৫ দিন শিশুকে অন্য শিশুদের কাছ থেকে আলাদা রাখুন
সুরক্ষার কবচ-হামের টিকা
বাংলাদেশে সরকারি টিকাদান কর্মসূচির অধীনে ৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের দুই ডোজ ‘এমআর’ (মিজলস রুবেলা) টিকা দেওয়া হয়। প্রথম ডোজ ৯ মাস বয়সে এবং দ্বিতীয় ডোজ ১৫ মাস বয়সে।
২০২৫ সালের তথ্যমতে, দেশের ৮৮ শতাংশ শিশু দুই ডোজ পূর্ণ করেছে এবং তারা প্রায় সারাজীবনের জন্য নিরাপদ।
যারা এখনো টিকা নেয়নি বা মাত্র এক ডোজ নিয়েছে, তাদের আক্রান্ত হওয়ার এবং রোগটি ছড়ানোর ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি।
টিকা নেওয়ার পরও কেন হাম হচ্ছে?
অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে, টিকা দেওয়ার পরও কেন প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়? এর প্রধান কারণ হলো ‘হার্ড ইমিউনিটি’ বা গোষ্ঠীগত সুরক্ষার অভাব। যখন একটি এলাকায় অনেক শিশু টিকাবঞ্চিত থাকে, তখন ভাইরাসটি সক্রিয় থাকে। এছাড়া খুব সামান্য ক্ষেত্রে টিকার পর শরীরে পর্যাপ্ত অ্যান্টিবডি তৈরি না হলেও পুনরায় আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
অভিভাবকদের জন্য জরুরি করণীয়
যদি আপনার শিশুর জ্বর এবং শরীরে র্যাশ দেখা দেয়, তবে নিচের পদক্ষেপগুলো দ্রুত নিন:
র্যাশ ওঠার দিন থেকে অন্তত ৫ দিন শিশুকে অন্য শিশুদের কাছ থেকে আলাদা রাখুন।
চিকিৎসকের পরামর্শে বয়স অনুযায়ী পরপর দুই দিন দুটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ভিটামিন এ ক্যাপসুল খাওয়াতে হবে।
শ্বাসকষ্ট, বারবার বমি, খিঁচুনি, নিস্তেজ হয়ে পড়া বা চোখের মণি ঘোলা হয়ে গেলে মুহূর্ত দেরি না করে হাসপাতালে নিতে হবে।
যদি চোখের মণি ঘোলা লাগে, তবে চিকিৎসকের পরামর্শে ১৪ দিনের মাথায় তৃতীয় ডোজ ভিটামিন এ ক্যাপসুল দিতে হতে পারে।
হাম প্রতিরোধযোগ্য একটি রোগ। কেবল সচেতনতা এবং সময়মতো দুই ডোজ টিকা নিশ্চিত করার মাধ্যমেই আমরা আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে এই প্রাণঘাতী রোগের হাত থেকে রক্ষা করতে পারি। মনে রাখবেন, আপনার সচেতনতাই শিশুর সুস্থ জীবনের নিশ্চয়তা।